বুকার প্রাইজপ্রাপ্ত অরুন্ধতী রায় ভারতীয় লেখক, চিন্তক ও অ্যাকটিভিস্ট। তার এ সাক্ষাৎকার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল বিষয়ক মার্কিন অনলাইন সাময়িকী সেন্ট লুইসে ২২ এপ্রিল প্রকাশিত হয়। তবিয়া ইবিতায়ও গৃহীত সাক্ষাৎকারটির নির্বাচিত অংশ সমকালের জন্য ভাষান্তর করেছেন সাইফুর রহমান তপন।

আপনার 'ট্রিকল ডাউন রেভল্যুশন' বা চুইয়ে পড়া বিপ্লব প্রবন্ধটি আমি পড়েছি। সেখানে আপনি বলেছেন ভয়ংকর ভুল পথে চলা আমাদের পৃথিবীটাকে সঠিক পথে আনতে হলে প্রথমেই ভিন্ন ভাবনার মানুষদের নির্মূলের অভিযান বন্ধ করতে হবে। এর মানে কী?
আমার 'মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস'সহ বেশ কিছু ফিকশন ও ননফিকশন শুরু হয়েছে ড্যামবিরোধী ও উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলনের সাফল্য উদযাপনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তারপর থেকেই ভারতে অন্ধকার নেমে আসতে শুরু করে। এখন আপনি এখানকার রাজপথে পাবেন গণপিটুনিতে মানুষ মারতে উদ্যত জনতা; এমনসব মানুষ যারা আক্ষরিক অর্থেই ঘৃণা ছড়াচ্ছে, মুসলিম নারীদের ধর্ষণ করতে আহ্বান জানাচ্ছে; যারা তাদের জাতীয়তাবাদী বুলি-বচনের সঙ্গে একমত হবে না, তাদের খুন করার আহ্বান জানাচ্ছে। অর্থাৎ শারীরিকভাবে আঘাত ছাড়া এখন আর কোনো কথা নেই। আর এসবের ফলে মানুষের মাঝে যে আতঙ্ক জন্মাচ্ছে তা মাঝে মাঝেই বিস্ম্ফোরিত হচ্ছে বিভিন্ন গণআন্দোলনে। উদাহরণ হিসেবে নাগরিকত্ব আইনবিরোধী বিক্ষোভের কথা বলা যায়, যে আইনটি পাস হয়েছিল ২০১৯ সালে মূলত মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্য তৈরির লক্ষ্যে। তারপর আসল কৃষকবিরোধী তিনটি আইনের বিরুদ্ধে বছরব্যাপী কৃষক আন্দোলন, যা আন্দোলনকারীদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

তবে এরপর আবার ডানপন্থি গ্রুপগুলো সংগঠিত হয়। আজকেও আপনার সঙ্গে যখন আমি কথা বলছি তখন এক ডানপন্থি নেতা আক্ষরিক অর্থেই হিন্দুদের সশস্ত্র হয়ে গণহত্যায় লিপ্ত হতে আহ্বান জানিয়েছেন। 'কাশ্মীর ফাইলস' নামে একটা ছবি বানানো হয়েছে; যা দেখতে হলে দলীয় ক্যাডারদের ভাগ করে পাঠানো হয়েছে; সেখানে গিয়ে ওই ক্যাডাররা স্লোগান দিয়েছে- মুসলিম নারীদের অন্তঃসত্ত্বা বানাও, হিন্দু জাতীয়তাবাদে অবিশ্বাসী হিন্দুরা মুসলিমদের চেয়েও বড় বিশ্বাসঘাতক। এক সময় যে হুমকি ছিল বক্তৃতা-বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ, এখন তা শারীরিক আঘাতের পর্যায়ে নেমে এসেছে।

