এখনকার মতো চাকরিজীবী/'শিক্ষিত' ও প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন শ্রেণির উত্থান কয়েক দশক আগেও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সমাজে ছিল না। আজকের আদিবাসীদের পূর্ব- নারী-পুরুষরা ছিল পুরোপুরিই প্রকৃতিনির্ভর। জুমচাষি। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সকল ধরনের উৎসব, প্রথাগত বিশ্বাস, আচার অনুষ্ঠান, সংস্কৃতি, জীবন-জীবিকা ইত্যাদি এখানকার মাটি প্রকৃতির সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল, এখনও আছে।

মাটি, পানি, (বড়) পাহাড় ও বৃক্ষ, পাথর, জলাধার, বন-জঙ্গল ইত্যাদি আদিবাসীদের খাদ্য, আশ্রয়, নিরাপত্তাসহ বেঁচে থাকার নানান কাজে বিভিন্নভাবে সাহায্যে আসত বলে এসব প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর ওপর তারা দেবত্ব আরোপ করে এগুলোকে দেব-দেবীরূপে কল্পনা করে বিশ্বাস করত, ভক্তি করত। যেমন ত্রিপুরাদের কাছে তৈবুঙ্গমা (পানির দেবী), হায়ুঙ্গমা (পাহাড়ের দেবতা), হায়ুঙ্গ (ধরিত্রী), বুড়াসা (বনদেবতা), তাল (চাঁদ), সাল (সূর্য) ইত্যাদি দেব-দেবীর পূজা হয়ে আসছে স্মরণাতীত কাল থেকে। তেমনি মারমাদের মধ্যে আছে খ্যংসাংমা (নদীর দেবী), আবংমা (শস্য দেবী), বুম্‌েজা নেহ্‌ (পাহাড়ের দেবতা), রোয়াজং নেহ্‌ (গ্রামরক্ষী দেবতা) ইত্যাদি। অন্যান্য আদিবাসীর মধ্যেও কমবেশি একই ধরনের প্রকৃতির উপাসনা বিদ্যমান ছিল। তাই বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী হয়েও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের মধ্যে সমান্তরালভাবে প্রকৃতি পূজার একটা চল ছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রামে চৈত্র সংক্রান্তির এ উৎসবটি ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুক, মারমা ও চাকদের কাছে সাংগ্রাইং, চাকমাদের কাছে বিঝু, তঞ্চঙ্গ্যাদের কাছে বিষু ও ম্রোদের কাছে চাংক্রান/ সাংগ্রাই নামে পরিচিত। অনেকেই আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের এগারোটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এ উৎসবটিকে বৈ-সা-বি নামে অভিহিত করে থাকে। তবে এ অভিধাকে কেন্দ্র করে একটা জোরালো বিতর্কও আছে। তবে এ লেখার আলোচ্য বিষয় ঐ বিতর্কটি নয়।

পাহাড়ে অনুষ্ঠিত চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবের অভিপ্রায়ের সাথে বঙ্গাব্দ- এর বর্ষবরণ কিংবা বিদায়ের মধ্যে মর্মগত কোনো যোগসূত্র নেই। বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সঙ্গে পাহাড়ে উদযাপিত চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবকে সমার্থক ধরে প্রায় সময়ই গুলিয়ে ফেলা হয়। তার কারণ এ দুটি উৎসব একই বা কাছাকাছি সময়েই উদযাপিত হয়। বঙ্গাব্দের নববর্ষের একই বা কাছাকাছি সময়ে পাহাড়ে ও সমতলে অনুষ্ঠিত হওয়া সংক্রান্তি উৎসবকে বুঝতে গেলে উপমহাদেশের এ অঞ্চলে প্রচলিত তিনটি অব্দ ত্রিপুরাব্দ, বঙ্গাব্দ ও বার্মিজ পঞ্জিকার দিকে তাকাতে হবে। এগুলোর বর্ষ বিদায় ও শুরুর কাছাকাছি দিন/তারিখের দিকে ভালো করে খেয়াল করলেই কেবল এ কাকতালীয় মিলের কিছুটা হদিস পাওয়া যেতে পারে।

