বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলাধীন সরই ইউনিয়নের তিনটি জুমিয়া পাড়ার অধিবাসীরা খাদ্য সংকটে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি বেশ আলোচিত হচ্ছে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমেও খবরটি প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত গত মাসের ২৬ এপ্রিল। এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান লাংকম পাড়া, রেংয়েন পাড়া এবং জয়চন্দ্র পাড়া; এই তিনটি জুমিয়া গ্রামের জুম ভূমি এবং প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে আগুন লাগিয়ে দেয়। এই কোম্পানির আগুনে জুম ভূমিসহ প্রায় ৩৫০ একর প্রাকৃতিক বনাঞ্চল পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। এতে তিনটি জুমিয়া পাড়ার প্রায় ৪০টি পরিবারের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অবশ্য এ ঘটনার অনেক আগে ২০ মার্চ ২০২২ তাদের ৩৫০ একর প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও জুম ভূমি রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ নামক কোম্পানি কর্তৃক জবরদখলের বিরুদ্ধে এলাকাবাসী বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে এলাকাবাসী তাদের পাড়াগুলো রক্ষার দাবি জানান। জুমিয়া পরিবারগুলো সেই মানববন্ধন থেকে পাড়া রক্ষায় প্রশাসনসহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। জুমিয়া পরিবারগুলোর এই আকুতিকে গ্রাহ্য করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কার্যকরী ভূমিকা চেয়ে বিশিষ্ট নাগরিকরা সেই সময় বিবৃতিও দিয়েছিলেন।
২০ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল এক মাসের অধিক সময় পার হওয়ার পর ওই তিনটি জুমিয়া পাড়া আবার সংবাদের শিরোনাম হয়। তবে এই শিরোনাম সুখকর সংবাদ নিয়ে আসেনি। যে রাবার কোম্পানির বিরুদ্ধে জবরদখলের অভিযোগ উঠেছিল; একই প্রতিষ্ঠান আবারও অভিযুক্ত হলো। তবে এবারের অভিযোগের মাত্রা এবং অপরাধের ধরন বেশ বাড়ন্ত। পাড়াবাসী আগেই অভিযোগ করেছিলেন, রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ নামীয় প্রতিষ্ঠানটি তাদের জুম ভূমি এবং সংশ্নিষ্ট প্রাকৃতিক বন বেদখল করে রেখেছে। ২৬ এপিল সেই দখল করা বনাঞ্চল এবং জুম ভূমিতে রাবার কোম্পানির দুর্বৃত্তরা অগ্নিসংযোগ করে। এ অগ্নিসংযোগের খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে চলে আসে। ২৯ এপ্রিল দেশের ২৮ জন নাগরিক আবারও উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেন। দৈনিক সমকালসহ দেশের সংবাদমাধ্যম বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবৃতিটি প্রকাশ করে।
প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও জুম ভূমি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ভুক্তভোগী এক ম্রো লামার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। সেই মামলার ভিত্তিতে পুলিশ ২৯ এপ্রিল 'লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ' প্রতিষ্ঠানের দু'জনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ বলেছে, তারা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি, লামা উপজেলার এসি ল্যান্ডকে
প্রধান করে অগ্নিসংযোগের ঘটনাবলি তদন্ত করার জন্য একটি কমিটিও গঠিত হয়েছে। কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের পর প্রশাসন কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, সেটা পরের বিষয়।
জানতে ইচ্ছা করে- ২০ মার্চের পর দীর্ঘ এক মাস প্রশাসন কী করেছিল? দেশের নাগরিক সমাজ কিংবা প্রগতিশীল বাম রাজনৈতিক শক্তিই বা কতটুকু সরব ছিল? ২০ মার্চের পর প্রশাসন সক্রিয় হলে হয়তো অগ্নিসংযোগ এড়ানো যেত। দেশের মানবতাকামী শক্তি এবং বাম রাজনৈতিক মহলটি যদি প্রতিবাদ জিইয়ে রাখত, তাহলে হয়তো প্রশাসনের টনক নড়ত। ভূমিখেকো ওই রাবার ইন্ডাস্ট্রিজকে চাপে রাখতে পারলে তারাও অগ্নিসংযোগের মতো মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত করতে কিছুটা দ্বিধার মধ্যে থাকত।
আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, পাহাড়ের এসব সমস্যার সমাধানে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই চুক্তি এখন ২৫ বছরের দ্বারপ্রান্তে। ২৪ বছর পেরিয়ে গেলেও পাহাড়ের ভূমি সমস্যার নিষ্পত্তি করা যায়নি। অথচ পার্বত্য চুক্তির একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, ভূমি কমিশনের মাধ্যমে পাহাড়ের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা হবে। ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি ও প্রথা মেনে সেখানকার ভূমি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হবে। পার্বত্য চুক্তি যদি বাস্তবায়িত হতো তাহলে রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লামাতে ওই ভূমি লিজ নিতে পারত না। তাহলে লাংকম পাড়া, রেংয়েন পাড়া এবং জয়চন্দ্র পাড়া- এ তিনটি জুমিয়া গ্রামের জুম ভূমি এবং প্রাকৃতিক বনাঞ্চল নিরাপদ থাকত। জুমিয়া পরিবারগুলো তাদের জুম ভূমিতে আবাদ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতো না।
জুম মৌসুমে এখন কার্যত অভাবের সময়। জুমিয়া কৃষিচক্রে এখন ফসল বোনার সময়। জুমে ফসল বোনার এই সময়ে জুমচাষিরা মূলত প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল থাকে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক বনভূমি থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রির পর চাল, শুঁটকি এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্যাদি কিনে জীবনের চাহিদা মেটাতে হয়। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃক পুড়িয়ে দেওয়ার পর জুমিয়া পরিবারগুলো এখন একেবারে আয়বিহীন। কিন্তু আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, অগ্নিসংযোগ ঘটনার প্রায় ১৫ দিন অতিক্রান্ত হলেও দুর্গত জনপদে কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পৌঁছেনি। ফলে এলাকায় খাদ্যাভাব বিরাজ করছে। আমরা আশা করি, প্রশাসন এবং সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতিদ্রুত লামার সরই ইউনিয়নের তিনটি জুমিয়া গ্রামে সরকারি সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেবে। সেই সঙ্গে আরও দাবি রাখি, আক্রান্ত জনপদের ৪০টি জুমিয়া পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হোক। ২০ মার্চ ৩ পাড়াবাসী মানববন্ধনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনকে তাদের সমস্যার বিষয়টি অবহিত করা সত্ত্বেও জেলা প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে- এ রকম তথ্য আমাদের কিংবা এলাকাবাসীর নিকট দৃশ্যমান হয়নি। সুতরাং, প্রশাসনের গাফিলতি খতিয়ে দেখার জন্য উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে। যে রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তিনটি জুমিয়া পাড়ার জুম ভূমিসহ ৩৫০ একর প্রাকৃতিক বনাঞ্চল অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দিয়েছে। আমরা জোর দাবি তুলছি- সেই রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের লিজ বাতিল করা হোক। লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের তিনটি জুমিয়া পাড়ার ৪০টির অধিক পরিবারকে এই লিজের ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিষটি সুবিবেচনায় নেওয়ার জন্য আমরা জোরালো দাবি উত্থাপন করছি। পরিশেষে এটুকু আশাবাদ রাখতে চাই, এই জুমিয়া পরিবারগুলোর জীবন-জীবিকা নিরাপদ হোক। তাদের চিরায়ত জুম ভূমির অধিকার তারা ফিরে পাক।
দীপায়ন খীসা :রাজনৈতিক কর্মী ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট