আমেরিকার শিকাগো নগরীতে শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিল পুঁজিবাদীদের অস্ত্রের আঘাতে; আজ থেকে ১৩৬ বছর আগে, ১৮৮৬ সালে। রক্তঢালা পহেলা মে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এবং দাবির যৌক্তিকতা সম্পর্কে দ্বিমত না থাকায় দিবসটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণির দিবস হিসেবে স্বীকৃতিও অর্জন করেছিল। সেই স্বীকৃতি আজও বহাল আছে।

দিনটি শ্রমিক শ্রেণির জন্য পরাজয়ের দিন নয়; বিজয়ের দিন, অর্জনের দিন। ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের দিন। মনে রাখা দরকার- ওই সংগ্রাম সংগঠিত করতে প্রত্যয়বদ্ধ কেন হয়েছিল আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণি? মার্কিন পুঁজিপতিরা যূথবদ্ধভাবে দিবারাত্র কাজ করতে বাধ্য করত তাদের নিয়োজিত শ্রমিকদের প্রায় প্রতিদিন এক দিনের বেতনের বিনিময়ে। তাতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যহানি ঘটছিল; পারিবারিক সমস্যা-সংকট সৃষ্টি হচ্ছিল। তাই তারা স্থির করল, প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজ করবে। ক্ষুব্ধ মলিক এবং সরকার এ দাবি মানতে নারাজ। শ্রমিক শ্রেণিও এই ন্যায়সংগত দাবি ছাড়তে নারাজ এবং তারা এ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের কর্মসূচি নিতে বাধ্য হলো। ওই ন্যায়সংগত আন্দোলন দমনের লক্ষ্যেই পুলিশের গুলিতে ওই নগরীর রাজপথ শ্রমিকদের রক্তে লাল হয়েছিল। কিন্তু সে রক্ত বৃথা যায়নি।

১ মে'কে মে দিবস হিসেবে ঘোষণা করে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সরকার ছুটি ঘোষণা করে। এর মধ্যে বাংলাদেশও একটি। মে দিবস শুধু আট ঘণ্টা কাজের দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্রমে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিটি কারখানার শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন দেশে বাজারদর অনুযায়ী নূ্যনতম মজুরি, আবাসন, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার সুযোগ, মাতৃত্বকালীন ছুটি, উৎসব ভাতা, সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা প্রভৃতি ন্যায়সংগত মানবিক দাবি। এই দাবিগুলো কোনো কোনো পুঁজিবাদী দেশে পুরোপুরি মেনে নেওয়া হলেও অন্য কিছু দেশে দাবিগুলোর আংশিক মেনে নেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও আদৌ মানা হয়নি। নীতিগতভাবে কোথাও কোথাও মানলেও তা পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি। তবে কমবেশি লড়াই সর্বত্রই চলছে। শ্রমিক শ্রেণি মালিকপক্ষের শোষণের শিকার আজ সব দেশেই। তাই এর জন্য যতদিন এই শোষণ বজায় থাকবে, ততদিন এ জাতীয় সংস্কারমূলক দাবি-আন্দোলনও বজায় থাকবে। শোষণমুক্তির দাবি বোধগম্য কারণেই পৃথিবীর কোনো দেশের পুঁজিবাদীরা মেনে নিতে নারাজ। তাই ধীরে ধীরে পুঁজিবাদের শৃঙ্খলমুক্তির আন্দোলন পৃথিবীর দেশে দেশে গড়ে উঠতে থাকে।