যেমন ত্রিপুরাব্দ শুরু হয়েছিল ত্রিপুরা রাজা যুঝারূপা ওরফে হামতর ফা-এর আমলে, ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে। সে হিসেবে ত্রিপুরাব্দ বঙ্গাব্দ থেকেও তিন বছরের প্রাচীন। দুটো বর্ষপঞ্জিকার মধ্যে বছরের শেষ বা নববর্ষ শুরুর দিনের মধ্যে ব্যবধান মাত্র এক দিনের। অর্থাৎ বঙ্গাব্দের যে সময় চৈত্র সংক্রান্তি, সেদিন ত্রিপুরাব্দের ক্ষেত্রে বছরের প্রথম দিন। ত্রিপুরাদের তিন দিন ধরে চলা বৈসুকের হারি বৈসুক, বৈসুকমা (বড় বৈসুক) এবং আতাদাক বঙ্গাব্দ হিসেবে যথাক্রমে চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন (চৈত্র মাসের ২৯ ও ৩০ তারিখ) এবং নববর্ষের প্রথম দিনে অনুষ্ঠিত হয় (দেখুন, জামাল উদ্দিন ২০১১, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস)। অন্যদিকে, চান্দ্র ও সৌর বৎসরের সংমিশ্রিত বার্মিজ পঞ্জিকা অনুসারে নতুন বৎসর শুরু হয় বাংলা নতুন বৎসরের এক বা দুই দিন পরে এবং মারমাদের সাংগ্রাইং উৎসবও সে বার্মিজ পঞ্জিকা অনুসারে পালিত হয় (দেখুন, মংসানু চৌধুরী ২০২১, মারমাদের সাংগ্রাইং উৎসব)।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের মধ্যে তিন দিন (গোত্রভেদে অনেকের ক্ষেত্রে তিন দিনের বেশি) ধরে চলা চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবটি ইংরেজি বা বাংলার মতো যত না বর্ষবরণের উৎসব তার চাইতে বেশি পুরাতন বৎসরকে বিদায় দেওয়ার উৎসব। মারমারা এখনও সাংগ্রাইংকে পুরাতন বছরের বিদায়ের উৎসব হিসেবে বেশ সমারোহ করেই পালন করে থাকে। পরম্পরাগতভাবে, নতুন বছরের জন্য মারমাদের আলাদা কোনো আয়োজন নেই। একইভাবে, বাংলা নববর্ষের প্রেক্ষিতে ধরলে ত্রিপুরাদের ক্ষেত্রেও বর্ষবরণের চেয়ে বিদায়ের গুরুত্বই বেশি। তবে ত্রিপুরাব্দের প্রেক্ষিত ধরলে ত্রিপুরাদের বৈসুতে বর্ষ বিদায় ও বরণ দুটোরই সমান গুরুত্ব দেখা যায়। চাকমাদের মধ্যেও চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব তিন দিনের- ফুল বিঝু, মূল বিঝু ও গজ্যাপহয্যা। বাংলা নববর্ষের দিনই হলো গজ্যাপহয্যা। গজ্যাপহয্যার অর্থ 'গড়াগড়ি' দিয়ে বা শুয়ে-বসে কাটানো। আগের দু'দিনের উৎসবের ও খাওয়া-দাওয়ার ধকল কাটানোর জন্য তৃতীয় দিনে অর্থৎ গয্যাপহয্যার দিনে গড়াগড়ি দিয়ে বিশ্রামের আয়োজন করা।

পৃথিবীর অন্যান্য জনগোষ্ঠীর উৎসবের মতো পাহাড়েও চৈত্র সংক্রান্তি নতুন পোশাক, মুখরোচক খাবার, নাচ, গান, খেলাধুলাসহ নানান আয়োজনে পাহাড়ের অন্যতম বড় আনন্দের উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। অন্তত, আদিবাসী সমাজে যে দৃষ্টিতে বর্তমানে এটাকে দেখা হয়, আয়োজন ও উপস্থাপন করা হয় তার নিরিখে এমনটা বলা যায়। তবে এ উৎসবের সবচেয়ে বড় অন্তর্নিহিত যে তাৎপর্য রয়েছে তা হলো- আদিবাসীদের বেঁচে থাকার অস্তিত্বের সাথে প্রকৃতি ও প্রাণ যে জড়িয়ে আছে, তার প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন।

আদিবাসীরা ধরিত্রীকে মাতৃসম জ্ঞানে পূজা করে এবং পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী ও জীবকুলকে প্রকৃতি মায়ের সন্তানরূপে গণ্য করে। চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবের শুরুর দিনে তাই ছেলেমেয়েরা গ্রামে বা পাড়ায় ঘুরে ঘুরে গৃহস্থের বাড়ির উঠানে উঠানে ধান/চাল ছিটিয়ে দিয়ে আসে যেন হাঁস-মুরগিসহ পাখ-পাখালিরা সেগুলো খেতে পায়। মূলত, প্রকৃতি প্রদত্ত শস্য দানার ভাগ পাওয়া ও বৎসরের একটা দিনে আনন্দ করার তাদেরও অধিকার রয়েছে- এ ধারণাই এ প্রথা চর্চার মূলে কাজ করে। ফুল দিয়ে পানিকে পূজা করা হয় (ত্রিপুরাদের ক্ষেত্রে মাটিকেও)। একইভাবে গৃহস্থের সাথে থেকে সারা বৎসর কৃষি থেকে শুরু করে নানান কাজে শ্রম দেওয়ার জন্য গৃহপালিত পশুর গলায় ফুলের মালা পরানো হয়। ত্রিপুরাদের ক্ষেত্রে বৈসুকমার দিন এবং মারমাদের ক্ষেত্রে সাংগ্রাইং-এর তিন দিন প্রাণী হত্যা ও প্রাণিজ আমিষ/মাংস খাওয়া প্রথামতে নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয়, ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমা সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের স্নান করা ও প্রণাম করার রেওয়াজ চালু রয়েছে।

