অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতের নানা সংকট দূর করতে ২০১০ সালে গঠন করা হয়েছিল বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি)। কিন্তু পর্যাপ্ত নিজস্ব জনবলের অভাবে এ বোর্ড কখনও সক্রিয় হতে পারেনি। বোর্ড গঠনের দীর্ঘ সাত বছর পর ২০১৭ সালে এখানে নিয়োগ দেওয়া হয় মাত্র ছয়জন নিজস্ব জনবল। এখনও কোনো অফিস গড়ে ওঠেনি জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে। সৃজন করা হয়নি পর্যটনের উন্নয়নে মাঠ পর্যায়ে কোনো পদ। বরং আমলাদের ওপর এ দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে চিঠি দিয়েছে পর্যটন মন্ত্রণালয়।

এক কথায়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, উদাসীনতা আর দোষারোপের জাঁতাকলে সম্ভাবনাময় এ শিল্প রুগ্‌ণ হওয়ার পথে। পর্যটনের উন্নয়ন ও সংরক্ষণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের কাজও থমকে আছে। নেই কোনো আইন ও পরিসংখ্যান।

জেলা পর্যায়ে পর্যটন সেবার মান নিশ্চিত করতে, কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন (সিবিটি) উন্নয়ন, পর্যটন পণ্য ও অবকাঠামো উন্নয়ন, ডেসটিনশন পরিকল্পনা, পর্যটন বাস্তবায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিনিয়োগ, পর্যটক ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা, পর্যটন স্থান তদারকি, মনিটরিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে কার্যালয়, জনবল ও নতুন পদ সৃষ্টির জন্য বোর্ড থেকে একাধিকবার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের।

অনুমোদিত পদও যুক্ত হয়নি প্রবিধিমালায় :মাঠ পর্যায়ে কার্যালয়ের লক্ষ্যে ২০৩টি নতুন পদ সৃজনের প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি)। কিন্তু পর্যটন মন্ত্রণালয় মাত্র ৭৫টি পদ সৃজনের সুপারিশ করে ওই প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২৭টি পদের অনুমোদন দেয়। সর্বশেষ ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর অর্থ বিভাগ মাত্র ১২টি পদের অনুমোদন দেয়। এতে আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যালয় স্থাপনের স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। এদিকে নতুন ১২টি পদ সৃজনের দেড় বছর পরও পর্যটন বোর্ড চাকরি প্রবিধিমালায় সেগুলো যুক্ত করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোকাম্মেল হোসেন সমকালকে বলেন, স্থানীয় পর্যটন স্থানগুলোর সঙ্গে জেলা প্রশাসন জড়িত। তাই প্রতিটি জেলায় সহকারী কমিশনার (পর্যটন) ও এডিসি (পর্যটন) পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাবেদ আহমেদ বলেন, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে অফিসের জন্য জনবল বাড়াতে আমাদের দেওয়া প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। যদিও পর্যটন শিল্পের প্রচারে বিদেশেও অফিস চালু করা জরুরি। পর্যটকবহুল দেশগুলোয় নিজস্ব অফিস ও জনবল থাকলে প্রচার ও প্রমোশনের কাজগুলো নতুন মাত্রা পেত। দেশেও অন্তত বিভাগীয় পর্যায়ে অফিস থাকা দরকার।

তিনি বলেন, অনেক দেশের দূতাবাস এখন ট্যুরিজম নিয়ে ব্যাপক কাজ করছে। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড থেকে বাংলাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়েছে। ভারত, মালয়েশিয়া, তুরস্কসহ আরও কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি আছেন এ দেশে। তারা তাদের প্রচারে এ দেশের লোকজনকেও কাজে লাগাচ্ছেন।

বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড আইন-২০১০ এর ৫-এর ২ ধারায় বলা হয়েছে- বোর্ড প্রয়োজনে দেশের বা বিদেশের যে কোনো স্থানে শাখা কার্যালয় স্থাপন করতে পারবে। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত পর্যটন করপোরেশন মূলত হোটেল-মোটেল ব্যবসাকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। তাই পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে ২০১০ সালে পর্যটন বোর্ড গঠন করা হয়। তবে এ বোর্ডের ক্ষমতায়নে কোনো আইন ও নীতিমালা করা হয়নি। এ খাতের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমও মূলত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

