রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও আরেকটি দেশ, শ্রীলঙ্কার খবর বিশ্ব-গণমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন হওয়ার পর ৭৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটে এক সময়ের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ এখন নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়; জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনডিপির সবশেষ মানব উন্নয়ন সূচকে শ্রীলঙ্কার অবস্থান ১৮৯টি দেশের মধ্যে ৭২তম, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম আর ভারতের ১৩১তম। এই সূচকে মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে শিক্ষালাভের গড় সময় এবং গড় আয়ু বিবেচনায় নেওয়া হয়। অর্থাৎ দেশটি যে কেবল অর্থনীতির দিক দিয়ে উন্নত ছিল তা নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রগুলোতেও দক্ষিণ এশিয়ার আর সব দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে ছিল।
দেশটিতে এখন প্রতিদিন ১৩ ঘণ্টার ওপর বিদ্যুৎ থাকছে না। টানা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পুঁজিবাজারের লেনদেন বন্ধ হয়ে গেছে। ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়া দেশটির সরকারের কাছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আছে অতি সামান্য। যে কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানি করা যাচ্ছে না। কাগজের সংকটে পাবলিক পরীক্ষা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বন্ধ হয়ে গেছে দৈনিক পত্রিকার ছাপা সংস্করণ। গ্যাসের ভয়াবহ সংকটে থাকা মানুষ কেরোসিন স্টোভে রান্না করতে শুরু করেছিল। কিন্তু সেটা পেতেও দাঁড়াতে হচ্ছে দীর্ঘ লাইনে। এমন লাইনে দাঁড়িয়ে অন্তত তিনজন মারা গেছেন। তেলের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে যানবাহন। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে বহু মানুষ ঠিকমতো খেতে পারছে না। ভয়াবহ এ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বহু মানুষ শ্রীলঙ্কা থেকে পাড়ি জমাচ্ছে ভারতের তামিলনাড়ূতে।
এই পরিস্থিতির জন্য শ্রীলঙ্কা সরকার দায়ী করছে মূলত ২০১৯ সালের ইস্টার বোমা হামলা এবং করোনার কারণে পর্যটন শিল্পের বিপর্যয়কে। এটাই যদি সঠিক হতো তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক বেশি পর্যটননির্ভর দেশ মালদ্বীপ আরও অনেক বেশি সংকটে পড়ত। মূলত ভুল অর্থনৈতিক নীতি, রাজনৈতিক কৌশল ও পারিবারিক গোষ্ঠীতন্ত্র এর জন্য দায়ী। নীতিগত ক্ষেত্রে গোটাবায়া সরকারের কিছু উল্লেখযোগ্য ভুল ছিল আয়কর ও মূল্য সংযোজন করে অযাচিত ছাড়, কৃষিকে রাতারাতি জৈব চাষে রূপান্তর, কেন্দ্রীয় এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া ইত্যাদি। আর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে নানা অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং এতে দুর্নীতি।
কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, শ্রীলঙ্কায় রাজতন্ত্র, না গণতন্ত্র- তবে নিঃসন্দেহে প্রশ্নটি তাকে ধাঁধায় ফেলবে। দেশটির প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, অর্থ, সেচ, যুবমন্ত্রীসহ শাসন কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে ২০ জনের বেশি আছেন রাজাপাকসে পরিবারের সদস্য। আছেন এ পরিবারের ৯ জন সংসদ সদস্য। তাদের মধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের সাংবিধানিক ক্ষমতা রাজতন্ত্রের রাজার মতো। দেশটি প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে এক গোষ্ঠীতন্ত্র বা অলিগার্কিতে পরিণত হয়েছে।