মার্কসীয় তত্ত্বকে ধারণ করে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় সেখানকার শ্রমিক শ্রেণি ও মেহনতি মানুষের চরম শত্রু জারের শাসনের উচ্ছেদ ঘটিয়ে শ্রমিক শ্রেণির পার্টি ক্ষমতা দখল করে। ওই আন্দোলনই রুশ বিপ্লব হিসেবে পরিচিত। রুশ বিপ্লব রুশ সমাজব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে ওঠে এই ঐক্যের পক্ষে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণি তাতে সমর্থন জানায়। সমর্থন জানায় মধ্যবিত্ত পুঁজিবাদী সম্প্রদায়ও। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিবাদী শক্তির পরাজয় ঘটে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদও অতিশয় দুর্বল হয়ে পড়ে; ঔপনিবেশিকতাবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম নতুন মাত্রা অর্জন করে এবং ভারতসহ এশিয়া-আফ্রিকার স্বাধীনতাকামী বহু দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। এই পরিস্থিতির মধ্যে অর্থাৎ পুঁজিবাদের পরাজয়জনিত শূন্যতার সুযোগে আমেরিকা সেই শূন্যতা পূরণে উঠেপড়ে লাগে। মুখে গণতন্ত্র, স্বাধীনতার কথা বলে নতুন পদ্ধতিতে পুনরায় বিশ্বব্যাপী শোষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়। ইতোমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুত একটি শোষণমুক্ত উন্নত দেশে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রমিক শ্রেণির আধিপত্য। বিশ্বে নতুন ইতিহাস রচিত হয়। শোষিত, নির্যাতিত শ্রমিক শ্রেণি ও মধ্যবিত্ত তরুণ সমাজ বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে তোলে। সব দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বোত্তম বন্ধু হিসেবে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসে। বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম এবং আরও বহু দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বাত্মক সমর্থন, ভারতসহ সব গণতান্ত্রিক দেশের বিপুল সাহায্যে সাফল্য অর্জন করে। সীমিত পরিমাণে হলেও বা পূর্ণাঙ্গভাবে না হলেও শ্রমিক শ্রেণির শোষণমুক্তির দাবি ধীরে ধীরে সর্বত্র প্রসারিত হতে থাকে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে ১৯১৯ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। গড়ে ওঠে শান্তি ও স্বাধীনতার বার্তা নিয়ে জাতিসংঘ। অন্যদিকে যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী স্লোগান ধারণ করে গড়ে ওঠে বিশ্ব শান্তি পরিষদ।

একটানা ৭৪ বছর সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্ষমতায় থাকে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সে দেশের শ্রমিক শ্রেণির পার্টি; বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণির অকৃত্রিম বন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি। দীর্ঘ সময় ধরে শাসনকালে ওই সরকার বিশ্বব্যাপী যেমন বহু কল্যাণকর কাজ করেছে; সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণের অপরিসীম কল্যাণ সাধন করেছে; ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অভাব, বেকারত্বের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে; তেমনই এ কাজ করতে গিয়ে কিছু ভুলভ্রান্তি হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। আর তা হয়েছেও। ১৯৮১ সালে মস্কো সফরে গিয়ে তা চোখে পড়েছে। তা হলো অভাবমুক্ত যুবসমাজ আরও ভালো থাকা, আরও ভালো পোশাক-পরিচ্ছদের আকাঙ্ক্ষা থেকে আমেরিকান জিন্সের প্যান্ট-কোট পছন্দ করলেও সরকার তা আমদানি না করায় তারা একদিকে চোরাকারবারি বাধা, সরকারের অক্ষমতা বা দুর্বলতা মনে করে ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী হয়ে ওঠে। টুথপেস্ট জাতীয় অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মান আশানুরূপ ভালো না থাকা; সরকারের খারাপ কাজেরও সমালোচনা করার অধিকার না থাকা; সংবাদপত্রে কোনো সমালোচনামূলক খবর প্রকাশের সুযোগ না রেখে একতরফা সরকারের গুণকীর্তনের মাধ্যমে পত্রিকা এবং সব প্রচারমাধ্যমকে সরকারি প্রেসনোট প্রচারের হাতিয়ারে পরিণত করায় যুবসমাজের মধ্যে সরকারবিরোধী মনোভাব গড়ে ওঠে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের গোপন ও প্রকাশ্যে পরিচালিত নানাবিধ চক্রান্ত। দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত এসব চক্রান্তের সঙ্গী হয় সোভিয়েত গোয়েন্দা বাহিনীর একাংশ। আজকের পুতিনও ওই গোয়েন্দা বাহিনীরই একজন কর্মকর্তা ছিলেন। পরিণতিতে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে ১৯৯১ সালে মহাবিপর্যয় ঘটে যায়। পুঁজিবাদ সমর্থক সরকার গঠিত হয়। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের অপরাপর দেশেও অনুরূপ ঘটনা ঘটে। এই বিপর্যয়ের মুখে শ্রমিক শ্রেণি হয় সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত। তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীন দেশগুলোতেও গণতন্ত্রবিরোধী এবং ধর্মান্ধ অপশক্তির উত্থান ঘটে।

পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণ, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল স্থাপনে বিরোধিতা, বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধিতা, সমাজে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানোর ফল আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ নানাভাবে ভোগ করছে। শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত শ্রমিকরা এই ষড়যন্ত্রের পরও সজাগ হতে পারেনি। সক্রিয় হতে পারেনি বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক ও যুবসমাজ। মে দিবসের চেতনা আবার বিশ্বকে জাগাবে। এখনও ভিয়েতনামসহ কয়েকটি এশিয়ান, লাতিন আমেরিকান ও ইউরোপীয় দেশ আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে।

রণেশ মৈত্র: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলাম লেখক