টেস্ট ক্রিকেটই আসল ক্রিকেট। শক্ত ক্রিকেট। এই ক্রিকেট রপ্ত করে ভালো করতে শুরু করলে অন্য দুটি সংস্করণ ওয়ানডে এবং টি২০ অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য হবে। বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েছে সেই ২০০০ সালের জুনে। অভিষেক টেস্ট খেলেছে ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর; ভারতের বিপক্ষে দেশের মাটিতে। ২২ বছর মোটেই কম সময় নয়। অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। অভিষেক টেস্ট খেলার পর থেকে দেশের টেস্ট ক্রিকেটকে ঘিরে যে প্রত্যাশা ছিল, সেখান থেকে আমরা অনেক পেছনে আছি। কখনও ভাবা হয়নি, বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে দুই বা আড়াই যুগের মধ্যে এশিয়ার সেরা দলে পরিণত হতে পারে। প্রত্যাশা ছিল, টেস্ট ক্রিকেট রপ্ত করে বাংলাদেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে ক্রিকেট দুনিয়ায়- এটি সম্ভব হয়নি। কেন পিছিয়ে থাকা; এর পেছনে ঘাটতি এবং দুর্বলতা কী কী- এখন আর সেগুলো অন্ধকারে নেই। সাংগঠনিক কার্যকলাপে দুর্বলতা এবং ব্যর্থতা থাকা সত্ত্বেও ছেলেরা অনেক ভালো খেলেছে। তারা সম্ভাবনার রশ্মি ছড়িয়ে জাতির স্বপ্ন জিইয়ে রেখেছে।

ক্রিকেট শুধু বাংলাদেশে একটি খেলা নয়; এর চেয়ে বেশি কিছু। কোটি কোটি মানুষ মাঠের বাইরে খেলার পেছনে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ভালো এবং খারাপ সময়ে। এটি অনেক বড় শক্তি ক্রিকেট প্রশাসন এবং খেলোয়াড়দের জন্য। টেস্ট সিরিজে করুণভাবে পরাজয়ের পর অধিনায়ক বলেছেন, 'প্রত্যাশা বেশি বলে হতাশা বেশি।' এই ক্ষেত্রে কী বলা যায়? জাতি তাকে দায়িত্ব দিয়েছে ১৭ কোটি মানুষের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার। মানুষ কি তাহলে প্রত্যাশা করবে না- জাতীয় দল ভালো খেলুক? সবাই জানে, টেস্ট ক্রিকেটের মৌলিক বিষয়গুলো এখনও ভালোভাবে রপ্ত করা সম্ভব হয়নি। এর জন্য আরও সময় দরকার। দরকার টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে সম্পূর্ণরূপে কাজ করা। ভুলগুলোর সংশোধন করা। কাজ করলেই ফল মিলবে- পেস বোলারদের উত্থানই তার প্রমাণ।

কিছুদিন আগে বোর্ড প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপনকে কোচিং স্টাফদের এবং বাংলাদেশ দলের ম্যানেজমেন্ট জানিয়েছে, দুই টেস্ট ১০ দিন খেলার মানসিকতা নেই বেশিরভাগ ক্রিকেটারের। টেস্টে মনোসংযোগ এবং মানসিক সুস্থতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম টেস্টে ভালো খেলা এবং দ্বিতীয় টেস্টে একবারেই ধরাশায়ী। শুধু দ্বিতীয় টেস্টে কেন; প্রথম ইনিংসে যেভাবে নড়া দ্বিতীয় ইনিংসে তো এর ৫০ ভাগও নড়া সম্ভব হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে 'মাইন্ড সেট' বিষয়টি নিয়ে কাজ করার দরকার। ১০ দিন (অর্থাৎ দুটি টেস্ট ম্যাচ) খেলার মানসিকতা না থাকলে টেস্ট ক্রিকেটে ভালো কিছু করা তো মুশকিল। মনের বিপক্ষে গিয়ে খেলা তো শুধু হতাশার পাল্লা ভারি করবে।

ভালো ক্রিকেটার টেস্ট ক্রিকেটে নামার আগে একটি মানসিক বলয় সৃষ্টি করে। এর বাইরে তারা কখনও যায় না। তাদের চিন্তায় থাকে শুধু ক্রিকেট; অন্য কিছু নয়। টেস্ট ক্রিকেট তো দীর্ঘ সময়ের। 'সেশন' বাই 'সেশন'। অভ্যস্ত না থাকলে এই ক্রিকেট খেলা মুশকিল। চূড়ান্ত লড়াইয়ে নেমে অস্থিরতা করে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে ড্রেসিং রুমে ফিরে এসেই স্বস্তি। টেস্ট দলের হয়ে যারা খেলেছে বা এখনও খেলছে তাদের অনেকেই আবার বিভিন্ন ছুতোয় ঘরোয়া দীর্ঘ সময়ের ক্রিকেট খেলতে চায় না। এমনিতেই ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘ সময়ের খেলার সুযোগ খুব কম। সেখানেও যদি গররাজি, তাহলে টেস্ট ক্রিকেটে অভ্যস্ত হওয়া কীভাবে সম্ভব?

