গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপালের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখে বাংলাদেশও একই পথে হাঁটছে কিনা, তা নিয়ে এখন অনেকের কপালেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, জনগণের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি সাধারণত ষড়যন্ত্রতত্ত্বেরই অংশ হয়ে থাকে।

তাই কিছু 'সিনোফোব' তথা চীনবিদ্বেষীদের 'চীনা ঋণের ফাঁদ' নামক বাগাড়ম্বর উস্কে দিতে দেখে তেমন বিস্মিত হইনি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, গত মাসে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব সংলাপের সময় মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড 'উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভরশীলতার সম্ভাব্য প্রভাব' নিয়ে আলোচনা করেছেন। বেশিরভাগ দেশীয় সংবাদমাধ্যম অর্থ দাঁড় করায়, মার্কিন পক্ষ 'চীন থেকে দূরে সরে যাওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশকে নতুন করে পরামর্শ দিয়েছে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাধ্যমে সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে।' গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর তার এক বিবৃতিতে যখন 'বাংলাদেশকে চীন থেকে সরে যাওয়া এবং কোয়াড জোটে যোগদানের পরামর্শ দেন'; তার মধ্য দিয়েও এ বক্তব্য প্রতিফলিত হয়।

বিনয় এবং অন্তর্ভুক্তিতে বিশ্বাসী একটি সমৃদ্ধ সভ্যতা হিসেবে চীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সব পর্যায়ের সমালোচনাকে স্বাগত জানায়, যতক্ষণ পর্যন্ত তা গঠনমূলক ও যুক্তিসংগত। 'বিশ্ব পুলিশ' এবং এর 'অধীনস্ত পক্ষগুলোর' দ্বারা চীনের ওপর চাপানো 'ঋণের ফাঁদ' নামক অভিযোগ মেনে নেওয়ার আগে এর সত্যতা কতটুকু তা যাচাই করা জরুরি।

উপাত্ত সমর্থিত নয়

বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত সর্বশেষ ত্রৈমাসিক ঋণ বুলেটিন অনুসারে, গত বছরের জুন পর্যন্ত দেশের ঋণ জিডিপি অনুপাতের ৩৮ শতাংশ এবং বৈদেশিক ঋণ সামগ্রিক ঋণ পোর্টফোলিওর ৩৭ শতাংশ। আর চীনের কাছে ঋণ বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের মাত্র ৭ শতাংশ। অর্থাৎ চীনা ঋণ সামগ্রিক ঋণের ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং জিডিপির শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ। এসব উপাত্ত থেকে এটি সুস্পষ্ট, চীনের কাছে বাংলাদেশের ঋণকে কোনোভাবেই 'ঋণের ফাঁদ' আখ্যা দেওয়া যায় না।

প্রকৃতপক্ষে বিশ্বব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো বৃহৎ বহুপক্ষীয় ঋণদাতা ছাড়াও বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের শীর্ষ-দ্বিপক্ষীয় উৎস জাপান (বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের ১৯ শতাংশ, যা চীনের কাছে বাংলাদেশের ঋণের প্রায় তিন গুণ)। তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন যখন 'একটি নির্দিষ্ট দেশের' বিরুদ্ধে নুল্যান্ডের অভিযোগের জবাবে উল্লেখ করেন, 'বাংলাদেশের প্রকল্পের অর্থায়নের বেশিরভাগই বহুপক্ষীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জাপান থেকে পায়' তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে এটি পুনরায় তুলে ধরা জরুরি হয়ে পড়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে চীন সহযোগিতাপূর্ণ ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় অবদান রাখার লক্ষ্যে অন্য যে কোনো দেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে প্রস্তুত এবং আগ্রহী। তথ্য অনুযায়ী যারা চীনের দিকে আঙুল তোলে, তারাই বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।

বিষ নয়, বরং নিরাময়

চীনের অর্থায়ন বাংলাদেশকে অতুলনীয় সুবিধা প্রদান করেছে। প্রথমত, এটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ প্রয়োজন। পদ্মা বহুমুখী সেতুর অর্থায়ন নিয়ে সংঘটিত বিরোধ ভুলে যাওয়ার উপায় নেই। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন প্রত্যাহারের পর পদ্মা সেতুর রেল সংযোগে বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগের পরিপূরক হিসেবে ঠিকাদার ও অর্থ নিয়ে পাশে দাঁড়ায় চীন।

বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি, যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিড, পরিবহন সংযোগ এবং পরিবেশগত সুরক্ষার জন্য চীন ইন্ডাস্ট্রি সিদ্ধান্তের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ সম্প্রতি সমাপ্ত হওয়া ফ্ল্যাগশিপ পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশকে শতভাগ বিদ্যুতায়ন বাস্তবায়নকারী দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশে পরিণত করেছে, যা দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এক নতুন মাইলফলক।

