সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত একের পর এক অপরাধজনক ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের জড়িয়ে পড়াটা সচেতন যে কোনো মানুষকে উদ্বেগাকুল না করে পারে না। রোববার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি প্রতারণা, ছিনতাই, বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক, ধর্ষণচেষ্টা, নারীর প্রতি অসম্মানজনক আচরণের মতো অপরাধমূলক ঘটনার উল্লেখ করা হয়, যেগুলোতে বিভিন্ন স্তরের পুলিশ সদস্যের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, গত ২ এপ্রিল টিপ পরার কারণে রাজধানীর ফার্মগেটে এক পুলিশ কনস্টেবল কর্তৃক এক কলেজ শিক্ষিকার হেনস্তা হওয়ার ঘটনা এবং ওই কনস্টেবলকে সমর্থন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিলেটের এক পুলিশ পরিদর্শকের দেওয়া পোস্টের কথা বলা যায়। নববর্ষের দিনে কুমিল্লা নগরীর পার্কে আলাপরত তরুণ-তরুণীর ভিডিও দুই ডিবি সদস্য কর্তৃক বেআইনিভাবে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া; গত বৃহস্পতিবার এক কনস্টেবল কর্তৃক ফেনীতে ১১ বছরের এক শিশু ধর্ষণ; ৮ এপ্রিল ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে প্রতিবেশীর হামলা থেকে বাঁচতে ৯৯৯-এ ফোন করার পর ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর সংশ্নিষ্ট থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের নির্যাতন এবং বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুরে দুই বন্ধুর কাছ থেকে মামলার ভয় দেখিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রায় ১৩ হাজার টাকা আদায়ের মতো ঘটনা উল্লেখ করা যায়। আমাদের উদ্বেগের কারণ হলো, আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব যাদের দেওয়া হয়েছে, তারাই যদি এমন বেআইনি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে ভরসা করার মতো আর কেউ থাকে না।

এটা ঠিক, ব্যক্তি পুলিশের অপরাধের দায় পুরো বাহিনীর ওপর দেওয়া যায় না। কারণ, এতে একদিকে যেমন একটা পরিস্থিতি সম্পর্কে বাড়িয়ে বলার অভিযোগ উঠতে পারে, আরেকদিকে তেমনি বাহিনীটির নৈতিক ভিত্তির ওপর আঘাত লাগতে পারে। অভিজ্ঞতা বলছে, যার নেতিবাচক ফল সাধারণ নাগরিকদেরই বেশি ভোগ করতে হয়। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, দিনশেষে আমাদের জানমালের নিরাপত্তার জন্যে পুলিশ বাহিনীরই দ্বারস্থ হতে হয়। তা ছাড়া দুই লাখ সদস্যের পুলিশ বাহিনীতে উল্লিখিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তা বা কনস্টেবলের সংখ্যা খুব ব্যাপক নয়। শতাংশের হিসেবেও তা খুব আঁতকে ওঠার মতো নয়। তবে যে বিষয়টি আমাদের ভাবাচ্ছে তা হলো, বাহিনীটিরই নিজস্ব পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর গড়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন লঘু-গুরু অপরাধে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। অথচ তাদের মধ্যে মাত্র দুই হাজারের মতো পুলিশ সদস্য সাজা পায়। শুধু তাই নয়, সাজাপ্রাপ্তের বড় অংশই পায় লঘু দণ্ড। বিষয়টা যে শুধু আমাদের ভাবাচ্ছে, তা নয়; পুলিশের অনেক কর্মকর্তাও এতে ভাবিত। সমকালের ওই প্রতিবেদনে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্ৃব্দত করে যেমনটা বলা হয়েছে, 'শুরুতে পুলিশের অনেক ঘটনা বাহিনীর ভেতর থেকেই কেউ কেউ চেপে রাখার চেষ্টা করেন।' এমনটা চলতে থাকলে তা খোদ বাহিনীর মধ্যেই এমন একটা বার্তা দিতে পারে- পুলিশের জন্য সাতখুন মাফ! আর এর সামাজিক পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হকের সঙ্গে আমরা একমত যে, পুলিশ বাহিনীর যেসব সদস্য 'অসংবেদনশীল আচরণ করছে, তাদের বিরুদ্ধে বাহিনীকে অবশ্যই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।' তা ছাড়া প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ বরাবরই উত্তম- তা মেনে যেসব আইন ও প্রবিধানের অধীনে পুলিশ কাজ করে, প্রথমে সেগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে ঢেলে সাজানো দরকার এবং তারপর সেগুলোর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। এর পাশাপাশি বাহিনীর মধ্যে নিয়োগ, পোস্টিং ও প্রমোশনের ক্ষেত্রে যে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আছে, তাও নিরসন করতে হবে। পুলিশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায়ও নজর দেওয়া সময়ের দাবি। যেমন, একটা মানবিক সমাজ গঠনের প্রশ্নে নারী ও শিশু, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, সর্বোপরি সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সব বাহিনীর সংবেদনশীল থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পুলিশ সদস্যদের কত শতাংশ এ মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারবে- এ প্রশ্ন কেউ করলে তাকে অতিরঞ্জনের দায়ে অভিযুক্ত করা যাবে না।