কাশ্মীরের সংস্কৃতি ছিল মুসলমান, হিন্দু ও জৈনদের বিচিত্র জীবনযাপনের মিশ্র অবস্থান। এদের অনেকের জীবনই একদিকে রাষ্ট্রশক্তি ও হিন্দুত্ববাদ, অন্যদিকে ইসলামী উগ্রবাদের সাঁড়াশির চাপে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। তারই একদিকের অতিরঞ্জিত ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে বিবেক অগ্নিহোত্রীর 'দ্য কাশ্মীর ফাইলস' চলচ্চিত্রে, যা পুরো ভারতে ঝড় তুলেছে। দুইশ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে ছবিটি। ছবিটি প্রচারের ভার যেন নিয়েছিলেন স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিজেপি শাসিত রাজ্য সরকারগুলো সরকারি কর্মচারীদের ছুটি দিয়েছে ছবিটি দেখার জন্য। বিজেপি নেতারা সদলবলে ছবিটি দেখতে গিয়েছেন সিনেমা হলে। একাধিক রাজ্যে ছবিটির কর মওকুফ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ছবিটি ঘিরে প্রতিহিংসামূলক, ইসলামবিদ্বেষী পোস্ট হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। সারাদেশের বিভিন্ন সিনেমা হলে গেরুয়া বাহিনী দর্শক আসনে বসে স্লোগান দিচ্ছে- 'বলুন, এই অত্যাচার আপনারা মানবেন?' আবেগে দর্শকরা বলছে- 'না; মানব না।' পাল্টা প্রশ্ন আসছে- 'বদলা নেবেন না?' ছবিজুড়ে হিংসার দৃশ্য দেখে হলের অনেকেই চিৎকার করছে- 'বদলা চাই'। হিন্দুত্বের এই ডুপিংটিই চালিয়ে দিতে চাচ্ছে গেরুয়া শক্তি।

আপাতভাবে ছবিটি কাশ্মীরি পণ্ডিতদের নব্বই দশকের গণহত্যা ও বিতাড়ন-বিষয়ক। বাপের সামনে ছেলেকে হত্যা, স্ত্রীকে স্বামীর রক্তমাখা ভাত খাওয়ানো, নারীকে বিবস্ত্র করে দুই টুকরো করা- হিংসার বিষয়টি এতটাই প্রকট করে দেখানো হয় যে, তা প্রতিহিংসার জন্ম দেওয়ার পক্ষে অনুকূল। দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে প্রচুর সাহিত্য রচনা ও সিনেমা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন কালে বিক্ষুব্ধ সময়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সাহিত্য এবং চলচ্চিত্র। কাশ্মীরের পণ্ডিতদের ছিন্নমূল হওয়ার কষ্ট নিয়ে এর আগেও লেখা হয়েছে স্মৃতিকথা- 'আওয়ার মুন হ্যাজ ব্লাড ক্লটস' (রাহুল পণ্ডিত); হয়েছে বলিউডের ছবি- 'শিকারা' (বিধুবিনোদ চোপড়া)। 'দ্য কাশ্মীর ফাইলস' ছবিটি যতই ব্যবসাসফল প্রদর্শনী করে থাকুক; যতই হিন্দুত্ববাদী সেন্টিমেন্টকে চাঙ্গা করুক;

ইতিহাস একদিন তার অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট কথাই বলবে- তা কি সাদা প্রোপাগান্ডা, না কালো প্রোপাগান্ডা ছিল?

ইতিহাসকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুল ব্যাখ্যা কিংবা খণ্ডিত ব্যাখ্যা করে সমাজে ঘৃণা ও বিদ্বেষের বাতাবরণ গড়ে তুলতে চাইছে মৌলবাদী শক্তি। এমন চেষ্টা দেখছি ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তির কাছ থেকে অহরহ। একই সুর বেজে উঠেছে 'আওয়ার মুন হ্যাজ ব্লাড ক্লটস' বইটিতেও। নিপীড়িত চরিত্রটিকে হিন্দুত্ববাদীরা প্রতিহিংসার বাণী শোনাতে এলে সে বলে- 'বাড়ি হারিয়েছি আমি, মনুষ্যত্ব নয়।' কিন্তু 'দ্য কাশ্মীর ফাইলস' ঠিকই দিব্যি ভুলে গেল, ১৯৯০ সালে ভূস্বর্গে যখন হিন্দুদের ওপর আক্রমণ নেমে এসেছিল, তখন বিজেপি কংগ্রেসের চেয়ে কম আসন পেয়েও শুধু বিজেপি আর সিপিএমের সমর্থন নিয়ে ভারতের ক্ষমতায় ছিল ভিপি সিং সরকার। কাশ্মীরে যখন পণ্ডিতরা মার খাচ্ছে, তখন ভিপি সিং ছিলেন নির্বিকার। কেননা, বিজেপির কাছে তখন এর থেকেও অনেক বড় ইস্যু ছিল বাবরি মসজিদ। কাশ্মীর ফাইলস রাষ্ট্রযন্ত্রের এ ক্ষমতাকে পাশ কাটিয়ে গেছে।

২০২৪-এর নির্বাচন সামনে রেখে মোদির বিজেপি আজ 'দ্য কাশ্মীর ফাইলস' নিয়ে বড় স্পর্শকাতর। বর্তমান ভারতে যখন মুসলমানদের খাবার ও পোশাকে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়; তাদের নাগরিকত্ব হরণের আইন পাস হয়; যখন হিন্দু ধর্ষকদের সমর্থনে মিছিল বের করা হয়; যখন ৩৭০ ধারা রদ হয়; তখন এ ছবিটির একপক্ষীয় নির্যাতনের গল্প ফ্যাসিজমের নতুন একটি বার্তাই কি দেয় না? ছবিটি যদি সত্যিই কাশ্মীরি পণ্ডিতদের প্রতি সমব্যথী হতো, তবে প্রশ্ন করা উচিত ছিল- কেন ৩২ বছরেও তাদের পুনর্বাসন করা হয়নি? এমনকি বিজেপি শাসনে ৩৭০ ধারা বাতিলের পরও? একটি সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার হবে, আর প্রশাসন বা রাষ্ট্রযন্ত্রকে দায়ী করা হবে না- তা কি একপক্ষীয় দৃষ্টিকোণের বিচার নয়? ভারসাম্য বজায় রাখাটা পুলিশ ও আমলাদের দক্ষতার একটি দিক হওয়া উচিত। সরকার এবং রাষ্ট্র যাতে বিপাকে না পড়ে, সেটা দেখা তাদের কাজ। কেননা, পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে সরকার কাজ করে। বিষয়টি একটু ভালোভাবে বুঝতে চাইলেই অন্তত এটুকু বোঝা যায়, কাশ্মীরের পণ্ডিতদের রক্ষা করার দায় কি কারও ওপর ছিল না? সিনেমাটি এই সত্যটা ভুলে গেল কেমন করে?

সুধীর সাহা: কলাম লেখক
ceo@ilcb.net