কাশ্মীর ফাইলস নিয়ে বলতে গিয়ে যেসব স্লোগানের কথা বললেন সেগুলোর আতঙ্কজাগানিয়া ভিডিও আমি দেখেছি। তবে এর আগে আপনি একবার বলেছিলেন, ভারত নিজেকে লিঞ্চিং নেশনে (গণপিটুনিতে মানুষ হন্তারক জাতিতে) পরিণত করেছে। এর মানে কী?
আপনি যদি ওই ফিল্মটি দেখেন, দেখবেন সত্যের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নিজে মানুষকে বলছেন, 'এ-ই হলো সত্য, প্রত্যেকটি মানুষের তা দেখা উচিত।' তারা এমনকি পুলিশ ও সরকারি কর্মীদেরও ছবিটি দেখার জন্য ছুটি দিয়েছে। ছবিটির পরিচালক দাবি করেছেন, ছবির সব ঘটনা সত্য, অথচ ছবিটি শুরু হয়েছে এ কথা বলে যে, 'এটি একটি কাল্পনিক কাজ।' ছবিটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাশ্মীরি পণ্ডিতদের নিয়ে থাকেনি; সেখানে কাশ্মীরি পণ্ডিত বলতে ভারতের সব হিন্দুকে বোঝানো হয়েছে আর বলা হয়েছে দেখ, মুসলিমরা কত খারাপ, তারা কসাইয়ের মতো কেবল জবাই ও খুন করে। অথচ বাস্তবে কাশ্মীরে এখনও বহু পণ্ডিত বাস করেন; তারা মুসলিমদের সঙ্গে বন্ধুত্বেরও চর্চা করেন। গত ৩০ বছরে সেখানে ৬১৯ জন পণ্ডিত খুন হয়েছেন, কিন্তু ছবিটি দেখলে মনে হবে, পণ্ডিতদের সবাই হয় জবাই হয়েছেন, নয় সেখান থেকে বিতাড়িত হয়েছেন।
গোটা কাশ্মীর ছেয়ে আছে মুসলিমদের কবরে। কিন্তু তার চিহ্নও ছবিটিতে পাওয়া যাবে না। ছবিটা দেখে আমার একটা শব্দই মাথায় এসেছে- তেজস্ট্ক্রিয়তা। একটা ছবিকে যদি কোনো অস্ত্রের সঙ্গে তুলনা করতে হয় তা হবে তেজস্ট্ক্রিয় অস্ত্র, যা মাটিতে ফেলা হয়েছে, এখন এর হাফ-লাইফ চলছে, এবং তা চলতেই থাকবে। কারণ তেজস্ট্ক্রিয় পদার্থের আয়ু সহসা শেষ হয় না।

'আমার লকডাউন-উত্তর দিবাস্বপ্ন' প্রবন্ধে আপনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধারাবাহিকভাবে ফাঁপা করে দেওয়া হয়েছে বলতে কী বুঝিয়েছেন?
পুরো বিষয়টি অবশ্য এখন বেশ জটিল হয়ে পড়েছে। ১৯৯০-এর দশকে একগুচ্ছ বিকাশমান রাজনৈতিক দল ছিল, যারা নিজেদের হয় দলিতের দল বলত, নয়তো বলত- আমরা 'পিছিয়ে পড়া অন্য গোষ্ঠীগুলোর (ওবিসি)' প্রতিনিধি। দলিত আর ওবিসি একসঙ্গে হলে তারাই ভারতের সংখ্যাগুরু জনগণ হবে। কিন্তু গত দুটো নির্বাচনে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ওই দলগুলোকে একবারে গোহারা হারিয়েছে। দলিত পার্টি, যা আসলেই আম্বেদকারের আদর্শ ধারণ করে, সাম্প্রতিক উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে মাত্র একটা আসন পেয়েছে; তা-ও যিনি পাস করেছেন তিনি দলিত নন। ভারতে বর্তমানে যে ধরনের জাতীয়তাবাদ আধিপত্য চালাচ্ছে, এবং সেই সঙ্গে যে মুসলিমবিরোধী মেরূকরণ চলছে, তা সব সমীকরণ উল্টে দিয়েছে। এতে লকডাউনে মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ, বেকারত্ব, নোটবন্দি বা নিষ্ঠুরতার মতো বিষয়গুলোর ঠাঁই হয়নি।

আমার প্রবন্ধগুলোতে ১৯৬০-এর দশকের বিপ্লবী আন্দোলনের কথা বলেছি- যেখানে জমি, সম্পদের সুষম বণ্টনের দাবি উঠেছিল। সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপর এলো উন্নয়নের নামে জমি বা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ ঠেকানোর আন্দোলন; তা-ও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপর এলো এমন একটা সময়, যখন মানুষ জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইনের জন্য লড়াই করল, যে আইনে গ্রামের গরিব মানুষের জন্য বছরে নূ্যনতম মজুরিসহ অন্তত ৯০ দিনের কাজের ব্যবস্থা হয়। আর আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, মানুষ মোদিকে ভোট দিচ্ছে নিছক পাঁচ কিলো চাল, এক কিলো চিনির মতো কিছু রেশন পাওয়ার আশায়। তারপরই এলো মুসলিমদের পায়ের নিচের মাটি সরিয়ে নেওয়ার জন্য নাগরিকত্ব সংশোধন আইন। এ আইন বলে আপনি মুসলিমদের বোঝাতে চেয়েছেন, তোমরা কোনোদিনই এ দেশের নাগরিক ছিলে না, তোমাদের জায়গা হলো বন্দিশিবিরগুলো; তবে এদের সংখ্যা এত বেশি যে, এত বন্দিশিবির বানানো কঠিন। রাষ্ট্র সম্পর্কে যখন ভাবতে যাবেন, তখন দেখতে পাবেন আপনি এমন একটা রাষ্ট্রে আছেন, যেখানে আপনার কোনো অধিকার নেই। ভাবতে পারেন, শুধু গত বছর খ্রিষ্টানদের ওপর তিনশ হামলা হয়েছে!

ভারতে সবাই সংখ্যালঘু- হয় বর্ণবিচারে, নয় আঞ্চলিকতার বিচারে; ধর্ম ও নৃতাত্ত্বিক বিচারেও সবাই সংখ্যালঘু। ফলে এখানে যে হিন্দু জাতির মতো কিছু একটা তৈরির মধ্য দিয়ে এক ধরনের সংখ্যাগুরুবাদের চর্চা চলছে তার আসলে কোনো ভিত্তি নেই। বড় নিষ্ঠুর এ প্রক্রিয়া। ড. আম্বেদকর তার 'বর্ণপ্রথার উচ্ছেদ' প্রবন্ধে লিখেছিলেন, শ্বেতাঙ্গরা কালো মানুষের বিরুদ্ধে যে বর্ণবাদী আচরণ করছে ভারতের বর্ণপ্রথার সঙ্গে তার একটা পার্থক্য আছে। এখানকার বর্ণপ্রথা অনেক অনেক বেশি সচেতনভাবে তৈরি একটা শ্রেণিব্যবস্থা, যেখানে কিছু মানুষ আমৃত্যু নিপীড়কের ভূমিকায় থাকে এবং অন্যরা আমৃত্যু নিপীড়িতই হয়। অর্থাৎ আপনি এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করে রেখেছেন, যেখানে সবাই এ শ্রেণিভাবনার মধ্যে আটকে আছে।

এমন পরিস্থিতিতে কোনো আশার আলো দেখেন?
আশা কিংবা সুখ- কোনোটাই একটা প্রাতিষ্ঠানিক বস্তু বা অট্টালিকা নয়; যা আপনি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করতে পারেন। আমি মনে করি, এগুলো থাকে মানুষের বোধশক্তির মধ্যে; আর বোধশক্তি হলো একটা কিছু আপনি যে রকম দেখতে চেয়েছেন বা যে রকম হওয়া উচিত বলে মনে করেন, তা সে রকমটা না হলেও তাকে মেনে নেওয়া। আপনাকে এটা মানতে রাজি থাকতে হবে যে, আমাদের সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে- আমাদের মানে সব ধরনের মানুষ; আমাদের অবশ্যই এমন একটা পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে।
গত বছর যে কৃষক আন্দোলন হলো, তা ছিল সত্যিই ঐতিহাসিক এক আন্দোলন। এ আন্দোলন করতে গিয়ে চাষিরা একটা বছর দিল্লির বাইরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করলেন। তাদের মধ্যে অনেক দ্বন্দ্ব ছিল; সেখানে শোষিত চাষিরা যেমন ছিলেন, তেমনি এমন চাষিরাও ছিলেন, যারা দশকের পর দশক তাদের শোষণ করেছেন। সেখানে ভূমিহীন চাষিরা ছিলেন আবার শত শত বছর ধরে যে ভূস্বামী ও বড় চাষিরা তাদের শোষণ করে আসছেন, তারাও ছিলেন। উভয় পক্ষ নিজেদের মধ্যে আলোচনার একটা পরিসর তৈরি করতে পেরেছিল। তারা এটা বুঝেছিলেন যে, দেশে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি চলছে তা চলতে দিলে উভয়কেই ডুবতে হবে। এই যে অন্যকে হেয় না করে, কাউকে আদর্শিকভাবে শিরশ্ছেদ না করে, কোনো ঘটনাকে ছোট করে না দেখে এবং সর্বোপরি নিজের কুঠরিতে বসে না থেকে, একই লক্ষ্যে সবাই মিলে আন্দোলন করা- তার চেতনাই ভারতের বর্তমান মহাক্ষমতাধর সরকারকে তার আবিস্কৃত তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহারে বাধ্য করেছে। এটাই মানুষকে আশা জোগায়।

রাজপথে, শ্রেণিকক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানেই পারা যায় সেখানে আমাদের জায়গা করে নিতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে, নির্বাচনের মাধ্যমে হয়তো আমরা কোনো পরিবর্তন দেখতে পাব না, কারণ নির্বাচনে একটা দল অন্য দলের কাছে সব সময়ই পরাজিত হয়। আমাদের এর চেয়ে বেশি কিছু করার কথা ভাবতে হবে। আমরা হয়তো জাহাজটার গতিপথ পাল্টে তাকে তীরে ভিড়তে বাধ্য করতে পারব না; তবে আমরা অন্য একটা উপকূল খুঁজে পেতে পারি।