বাংলাদেশে মূলধারার রাজনীতিতে শিক্ষিত মানুষের সম্পৃক্ততা গত ৪০ বছরে অনেক কমে গেছে। এ প্রসঙ্গে রাজনীতিক ও শিক্ষিত ব্যক্তিদের সাধারণত দুই ধরনের অভিমত পাওয়া যায়। রাজনীতিকরা দোষ চাপান শিক্ষিত ব্যক্তিদের ঘাড়ে। তারা বলেন, শিক্ষিতরা রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান না। অন্যদিকে, শিক্ষিতরা সম্পূর্ণভাবে রাজনীতিকদের দায়ী করেন এই বলে, রাজনীতিতে সহাবস্থানের তেমন সুযোগ বা পরিবেশ নেই।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি পাশ্চাত্যের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাশ্চাত্যে যারা রাজনীতি করেন, তারা অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ বা বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা দক্ষ ও রাজনীতি-সচেতন। সেখানে ছাপোষা সাধারণ মানুষ রাজনীতি-সচেতন হলেও তারা মূলত মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন না। রাজনীতিতে সেখানে চলে ব্যক্তির মেধা আর যোগ্যতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এ অঞ্চলে রাজনৈতিক দলগুলো একেকটা রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে। তাই, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মতো আমাদের দেশে রাজনীতি মূলত সবার জন্য উন্মুক্ত। কারণ, এখানে কোয়ালিটির সঙ্গে কোয়ান্টিটিও লাগে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি এখানে আছে জয়-পরাজয়ের খেলা।

আমাদের স্বাধীনতাপূর্বকালে বা তদানীন্তন সমাজে অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, তাজউদ্দীনসহ জাতীয় চার নেতা, মোজাফ্‌ফর আহমদ, কামাল হোসেন; সবাই শিক্ষিত মানুষ। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এ দেশের কিংবদন্তিতুল্য রাজনীতিবিদ হয়ে আছেন। স্বাধীনতার প্রাক্কালে ভাসানীর মতো অনেকেই এ দেশের মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন, যাদের অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। কিন্তু তাদের দূরদর্শিতা আর বাস্তবের রাজনৈতিক জ্ঞান তাদের রাজনীতির মাঠে এগিয়ে দিয়েছিল খানিকটা। তাদের মধ্যে ছিল দেশপ্রেমও।

হাল আমলে সৎ-শিক্ষিত ব্যক্তিরা অবমূল্যায়িত হতে হতে অনেকেই রাজনীতি থেকে দূরে চলে গেছেন। শিক্ষিত আলোকিত মানুষের রাজনৈতিক মূল্যবোধ কখনোই মাইনাস ফর্মুলা বিশ্বাস করে না। তারা বিশ্বাস করে, রাজনৈতিক সহাবস্থান আর সুস্থ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। অন্যদিকে, অশিক্ষিত আর হঠকারী রাজনীতিকরা রাজনৈতিক মেধায় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে পড়ে পেশিশক্তির ব্যবহার করতে চান। কেউ চান, রাজনীতিতে টাকার জোরে উতরে যেতে। এভাবেই রাজনৈতিক দলগুলো উপদলে বিভক্ত হয়ে গ্রুপিংয়ের অপরাজনীতির শিকার হয়। নৈতিক রাজনৈতিক চর্চায় অভ্যস্ত, শিক্ষিত দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের বিদ্রোহী, সংস্কারপন্থিসহ বিভিন্নভাবে আখ্যায়িত করে রাজনীতির ময়দান থেকে বিতাড়িত করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষিত উদারমনাদের দল ছোট হয়ে যায়। তারা আর পেরে ওঠেন না অনুদার, প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতিকদের সঙ্গে। তা ছাড়া শিক্ষিত রাজনীতিক অনেকেরই আগে থেকে একটা পেশাগত পরিচয় থাকে। তাই তারা রাজনীতির নোংরামির শিকার হয়ে তাদের পূর্বের পেশাতে ফিরে যাওয়াই শ্রেয় মনে করেন। তারা মূলত আত্মমর্যাদাকে বেশি গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে লবিং-গ্রুপিংয়ে দক্ষ, অনুদার বা সংঘাতপ্রিয় রাজনীতিবিদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত অথবা অল্পশিক্ষিত কিংবা তথাকথিত সার্টিফিকেটধারী। রাজনীতি তাদের জন্য জাদুর কাঠি। আত্মমর্যাদাহীন এসব রাজনীতিবিদ কখনও রাজনীতি থেকে অবসর নেন না। কারণ, রাজনীতি তাদের একমাত্র জীবিকার উৎস। এমনকি অপরাধীরা পর্যন্ত দলীয় রাজনীতিতে ভিড়ে নিজেদের নিরাপদ রাখতে চায়। তাই এই সর্বপুনর্বাসন মার্কা রাজনীতিতে সৎ-শিক্ষিতরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না।

আমাদের শিক্ষিত সমাজের কি আসলেই রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার কোনো দায় নেই? রাজনীতিতে শুদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা আনতে তারা কি আদৌ কোনো ভূমিকা রাখবেন না- এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে দেখা যাক দেশের শিক্ষিতরা রাজনীতিতে কতখানি সক্রিয়। দেশের শিক্ষিতদের একটা বড় অংশ পেশাগত রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়, যদিও তারা মূলধারার রাজনীতিতে তেমন একটা যুক্ত থাকেন না পেশাগত বিধিনিষেধের কারণে। বিভিন্ন পেশার উঁচু পদগুলোয় যেখানে রাজনৈতিক নিয়োগ হয়ে থাকে, সেগুলো হাসিল করার জন্যই মূলত এমন রাজনীতির চর্চা হয়ে থাকে। মূলধারার রাজনীতি থেকে এসব ভোগী, স্বার্থপর শিক্ষিত ব্যক্তিত্বরা নিজেদের এড়িয়ে চলেন। কারণ, এ ধরনের রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা ও জনসম্পৃক্ততা অনেক বেশি থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে তারা যে অহংবোধ রপ্ত করেন, তা তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে 'হালকা' করতে চান না। মূলধারার রাজনীতিকরাও শিক্ষিত পেশাজীবীদের খুব একটা ভিড়তে দেন না তাদের রাজনৈতিক বলয়ে।

প্রচলিত বিভাজন, প্রতিহিংসার রাজনীতি শুদ্ধকরণের জন্য রাজনীতির কর্তাব্যক্তিদের দায়িত্ব বেশি। তাদের উচিত, শিক্ষিত আর গুণী ব্যক্তিদের জন্য রাজনৈতিক স্পেস তৈরি করা। মনে রাখতে হবে, গুণীদের খুঁজে বের করতে হয়। আর অযোগ্যরা অহেতুক ভিড় করে থাকে।

এম আর ইসলাম: সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়