পাহাড়ের চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবগুলোতে ইদানীং অনেক পরিবর্তন এসেছে। খাবার দাবারে আদিবাসীদের পাঁচনের সাথে বাজারের পানীয়, মিষ্টি, ফলমূলসহ হরেক রকম খাবার যোগ হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামগুলো ছাড়া এ উৎসবে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নানান রকমের পিঠা পরিবেশনের ঐতিহ্য কমে গিয়েছে। উৎসবের সঙ্গে জড়িত প্রথাগত আচার-বিশ্বাসগুলোও ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। শিকড়-বিচ্ছিন্ন শহুরে এলিট শ্রেণির ক্রম-উত্থান, আকাশ সংস্কৃতি ও ভোগবাদের প্রবল আগ্রাসনের মুখে পাহাড়ের চৈত্র সংক্রান্তি উদযাপনের আকর উপাদানগুলো ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে চলেছে।

এখন চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব শহুরে আদিবাসী ও অ-আদিবাসী এলিট, পর্যটক, সাংবাদিক ইত্যাদি শ্রেণির কাছে প্রদর্শনী ও মনোরঞ্জনের জন্য সদলবলে শোভাযাত্রা, ফুল ভাসানো, প্যান্ডেল টাঙ্গিয়ে পানি খেলা, গড়িয়া/খেরেবাই নৃত্যের প্রতিযোগিতাসর্বস্ব অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। যে কারণে গ্রাম ও শহর এবং অতীত ও বর্তমানের চৈত্র সংক্রান্তি উদযাপনের মধ্যে একটা পার্থক্য তৈরি হচ্ছে ধীরে ধীরে। চৈত্র সংক্রান্তির শহুরে ধাঁচের উদযাপন এখন নিছক একটা পোশাকি সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে যেখানে এ উৎসবের চিরায়ত অভিপ্রায় ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে।

কালের পরিক্রমায় ও গ্রোতে পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তনশীল। মারমাদের বর্তমানের পানিখেলা, মারমা ভাষায় যার নাম রি-লঙ-পোয়ে, নামে পরিচিত সেই উৎসবের 'শুরুতে (অতীতে) জল ছিটানোর পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। তখন নতুন বছরে পদার্পণ করার আগে মানুষ একটি পাত্রে ধারণ করা সোনা-রূপা চোবানো ও সুগন্ধি মেশানো জল (এই জাতীয় জলকে পবিত্র মানা হয়; কাটা হলুদ চোবা জলকেও পবিত্র মানা হয়) জামের পল্লবের সাহায্যে অন্যের গায়ে আলগোছে ছিটিয়ে দিয়ে তাকে প্রতীকীভাবে অশুচিমুক্ত করার কাজ করত... কিন্তু এখন এ উৎসব চলাকালে আগের মতো আর জল ছিটানো হয় না, বরং পরস্পরের গায়ে জল ছুড়ে মারা হয়।' যার ফলে রি-লঙ-পোয়ে তার আসল চেতনা হারিয়ে 'রীতিমতো জল-যুদ্ধে পরিণত হয়েছে' যা মিডিয়ায় 'water fight, wildest water fights, water battle' ইত্যাদি নামে উপস্থাপিত হচ্ছে (প্রাগুক্ত)।

সমাজ সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু সে পরিবর্তনের কারণে চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও মৌলিকত্ব কতদূর টিকে রয়েছে, নাকি দেখনদারি পোশাকি উৎসব তাকে দখল করে নিয়েছে এগুলো নিয়ে ভাববার সময় এসেছে।

চৈত্র সংক্রান্তির উদযাপনশৈলী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। এ বিষয়ে আমাদের উদ্বেগও রয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা প্রত্যাশা করতে থাকব- সাম্প্রতিক সময়ে সমাজে প্রাণ-প্রকৃতি-বিচ্ছিন্ন ধ্বংসাত্মক ধ্যানধারণা ও চর্চার কারণে মানব সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানান কারণে যে ক্ষত প্রকৃতি ও প্রাণের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তা সারানো হবে। চৈত্র সংক্রান্তি উদযাপনে আদিবাসীদের ধারণ করা মূল চেতনার অনুশীলনের মধ্য দিয়ে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে। সেইসঙ্গে সময়ের পরিক্রমায় সৃষ্ট সকল গ্লানি, পঙ্কিলতা, ব্যর্থতা আর জীর্ণতার কালিমা ধুয়ে মুছে সকলের জীবন মঙ্গলময় ও নির্মল আনন্দে ভরে উঠবে। সবাইকে বৈ-সা-বি ও বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা।