অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে রেল মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো কমিটির সুপারিশে আমরা হতাশ হলেও বিস্মিত নই। এর আগেও পুকুর খনন, খিচুড়ি রান্না কিংবা ঘাস চাষের মতো সাধারণ বিষয় শিখতেও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের খবর আমরা সংবাদমাধ্যমে দেখেছি। মঙ্গলবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদন অনুসারে, রেলওয়ের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হয়, তা পরিদর্শনে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান কিংবা চীনে যেতে চান রেল মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্যরা। কোনো বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য কিংবা বিশেষ কোনো চুক্তি বা ক্রয়ের জন্য রেল-সংশ্নিষ্টরা প্রয়োজনে বিদেশে যেতেই পারেন। কিন্তু সাধারণ বিষয়গুলো বোঝার জন্য সরকারি অর্থ খরচ করে বিদেশ সফরের প্রয়োজন আছে কি? ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাদেশে যে রেলের সূচনা; তার অন্তত দেড়শ বছর পর এসে রেল দেখার জন্য এমপিদের বিদেশযাত্রার বিষয়টি হাস্যকরও বটে।
এ ভ্রমণ বিষয়ে কমিটির একজন সদস্য সমকালকে বলেছেন, 'রেল সংসদীয় কমিটির সদস্যরা তিন বছরে একটিও বিদেশ ভ্রমণ করেননি। কমিটির ১০ সদস্য মিলে একটি ভ্রমণ করতে চেয়েছিলেন।' অর্থাৎ যে কোনো ছুতোয় ওই কমিটির সদস্যরা সরকারি আয়োজনে বিদেশে ঘুরতে যেতে চান। তারা যদি কেবল ভ্রমণের জন্যই বিদেশ যেতে চান তবে নিজেদের অর্থে ব্যক্তিগতভাবে যেতে পারেন। এটা ঠিক, মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভিন্ন দপ্তরের পরিচালক ও সরকারি কর্মকর্তারা যে পরিমাণে বিদেশ যান; এমপিরা তেমন সুযোগ পান না। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনমতে, রেলমন্ত্রীর নেতৃত্বে গত নভেম্বরের শেষদিকে ইউরোপের চারটি দেশে আট সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সফরে যায়। ওই সফরসহ গত ছয় মাসে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কয়েকটি দেশে ভিন্ন ভিন্ন সফরে যান। এমনকি গত মার্চেও তুরস্ক সফর করেছে রেলমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একের পর এক বিদেশ সফরের কারণেই স্থায়ী কমিটির সদস্যরাও বিদেশ সফর করতে চাইছেন। কিন্তু মন্ত্রী বা আমলারা অপ্রয়োজনীয় কাজে সরকারি অর্থ খরচ করলে সংসদ
সদস্যদেরও তা অনুসরণ করতে হবে কেন? তা ছাড়া মন্ত্রী-আমলাদের ওই হরহামেশা বিদেশ সফর রেলের উন্নয়নে কী ভূমিকা রেখেছে- তা কি
খতিয়ে দেখা হয়েছে?
আমরা জানি, করোনাকালে বিদেশ সফর নিরুৎসাহিত করতে এ খাতে বরাদ্দ অর্ধেক কমিয়েছে সরকার। কিন্তু শুধু জরুরি ও অনিবার্য প্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণে বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় করার নির্দেশনা থাকলেও বিদেশ সফর বন্ধ নেই। প্রশ্ন হলো, এ ধরনের বিদেশ ভ্রমণে সরকার কিংবা সংশ্নিষ্ট খাত কতটা লাভবান হচ্ছে? মনে রাখা দরকার, রেলে প্রতিবছর সরকার কয়েক হাজার কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। গত অর্থবছরের হিসাবে বাংলাদেশ রেলওয়ে যেখানে এক হাজার কোটি টাকা আয় করেছে, সেখানে এ সময়ে ব্যয় করতে হয়েছে ছয় হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি এক টাকা আয় করতে রেল ব্যয় করেছে প্রায় ছয় টাকা। এত লোকসান গোনার পরও রেলে দায়িত্বশীলদের বিদেশ সফরের প্রতিযোগিতা আমাদের বিস্মিত না করে পারে না।
বিদেশের আমন্ত্রণ হোক কিংবা ঋণের টাকায় বিদেশ সফর; দিন শেষে তার খরচ জনগণেরই কাঁধে চাপে। অনর্থক বিদেশ সফর মানে জনগণের করের টাকার অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। প্রয়োজন থাকলে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের অবশ্যই বিদেশে যেতে হবে। কিন্তু যেসব কাজ দেশে বসে করা সম্ভব, সেগুলোর জন্য বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজন কী? আমরা দেখেছি, সরকারি কর্মকর্তারা দল বেঁধে বিদেশ সফরে যান। এমন কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন জরুরি হলে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এনেও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও অতিরিক্ত বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি নকচ করেছেন। আমরা চাই, রেলের আলোচ্য বিদেশ ভ্রমণের প্রস্তাবটি অনুমোদন না পাক। একই সঙ্গে এ সংক্রান্ত সরকারি যে নীতিমালা আছে তা যথাযথ পর্যালোচনার মাধ্যমে সংশোধিত হোক, যেন রাষ্ট্রীয় অর্থে সব ধরনের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর বন্ধ হয় এবং প্রয়োজনীয় বিদেশ সফর থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রীয় সেবার মান উন্নয়নে কাজে লাগে।

বিষয় : রেল 'উন্নয়নে' বিদেশ ভ্রমণ

মন্তব্য করুন