বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে বৈশাখী পূর্ণিমা একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিশেষ অনুষ্ঠানের দিন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করে, ২৫০০ বছরেরও আগে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথির এই শুভক্ষণে সিদ্ধার্থ গৌতমের ধরাধামে আগমন বা জন্মগ্রহণ, অরহৎ বা বুদ্ধত্বলাভ এবং নির্বাণপ্রাপ্তি বা দেহত্যাগ হয়েছিল। আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও আগে এই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ারই একটি অপেক্ষাকৃত অনুন্নত ভূখণ্ড, যা এখন ভারতের অন্তর্গত তদানীন্তন কপিলাবস্তু নগরীর শাক্যমুনি বংশের রাজা শুদ্ধোধন এবং রানী মহামায়ার ঘরে এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন, যার গৃহী নাম ছিল 'সিদ্ধার্থ'। সিদ্ধার্থ পৃথিবীর এই জাগতিক ভোগবিলাসে নিজেকে ভাসিয়ে দেননি। তিনি খুব ছোটবেলা থেকেই ছিলেন চিন্তাশীল, পরোপকারী, সর্বজনে দয়াবান, মানবতাবাদী, অহিংস, আত্মজিজ্ঞাসু একজন সত্যসন্ধানী। নিজের আয়েশপূর্ণ অবস্থান, অনাবিল সুখ, অপার বিত্ত-বৈভব এবং বিপুল ঐশ্বর্যের বাইরেও শৈশব থেকে তিনি ভাবতেন চারপাশের কথা। ভাবতেন কেন মানুষের জীবনে এত দুঃখ-বেদনা, রোগ-শোক, জ্বরা-মৃত্যু, মানুষে-মানুষে হানাহানি, হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা, বৈষম্য ইত্যাদি। সিদ্ধার্থ গৌতম নিজের চিন্তা, চেষ্টা এবং উপলব্ধি দিয়েই মানবজীবন ও জগতের সব দুঃখের হেতু বের করার জন্য নিজেকে ব্যাপৃত এবং মানুষের নিজের কৃতকর্মকেই এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

এই জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে গিয়ে সিদ্ধার্থ চরম, পরম উপায় এবং অবশেষে মধ্যপন্থা অবলম্বন অর্থাৎ নানা ধরনের পথ পরিক্রমায়, ধ্যান-সাধনায় নিজের বিচার-বিবেচনা দিয়ে বুঝতে সক্ষম হলেন- এ জগৎ বস্তুত দুঃখময়। তিনি তার নতুন মত প্রচার শুরু করলেন। কিন্তু তা মানা বা স্বীকার করার জন্য কারও সঙ্গে কোনো প্রকার যুদ্ধবিগ্রহ, হিংসা-বিদ্বেষ এমনকি কোনো ধরনের জোর জবরদস্তি করেননি। তিনি বললেন, মানুষের অতি ভোগ, অতি লোভ, অপ্রাপ্তিতে দুঃখ, হারানোতে দুঃখ, অতি আশাতে দুঃখ, যে প্রিয়জনের সান্নিধ্য এক সময় আনন্দ দেয় সেই প্রিয়জনের বিরহে সে আবার দুঃখ পায়। মানুষে-মানুষে ভালোবাসা আর মৈত্রীকেই তিনি দিলেন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। জগতের মানুষকে শোনালেন চিরভাস্বর সর্বকালের গ্রহণযোগ্য একটি অমিয় বাণী- 'অহিংসা পরম ধর্ম; জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক'। মনেপ্রাণে সত্যিকার অর্থে শান্তি চাইলে মানুষকেই তার সমস্ত জাগতিক সীমাহীন লোভ-লালসা, ভোগ-বিলাসিতা এবং অন্যের ওপর জুলুম করার সব রকম ইচ্ছাকেই অবদমন করতে হবে। হতে হবে পরমতসহিষুষ্ণ এবং ত্যাগী। নিজের মনের ভেতরের সব অন্যায়, অশুভ এবং অকুশল ইচ্ছার দুর্দমনীয় বাসনাকে নিবৃত্ত করতে হবে। নচেৎ কারও মনে স্বস্তি আসবে না। আসবে না মনের দুর্লভ শান্তি। সামগ্রিক শান্তির সহজ ব্যাখ্যা হলো, অন্যদের সুখ এবং স্বস্তি ছাড়া শুধু নিজের সুখ আশা করা এবং তা নিশ্চিত করা যায় না। গৌতম বুদ্ধ প্রাথমিকভাবে মাত্র সরল পাঁচটি সূত্রেই যা 'পঞ্চশীল' নামে পরিচিত তার চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তৎপরবর্তী সময়ে পৃথিবীতে অনেক মত, পথ এবং পন্থার প্রদর্শক বা উদ্ভাবক সময়ে সময়ে আবির্ভূত হয়েছেন। 'জীব হত্যা মহাপাপ'- এ কথার মধ্যে যে অন্তর্নিহিত বিষয়টি রয়েছে তা হলো, সব প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শন। গৌতম বুদ্ধ তার মত এবং পথ প্রকাশে বারবার বলেছেন, মানুষের নিজের মনেই মূলত ভালো বা মন্দের উৎপত্তি হয়। মানুষ যদি তার নিজের মন নামের এই বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সঠিকপথে পরিচালিত করতে পারে, তাহলে এই জগতের অনেক সমস্যাই আর থাকবে না। গৌতম বুদ্ধ তার মত-পথ অনুসরণের ক্ষেত্রে এসো, দেখ, যাচাই-বাছাই করে যদি তোমার ভালো লাগে তবেই তা গ্রহণ করবে, নচেৎ নয়- এ কথা তিনি বলেছিলেন। এ কথা সব সমাজ, সব দেশ; সব শান্তিকামী, অহিংস মতবাদে বিশ্বাসী, পরমতসহিষুষ্ণতায় আস্থাশীল, মানবতাবাদে বিশ্বাসীদের কাছে বৌদ্ধ মতবাদ, বৌদ্ধ শিক্ষা প্রাসঙ্গিক থাকবে এবং সামাজিক, রাষ্ট্রিক, বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে শান্তিময় সর্বজনগ্রাহ্য মত হিসেবেই বিবেচিত হবে- তা ধারণা করা যায়। এই মতবাদ ধর্মবীরের চেয়ে কর্মবীরকেই প্রাধান্য দেয়।

অসীম বরন চৌধুরী: অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন, বাংলাদেশ নৌবাহিনী
abcbn238@gmail.com