নানা কায়দায় ব্যাপক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে বাংলাদেশেও গোষ্ঠীতন্ত্র কায়েম হয়েছে ও অলিগার্কির অনিবার্য পরিণতি ক্লিপ্টোক্র্যাসির সব লক্ষণ গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ক্লিপ্টোক্র্যাসিতে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী দেশের সম্পদ লুট করে অকল্পনীয় পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে। লুটপাটের জন্য ক্লিপ্টোক্র্যাসিতে ব্যাংকের টাকা সরাসরি যেমন লুট করা হয়, তেমনি প্রকল্প বানানোর নামে বড় লুটপাট হয়।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে উন্নয়ন বলতে অবকাঠামো উন্নয়নকেই বোঝানো হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষার মতো কল্যাণ খাতে সরকারের অতি অপ্রতুল বরাদ্দই বলে দেয়, নাগরিকদের এসব বিষয় নিয়ে একেবারেই চিন্তিত নয় সরকার। এমনকি করোনার মতো ভয়াবহ দুর্যোগের সময়ও বন্ধ ছিল না মেগা প্রকল্পের কাজগুলো। করোনা শুরুর সময়ে নিজ দেশে ছুটিতে যাওয়া নানা মেগা প্রকল্পের বিদেশি কর্মীদের দেশে আনার জন্য সরকার বিশেষ বিমান পাঠানোর সম্ভাব্যতা যাচাই করেছিল। মানুষের ঘরে খাবার থাক বা না থাক উড়াল সেতু, মেট্রোরেল বা মহাসড়ক নির্মাণ কিছুতেই বন্ধ করা যাবে না। কারণ এতে একদিকে যেমন উন্নয়নের সংজ্ঞাকে সংকুচিত করে কেবল দৃশ্যমান উন্নয়ন সামনে আনা যায়, অন্যদিকে করা যায় লুটপাটের মহোৎসব।
দেশে প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ছে, যার প্রায় সব ক'টিই অবকাঠামো। এসব ঋণের মধ্যে বড় অংশ সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট। অর্থাৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় জিনিসের প্রধান অংশ ঋণদাতাদের কাছ থেকে নিতে হচ্ছে। বেশি সুদের এ ধরনের ঋণে বাস্তবায়িত প্রকল্পের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকে, অর্থ খরচের জবাবদিহি কম এবং সময়মতো প্রকল্পের কাজও শেষ হয় না। বর্তমানে ১০টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর একটির কাজও সময়মতো শেষ হয়নি। সময় বেড়েছে, ব্যয়ও বেড়েছে। এতে এর অর্থনৈতিক মূল্যও কমে যাচ্ছে। ফলে সব ক'টি প্রকল্প থেকে বিনিয়োগ কতটা সময়ে ফেরত আসবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।
সবচেয়ে ভয়ংকর কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিন পায়রাকে গভীর সমুদ্রবন্দর বানানোর চেষ্টা করে বিরাট ব্যয়ের পর সরকার এখন সেই চেষ্টায় ক্ষান্ত দিচ্ছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন থেকে বলেছেন, এখানে এই স্থানটি কোনোভাবেই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য উপযোগী নয়। কক্সবাজার থেকে রামু পর্যন্ত রেললাইন বানানো হচ্ছে ১২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে। মিয়ানমারের সঙ্গে তো আমাদের তেমন বাণিজ্যই নেই। এটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প।
দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্ভাব্যতা, লাভজনকতা বা পরিবেশ সংক্রান্ত সমীক্ষার কথা জানা যায় না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই প্রকল্পের কোনো উপযোগিতা নেই বাংলাদেশে। অথচ সরকার এখন দ্বিতীয় আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে।
অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের কথা থেকে এবার আসি প্রয়োজনীয় প্রকল্পের কথায়। বাংলাদেশে এমনকি প্রয়োজনীয় প্রকল্পে বিরাট দুর্নীতি সেগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হতে দেয় না কিছুতেই। বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যয়ে নির্মিত ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। অথচ ইউরোপে চার লেনের প্রতি কিলোমিটার মহাসড়ক তৈরির খরচ সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা।
প্রকল্প বানাতে গিয়ে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ জিডিপির অনুপাতে ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা দ্রুত বাড়ছে। অনেক বড় লোনের গ্রেস পিরিয়ড চলছে এখন। যা শেষ হলে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। সঙ্গে নতুন যুক্ত হতে থাকা সব ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষে অর্থাৎ পাঁচ-সাত বছর পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে চলে যাওয়ার ভয়াবহ আশঙ্কা রয়েছে।
যৌক্তিক কারণেই আমি আজকের বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার ছায়া দেখছি এবং কয়েক বছর পরের বাংলাদেশের কথা ভেবে শঙ্কিত।
রুমিন ফারহানা: সংসদ সদস্য, আইনজীবী ও কলাম লেখক