দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই দেশবাসীর এক বিরাট অংশের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তার পত্নী খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেছিলেন শক্ত হাতেই। তার নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার সরকার গঠন করে এবং ওই সময়ে দলটির সাংগঠনিক কাঠামোও বেশ মজবুত ছিল। কিন্তু ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির পর দলের একটি অংশ নিয়ে তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে তথাকথিত সংস্কারের নামে দলে যে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছিল, আজও সেই ক্ষত নিরাময় হয়নি। বরং পরবর্তী সময়ে এমন সব সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ দলটির নেতৃত্ব নিয়েছেন, এর ফলে বিপর্যয়ের দিকেই ঠেলে দেওয়া হয় দলকে।

২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন, ২০১৫ সালের পেট্রোল বোমার আন্দোলন ছিল বিএনপির এ যাবৎকালের সবচেয়ে সর্বনাশা সিদ্ধান্ত। জোট শরিক জামায়াতে ইসলামীর প্ররোচনায় ওই অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্তে বিএনপি 'ল্যাথারিজম' রোগে আক্রান্ত হয়েছে, এমনটি মনে করেন রাজনীতি বিশ্নেষকরা। এর পর ২০১৮ সালে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আদালতের রায়ে দণ্ডিত হয়ে কারান্তরালে চলে গেলে বিএনপিতে ঘনিয়ে আসে ঘোর অমানিশা। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পরপরই তার পুত্র তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়। যদিও তারেক রহমান নিজে আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত এবং দণ্ড এড়াতে লন্ডনে অবস্থান করছেন। তারেক রহমানকে নেতৃত্বে রাখার প্রয়াসে বিএনপি তাদের গঠনতন্ত্রের একটি ধারা বিলুপ্ত করে। ওই ধারায় বলা হয়েছিল, নৈতিক স্খলনজনিত অভিযোগে বাংলাদেশের কোনো বিধিবদ্ধ আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি বিএনপির সদস্য হওয়ার অযোগ্য বলে গণ্য হবেন। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দল চলে যায় তারেক রহমানের একক নিয়ন্ত্রণে।

সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত বিএনপিকে সবল করার জন্য গত কয়েক বছরে নানাবিধ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঘোষণা করা হয়েছে নানা কর্মসূচি। কিন্তু সেগুলোর একটিও সাফল্যের মুখ দেখেনি। এর প্রধান কারণ দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের অনেকের স্বার্থপরতা এবং কমিটি গঠনে নিজের লোক খোঁজা। বর্তমানে দলটির যে পুনর্গঠন কর্মসূচি চলছে, সেখান থেকেও তেমন কোনো আশাব্যঞ্জক খবর পাওয়া যাচ্ছে না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাইকমান্ডের ভুল সিদ্ধান্ত সৃষ্টি করছে অনভিপ্রেত পরিস্থিতি।

বিএনপিতে এখন একনায়কতন্ত্র চলছে- এমন অভিযোগ দলটির একাংশের নেতাকর্মীর। তারা শীর্ষ নেতৃত্বের অনেক সিদ্ধান্তে একমত হতে না পারলেও দল থেকে বহিস্কৃত হওয়ার আশঙ্কায় মুখ বুজে তা মেনে নিচ্ছেন। কারণ দ্বিমত প্রকাশ করলেই নেমে আসছে অব্যাহতি কিংবা বহিস্কারের খÿ। এই খÿের আঘাতে ইতোমধ্যে ধরাশায়ী হয়েছেন বরিশালের মজিবর রহমান সরোয়ার, খুলনার নজরুল ইসলাম মঞ্জু, বগুড়ার গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, রাজশাহীর মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, চাঁপাইনবাবগঞ্জের হারুন-অর-রশীদ, নারায়ণগঞ্জের তৈমূর আলম খন্দকার প্রমুখ নেতা। তারা বিএনপির দুর্দিনের সাহসী ও ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিতি। কিন্তু শীর্ষ নেতার সঙ্গে মতবিরোধের কারণে তাদের ত্যাগ বা দলের প্রতি নিষ্ঠাকে বিবেচনা করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি এখন একজনের ইশারায় চলছে। কেউ বলেন, দলটির 'লন্ডন ব্যুরো' থেকে যেসব নির্দেশনা আসে, মহাসচিব সেসব নির্দেশনার ওপর 'রাবার স্ট্যাম্প'-এর কাজ করেন। দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বলে যা বাজারজাত করা হয়, সেগুলো আসলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের একক সিদ্ধান্ত। প্রচারিত আছে, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে যারা উপস্থিত থাকেন, তারা কিছু বলেন না। শুধু ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বক্তব্য শুনে 'হাত তুলে' সমর্থন ব্যক্ত করেন।