টেস্টের জন্য আলাদা টেস্ট স্পেশালাইজড ব্যাটসম্যান এবং বোলার তৈরির কথা চিন্তা করা হচ্ছে, যারা শুধু টেস্ট ম্যাচ খেলবে। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় ভাবার দরকার। প্রথম হলো আর্থিক বিষয়টি। টি২০ যুগের ক্রিকেটে অর্থের ছড়াছড়ি। অল্প কয়েকটি ম্যাচ খেলে অনেক বেশি উপার্জন। খেলোয়াড়রা তো পেশা হিসেবেই ক্রিকেটকে বেছে নিয়েছে। আর তাই সবার চোখ স্বাভাবিকভাবেই অর্থের দিকে থাকবে। দেশ ক্রিকেটার বানিয়েছে, এখন ফ্রাঞ্চাইজি তাকে বেশি অর্থ দিয়ে নিতে চায়। সে তো স্বাভাবিকভাবেই ফ্রাঞ্চাইজির দিকে ছুটবে। মুস্তাফিজ টেস্ট খেলবে না জানিয়ে দিয়ে আইপিএলে চলে গেছে। সে অবশ্য দেশে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেনি। বোর্ড তাকে এনওসি দিয়েছে। আইপিএলে কোনো দল সাকিবকে তাদের দলের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করেনি বলে সে খেলতে যেতে পারেনি। পেসার তাসকিন আহমেদ ডাক পেয়েছিল আইপিএল থেকে। বোর্ড তাকে অনুমতি দেয়নি দেশের ক্রিকেটের বৃহত্তর স্বার্থে। বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের বিষয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষণীয়। এই চিত্র বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা। যে সমস্যা নেই ভারত এমনকি পাকিস্তানে, যাদের পেশাদার লিগে প্রচুর অর্থ। অতএব অন্যদিকে তাকাতে হয় না। ম্যাচ ফি তিন লাখ থেকে ছয় লাখ টাকা করা হয়েছে দেশে টেস্ট ক্রিকেটে। আরও কিছু বাড়ানোর চিন্তাভাবনা হচ্ছে। শুধু টেস্ট ক্রিকেটে নিবেদিতদের জন্য যদি মাসিক পারিশ্রমিক ভালো অঙ্কের অর্থ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়, তাহলে একটি ভালো উদ্যোগ কার্যকরী হতে পারে। কেউ খেলবে, কেউ খেলবে না- এই বিভাজন বন্ধ হওয়া দরকার। ক্রিকেটারদের চুক্তিতে এসব বিষয় সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া এবং স্পষ্ট করা উচিত।

দেশের ক্রিকেট কারও মুখাপেক্ষী এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলতে পারে না। প্রত্যেকেরই অবস্থান পরিস্কার করা দরকার। তা ছাড়া বোর্ডের উচিত নয় সবকিছু খেলোয়াড়দের ইচ্ছা এবং অনিচ্ছার ওপর ছেড়ে না দিয়ে বোর্ডের প্রয়োজনে খেলোয়াড়কে খেলতে হবে যে কোনো সংস্করণে- এটি নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে- কেউই অপরিহার্য নয়। দেশের ক্রিকেটে এখন সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, কয়েকজন তরুণ খেলোয়াড় আস্থা অর্জন করে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উঠে এসেছে। এতে অবশ্যই ড্রেসিং রুমে নতুন একটি পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। তারা পারফর্ম করছে; দলের জয়ে অবদান রাখছে। টেস্ট দলে আসলে সিনিয়র-জুনিয়র গ্রুপ বলে কিছু থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। সবাইকে পারফর্ম করতে হবে। দায়িত্বশীল হতে হবে। পারফর্ম করতে সক্ষম- এই বিশ্বাসে বলীয়ান হয়েই তো নির্বাচকরা টেস্ট দলে স্থান দেন খেলোয়াড়দের।

সব দেশেই একটা সময় আসে যখন দল পুনর্গঠনে কাজ করতে হয়। এটি ক্রিকেটের একটি সুস্থ প্রক্রিয়া। কোনো খেলোয়াড় তো সারাজীবনের জন্য নয়। সময় হাতে নিয়েই তো রিপ্লেসমেন্ট তৈরির কাজ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আবেগ বা স্পর্শকাতরতার স্থান নেই। পুরোনোদের বিদায়ের আগেই প্রয়োজন সঠিক রিপ্লেসমেন্ট। তাই উচিত স্পোর্টিং নিয়ম প্রক্রিয়া মেনে নেওয়া। উত্তম হলো, বাদ পড়া বা বিশ্রামে যাওয়ার আগে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই জানিয়ে দেওয়া। এটি অনেক বেশি সম্মানের।

ইকরামউজ্জমান: কলামিস্ট ও বিশ্নেষক