যা চাইছে মন্ত্রণালয়:পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, তাতে স্থানীয়ভাবে এ শিল্প দেখভালের জন্য প্রতিটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি সহকারী কমিশনার (পর্যটন) এবং পর্যটনসমৃদ্ধ ১৩টি জেলায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (পর্যটন) পদ সৃজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর পর এ কার্যাবলি সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকদের দায়িত্ব দিতে বলা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুজ্জামান ভূঁইয়া জানান, পর্যটন শিল্প এডিসির অধীনে গেলে পর্যটনসংশ্নিষ্ট লোকজন কাজ করার সুযোগ কমই পাবেন। যারা পর্যটন জানেন-বোঝেন, তাদের এখানে পদায়ন করতে হবে। জেলায় জেলায় পর্যটনের কার্যালয় করা গেলে এ শিল্প মানুষের আরও কাছে পৌঁছে যাবে। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যটন আলাদা একটি বিষয়। এ বিভাগের সদস্যদের যদি এ সেক্টরে যুক্ত করা যায়, তাহলে তাদের চিন্তা-চেতনা ও কর্মপরিকল্পনায় পর্যটনও নান্দনিক হয়ে উঠবে।

বর্তমানে পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান ৩ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। দেশে পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং ২০২৮ সালের মধ্যে জিডিপিতে ৬ দশমিক ২ শতাংশ ভূমিকা রাখার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। বিশ্বব্যাপী পর্যটক আকর্ষণের ৭টি উপাদান নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, ঋতুবৈচিত্র্য ও উৎসব, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং আতিথেয়তার মধ্যে যে কোনো তিনটি থাকলে দেশটিকে শ্রেষ্ঠ তালিকাভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশে এই ১২টির প্রায় সব বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান।

ট্যুরিজম বোর্ডের ওয়েবসাইটের বেহাল দশা: ট্যুরিজম সমৃদ্ধ দেশগুলোর সমৃদ্ধ ওয়েবসাইট রয়েছে। ভ্রমণ গাইড, ভিসা আবেদনসহ নানা তথ্য জানা যায় সেসব দেশের দূতাবাসের ওয়েবসাইটে। অথচ বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ওয়েবসাইটে দেশের পর্যটন বিষয়ে উল্লখযোগ্য কোনো তথ্যই নেই। ওয়েবসাইটে বিদেশি দূতাবাসের ঠিকানা নামে এন্ট্রি থাকলেও সেখানে একটি দূতাবাসের নামও নেই। রয়েছে বিদেশি পর্যটন সংস্থার সংক্ষিপ্ত নাম। কিন্তু প্রবেশের কোনো লিংক নেই। এভাবে হযবরল অবস্থায় চলছে ট্যুরিজম বোর্ডের কার্যক্রম।

অর্ধ যুগ আগে ট্যুরিজম বোর্ড ঘোষণা করেছিল, প্রতি বছর পর্যটক সংখ্যা ১৫ শতাংশ হারে বাড়ানো হবে। কিন্তু সংস্থাটির কাছেই নেই নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান। নেই হোটেল-মোটেলের হিসাব। কতজন পর্যটন খাতে জড়িত, তাও জানে না সংস্থাটি। ফলে স্থল, নৌ ও আকাশপথে আগত বিদেশি নাগরিকদের মোট সংখ্যা থেকে ধরে নেওয়া হয় পর্যটকের সংখ্যা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের হিসাবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট যাত্রীর সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ১০ হাজার ৫৮১। এর মধ্যে বিদেশি পর্যটক ২ লাখ ৪৯ হাজার ২২৪ জন। ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট যাত্রীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৪। এর মধ্যে বিদেশি পর্যটক ৫৬ হাজার ১৭৫ জন।