বিএনপিতে কী ধরনের 'একনায়কতন্ত্র' চলছে, তার উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দলটির সিলেট জেলা কাউন্সিলে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, উপজেলা কমিটির সদস্যদের ভোটে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচন হয়েছে। সে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং প্রবীণ বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী। শীর্ষ নেতার চাপে আরিফুল হক চৌধুরী তার প্রার্থিতা প্রত্যাহারে বাধ্য হন। কী চমৎকার গণতন্ত্র জেঁকে বসেছে দলে! কয়েক দিন আগে অনুষ্ঠিত চাঁদপুর জেলা বিএনপির কাউন্সিল অধিবেশনে স্থাপিত হয়েছে আরেক নজির। সভাপতি পদে ভোট পড়েছে মোট ভোটারের চেয়ে দেড়শর বেশি। কোথা থেকে এলো এই অতিরিক্ত ভোট? এ নিয়ে ওই জেলার বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা সামাজিক মাধ্যমে তুলেছেন নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড়। বলা হচ্ছে, দলের শীর্ষ নেতার পছন্দের লোককে সভাপতি পদে জিতিয়ে আনতেই এ কারচুপি করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদীখান উপজেলায় ঘটেছে এক তুঘলকি কাণ্ড। গত ৭ ফেব্রুয়ারি পুরোনো কমিটি ভেঙে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কোনো কারণ ছাড়াই গত ৩০ মার্চ তা ভেঙে দিয়ে নতুন আরেকটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেন, কী কারণে মাত্র এক মাস ২১ দিনের মাথায় একটি কমিটি ভেঙে আরেকটি কমিটি করা হলো, তার অন্তর্নিহিত কারণ কেউ জানে না। পদ হারানোর ভয়ে কিংবা ভবিষ্যতে পাওয়ার আশায় কেউ মুখ ফুটে কিছু বলছেনও না। এ ব্যাপারে ওই এলাকার ক্ষুব্ধ এক নেতা বললেন, নির্বাচনের প্রায় দুই বছর বাকি থাকতে যদি ব্যক্তিবিশেষকে নির্বাচনী এলাকা এভাবে 'ইজারা' দেওয়া হয়, তাহলে ওই এলাকার মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য নেতারা তো হতাশ হয়ে দলীয় কার্যক্রম থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেবেন।

বিষয়টি নিয়ে বিএনপির এক শুভানুধ্যায়ীর সঙ্গে আলাপকালে তিনি বললেন, আপনি তো এখন আর এই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই। তাহলে ওই দলের ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন? তাকে বললাম, মাথা ঘামাচ্ছি দুটি কারণে। এক. দেশে একটি শক্তিশালী বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি থাকা দরকার গণতন্ত্রকে অর্থবহ রাখতে। দুই. আমাদের মতো লাখো কর্মীর রক্ত-ঘামের ফসল এই বিএনপি। জিয়া-খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যে বাগানটি আমরা সাজিয়ে ছিলাম; নতুন মালী তা তছনছ করে দিচ্ছেন। শিরঃপীড়ার কারণ সেটাই।

মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্নেষক