ইউক্রেনে রাশিয়ার সেনারা তাদের মাতৃভূমির ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করছে বলে দাবি করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন। গতকাল সোমবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নাৎসিদের বিরুদ্ধে জয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠান উদযাপনে মস্কোর রেড স্কয়ারে আয়োজিত কুচকাওয়াজে দেওয়া ভাষণে এমন দাবি করেন তিনি। পুতিন বলেন, মাতৃভূমি রক্ষা করা সব সময়ই পবিত্র দায়িত্ব। আপনারা এখন লড়াই করছেন দোনবাসে আমাদের জনগণের জন্য, রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য, আমাদের মাতৃভূমির জন্য। এ সময় তিনি ইউক্রেনের মানুষকে ফ্যাসিস্ট আখ্যায়িত করে বলেন, কিয়েভে নাৎসিরা গণতান্ত্রিক সরকার চালাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য ন্যাটোকে দায়ী করে তিনি বলেন, তারা আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করেছে। রাশিয়া ইউরোপকে একটি ন্যায্য সমঝোতার জন্য অনুরোধ করেছিল; কিন্তু পশ্চিমারা মস্কোর কথা শুনতে চায়নি।

ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযানকে প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করে পুতিন বলেন, ন্যাটো আমাদের ভূখণ্ডের কাছাকাছি পৌঁছার রাস্তা খুঁজতে শুরু করেছে। এটি আমাদের দেশ এবং আমাদের সীমান্তের জন্য একটি সুস্পষ্ট হুমকি। রুশ প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, পূর্ব ইউক্রেনের দোনবাসে পশ্চিমারা একটি শাস্তিমূলক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো আমাদের ভূমিতে অনুপ্রবেশ করা। কিয়েভের ব্যাপারে বলা হচ্ছে যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র হাতে পেয়েছে। আমাদের খুব কাছে পৌঁছতে ইউক্রেনের স্থলভাগকে ব্যবহার শুরু করেছে ন্যাটো। পুতিন তার ১১ মিনিটের বক্তব্যের শেষে বলেন, আমাদের এই সশস্ত্র বাহিনী রাশিয়ার জন্য এবং আমাদের বিজয়ের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। বক্তব্য দেওয়ার সময় পুতিনকে ঘিরে ছিলেন সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতারা। বক্তব্য শেষে মঞ্চ থেকে নামার পরই রেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজ শুরু করে রাশিয়ার বিশাল পদাতিক বাহিনী।

রাশিয়ার বার্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে ১১ হাজার সেনা সদস্য ও ১৩১টি সাঁজোয়া যান অংশ নিয়েছিল। এর আগে বক্তব্যের শুরুতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন পুতিন। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত রুশ যোদ্ধাদের প্রতি শোক জানান তিনি। প্যারেড অনুষ্ঠানে বড় কোনো ঘোষণা ছাড়াই বক্তব্য শেষ করেন তিনি। ধারণা করা হচ্ছিল, ইউক্রেন ইস্যুতে এ দিন তিনি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করবেন।
রাশিয়ার বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর রেড স্কয়ারে বিমান মহড়া অনুষ্ঠিত হলেও এবার বৈরী আবহাওয়ার কারণ দেখিয়ে মহড়া বাতিল করেছে মস্কো। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান, রেড স্কয়ারে বিমান প্রদর্শনীর অংশ বাতিল করা হয়েছে।

এদিকে আজভস্তাল ইস্পাত কারখানার ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার ও টানেলগুলোতে আশ্রয় নিয়ে থাকা কট্টরপন্থি আজভ ব্যাটালিয়নের যোদ্ধারা ইউক্রেন সরকারের সমালোচনা করে অভিযোগ করেছে, কিয়েভ মারিউপোল রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। মারিউপোলের এই বিশাল ইস্পাত কারখানা এলাকাটি কয়েক সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছে রুশ বাহিনী। আংশিক ধ্বংস হয়ে যাওয়া ওই কারখানা থেকে আজভ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে জানান, তারা পরাজয় স্বীকার করবেন না। তাদের একজন লেফটেন্যান্ট ইল্লা সামোইলেনকো বলেন, আমাদের পক্ষে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব গ্রহণ করা অসম্ভব।

কারণ শত্রুকে এত বড় উপহার আমরা দিতে পারি না। আমরা মূলত মৃত মানুষ, তাই আমরা এতটা নির্ভয়ে লড়াই করছি। রাশিয়ার তিনটি টেলিভিশন স্টেশন নিষিদ্ধের পাশাপাশি গ্যাজপ্রোমব্যাংকের নির্বাহীদের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে রুশ নাগরিকদের ব্যাংকিং সেবা দেওয়া নিষিদ্ধ করেছে ওয়াশিংটন। ইউক্রেনে আগ্রাসনের জেরে পুতিনের ওপর চাপ বাড়ানোর সবশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউক্রেনে হামলার জেরে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে জাপান। গত রোববার জি-৭ জোট নেতাদের ভার্চুয়ালি বৈঠকের পর এ কথা জানান দেশটির প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা। যুদ্ধ আর দীর্ঘায়িত না করে মস্কো-কিয়েভকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে ইরান। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির-আব্দুল্লাহিয়ান বলেন, 'আমরা ইউক্রেনে যুদ্ধের বিপক্ষে, ঠিক একই ভাবে ইয়েমেন, আফগানিস্তান, সিরিয়া এবং ইরাকসহ বিশ্বের যে কোনো জায়গায় যুদ্ধেরও বিরুদ্ধে।' খবর বিবিসি, এএফপি ও সিএনএনের।