দ্বিতীয়ত, প্রযোজ্য শর্তাবলির সঙ্গে চীনের প্রস্তাবগুলো বেশ প্রতিযোগিতামূলক। চীনা অর্থায়নের সিংহভাগই দীর্ঘমেয়াদি এবং সুবিধাজনক 'সফট লোন' আকারে আসে। দ্য ডিপ্লোম্যাটের মতে, এই ঋণের গড় সুদের হার আনুমানিক ১ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং বাংলাদেশ এই ঋণ পরিশোধের জন্য গড়ে ৩১ বছর সময় পায়, যার গড় গ্রেস পিরিয়ড ৮ বছর। ধৈর্যশীল বিনিয়োগকারী হিসেবে চীন স্বল্পমেয়াদি আর্থিক লাভের চেষ্টা করে না এবং চীন বিশ্বাস করে, সর্বোচ্চ উপযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদে অবশ্যই অধিক পরিমাণ আর্থসামাজিক সুফল লাভ করা যাবে, যা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অটুট রাখতে অবদান রাখবে। তৃতীয়ত, চীনা অর্থায়নে কোনো অযৌক্তিক শর্ত নেই। কিছু পশ্চিমা ঋণদাতার অর্থায়নের প্রস্তাবের সবসময় রাজনৈতিক অথবা অর্থনৈতিক সংস্কারের মতো পূর্বশর্ত থাকে। ফলে ঋণগ্রহীতা দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। তবে চীনা ঋণের ক্ষেত্রে এমনটা কখনোই হয় না। বিশ্বের বৃহত্তম উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে চীন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং বিদেশি বিনিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহী। ন্যায্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে চীন বাংলাদেশের জন্য সবসময় কৌশলগত সমাধান প্রদান করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, চীন যেসব প্রকল্পে অর্থায়ন করে, সেগুলো সবসময় চুক্তি অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়। বৈশ্বিক মহামারি এবং আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতা সত্ত্বেও নির্মাণকাজে জড়িত চীনারা সাহসিকতা ও সততার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়েছে এবং এর ফলে বাংলাদেশের ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয় হয়েছে। সামনে অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু (চীনা অর্থায়নে), কর্ণফুলী টানেল, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প, এস আলম তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং দাশেরকান্দি সুয়ারেজ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মতো মেগা প্রকল্পগুলোও এই বছরের শেষ নাগাদ সমাপ্ত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। অন্যান্য প্রকল্পের পেছনে যেখানে সময় এবং বাজেট বৃদ্ধির ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে, সেখানে চীনা প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ও নির্মাণাধীন প্রকল্পগুলো সময়মাফিক এবং অর্থ সাশ্রয়ের সঙ্গে চমৎকারভাবে শেষ হচ্ছে। এই বিষয়টি আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের, বাংলাদেশ সরকার এবং এ দেশের জনগণ চীনের ওপর সম্পূূর্ণরূপে আস্থা রাখে।


শ্রীলঙ্কার সংকট অন্যত্র

কিছু মানুষ বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে শ্রীলঙ্কার চলমান অর্থনৈতিক সংকটের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, শ্রীলঙ্কা যে প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে, এর পেছনে দায়ী মূলত ২০১৯ সালের ইস্টার বোমা হামলার পর এর পর্যটন রাজস্বের তীব্র পতন, বিশ্বে কভিড-১৯ মহামারি প্রকোপের পর থেকে রেমিট্যান্স হ্রাস পাওয়া, আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে খাদ্য ও জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী মূল্য এবং কয়েকটি দেশের একতরফা নিষেধাজ্ঞার জন্য বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের বিপর্যয়।

বৈদেশিক ঋণ শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটে হয়তো কিছুটা ভূমিকা রেখেছে কিন্তু এ ক্ষেত্রে চীনকে বলির পাঁঠা বানানো একেবারেই অযৌক্তিক। পরিসংখ্যান বলে, এডিবি শ্রীলঙ্কার একক সর্বোচ্চ ঋণদাতা। এই ঋণ পোর্টফোলিওতে জাপান ও চীনের অবদান যথাক্রমে ১০ শতাংশ। এ ছাড়াও শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন ডলারে গণনা করা হয়। ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ ব্যালান্স শিট সংকুচিত করার ইঙ্গিত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন ডলার খুব কম সময়ে এর মূল্যমান হারায়, যা শ্রীলঙ্কার রুপির মূল্যহ্রাসকে ত্বরান্বিত করে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়।

অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশীদারিত্ব প্রয়োজন

গত ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউস কর্তৃক প্রকাশিত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, তারা এ অঞ্চলে চীনকে বিশেষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে। ইচ্ছাকৃতভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অপর সদস্যকে আলাদা করে ও বাদ দিয়ে ওয়াশিংটন একটি 'মুক্ত এবং উন্মুক্ত' ইন্দো-প্যাসিফিক গঠনের নিজস্ব বিবৃতিকেই অসম্মান জানিয়েছে। আমরা তাদের যা করতে দেখছি, তা পশ্চিমা আধিপত্যের 'স্বৈরতান্ত্রিক' উপায়ে 'গণতান্ত্রিক' আদর্শ প্রচার ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশের প্রতি আন্ডার সেক্রেটারি নুল্যান্ডের ন্যক্কারজনক সতর্কবার্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য, আধিপত্যবাদ এবং ক্ষমতার রাজনীতির অন্তর্নিহিত মানসিকতাকেই তুলে ধরে।

বর্তমানে আমরা সবাই একটি বহু-মেরু বিশ্বে বাস করি, যেখানে সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো একে অপরের সমান। ভারত মহাসাগর অত্যন্ত বিশাল এবং এর উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো এতটাই সম্ভাবনাময়; আগ্রহী সব উন্নয়ন অংশীদারের আন্তরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সবারই সফলতা অর্জন সম্ভব। তাই 'চীনা ঋণের ফাঁদ' নামক বাগাড়ম্বর প্রচার ও একে হাতিয়ার বানানোর চর্চা পরিত্যাগ করার এখনই সময়। এই ঋণের ফাঁদ সংক্রান্ত বাগাড়ম্বর কারোরই উপকার সাধন করবে না। এ ব্যাপারে আমি বাংলাদেশের 'একক দেশের আধিপত্যের পরিবর্তে একটি স্বাধীন, মুক্ত, শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারত মহাসাগর'-এর স্বপ্নকে স্যালুট জানাই।

বাংলাদেশ কী বলছে, তা সবাইকে অবশ্যই শুনতে হবে।

লি জিমিং: বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত