জাফলংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সবটুকু গড়ে উঠেছে দুটি নদীকে কেন্দ্র করে। একটি ডাউকি, অপরটি পিয়াইন। মেঘালয়ের শিলং পিক থেকে উৎপন্ন উমনঘট নদী খাসি জৈন্তিয়া পাহাড়ের বুক চিরে জাফলং জিরো পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ডাউকি ও পিয়াইন নদী নামে দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে দু'দিকে চলে গেছে। সে নদীগুলোর পানি ছিল খুবই স্বচ্ছ ও পরিস্কার। খাসিয়াদের পুঞ্জি ও বৈচিত্র্যময় জীবনধারা, চা বাগান, অরণ্যে আচ্ছাদিত পাহাড়-টিলা আর নদীর ওপর বয়ে যাওয়া পাহাড়ের উতল হাওয়া, পানির গভীরে বিশালাকৃতির পাথরের চিকচিক- এসব মিলিয়ে জাফলং ছিল সত্যিই এক অনন্য জায়গা। সে দৃশ্য অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি করত দর্শনার্থী ও আগন্তুকদের মনে। জাফলংয়ের সুদিনে যারা এগুলোকে দেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই সেসব স্মৃতি সহজে ভুলতে পারবেন না।
প্রকৃতিকন্যা জাফলং কীভাবে তার অপরূপ হারিয়ে শ্রীহীন হয়ে পড়ল? ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যাসহ কয়েক বছর পাহাড়ি ঢলে ডাউকি ও পিয়াইন নদীতে প্রচুর পাথর আসে। ডাউকি ও পিয়াইন নদী পাথরে ভরপুর হয়ে যায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জাফলং খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। সে পাথরগুলোই এক সময় জাফলংয়ের অস্তিত্বের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে সে পাথরে নজর পড়ে প্রভাবশালী বণিকদের। কয়েক বছর তারা কোনো প্রকার নিয়ম-নীতি ছাড়াই পাথর উত্তোলন করে। ম্যানুয়াল পদ্ধতির কারণে সে সময় নদীর তেমন বড় ক্ষতি হয়নি। ক্রমশ লোভ আর রাতারাতি বড়লোক হওয়ার নেশা পেয়ে বসে বণিকদের মনে। নির্মাণকাজের জন্য পাথরের চাহিদাও বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে সেখানে নামানো হয় খননযন্ত্র। সরকারও সামান্য টাকার বিনিময়ে নদীর পাথরসমৃদ্ধ অংশকে খনি হিসেবে ইজারা দিতে থাকে। অল্পদিনের মধ্যেই যন্ত্র-দানবের নিষ্ঠুর থাবায় নদীগুলোকে বিধ্বস্ত করে ফেলা হয়। নদীর তলদেশের পাথর শেষ হলে নজর দেওয়া হয় তীরের প্রতি। যন্ত্রের নির্মম-নিষ্ঠুর কশাঘাতে পার্শ্ববর্তী পাহাড়-টিলা-বন-বসতি সবকিছু লন্ডভন্ড করে পাথর উত্তোলন করা হয়। উপরিভাগের পাথরের মজুত শেষ হয়ে গেলে পাথরখেকোরা মাটির গভীরে নজর দেয়। 'বোমা মেশিন' নামক এক ধরনের যন্ত্র দিয়ে মাটির অনেক গভীর থেকে পাথর তুলে আনা হয়। খাসিয়াদের জীবন ও সংস্কৃতিকে বিষিয়ে তোলা হয়। পাথর ক্রাশার মেশিন আর বিকট শব্দের কারণে পুরো জাফলং যেন আজ 'জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ'।
সংবাদমাধ্যম ও পরিবেশবাদীদের সাহসী ভূমিকার কারণে এক সময় সেখানকার 'প্রলয়নৃত্য' খানিকটা থামে। খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জাফলংকে 'ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য' ঘোষণা করে। বিশেষ করে হাইকোর্ট 'বোমা মেশিন'কে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং জাফলংকে 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' ঘোষণার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় জাফলং-ডাউকি নদী ও নদীর উভয় পাড় থেকে ৫০০ মিটার প্রস্থের এলাকা এবং ডাউকি ও পিয়াইন নদীর মধ্যবর্তী খাসিয়াপুঞ্জিসহ ১৪ দশমিক ৯৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর পর থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকলেও ইসিএ এলাকায় নিষিদ্ধ এমন কাজগুলোর সব থামানো যায়নি।
জাফলং হয়ে উঠেছে পর্যটনের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এত ধ্বংসলীলার পরও সেখানে পর্যটকের আনাগোনা একটুও কমেনি। লাখ লাখ পর্যটক প্রতি বছর এ জায়গায় ঘুরতে আসেন। সম্প্রতি পর্যটকদের সঙ্গে প্রশাসনের নিয়োগ করা স্বেচ্ছাসেবকদের টোল আদায় নিয়ে সৃষ্ট এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাফলং ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। সিলেট জেলা পর্যটন উন্নয়ন কমিটি সেখানে বেড়াতে আসা পর্যটকপ্রতি ১০ টাকা চাঁদা আরোপ করেছে, যেটা নিয়েই ঘটনার সূত্রপাত। পর্যটকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের এখতিয়ার জেলা পর্যটন কমিটির আছে কিনা- সে প্রশ্ন ইতোমধ্যে অনেকে উত্থাপন করেছেন।
জাফলংয়ের অনেক আগেই রাতারগুলে পর্যটকের ওপর চাঁদা আরোপ করা হয়। সে কাজটি করেছে বন বিভাগ, যেহেতু সেটি বন বিভাগের। একটি স্বাধীন দেশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে কেন সাধারণ মানুষকে টিকিট কাটতে হবে- সে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা প্রশাসন কোন যুক্তিতে মানুষকে ঘোরাঘুরি ও নির্মল বিনোদনে এমন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে? তা ছাড়া অনেকেই একে হাইকোর্টের নির্দেশনার স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করছেন। কারণ, ২০১৯ সালে হাইকোর্টের এক রায়ে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্মুক্ত জলাভূমি, সমুদ্র, নদনদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, ঝিল, সমুদ্রসৈকত, নদীর পাড়, পাহাড়-পর্বত, টিলা, বন, বাতাস সবকিছু হলো পাবলিক ট্রাস্ট সম্পত্তি। এগুলোর কোনো একটির অধিকার থেকে নাগরিকদের বঞ্চিত করা সংবিধান পরিপন্থি। সেই রায়ে আরও বলা হয়, এই পাবলিক ট্রাস্ট সম্পত্তির কোনো একটিকেও বেসরকারি মালিকানায় দেওয়া বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার কোনো অধিকার সরকারের নেই।
জাফলংয়ে পর্যটকের ঢল দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং সেখানকার পর্যটনের পুরো ব্যবস্থাপনাটিই অনিয়ন্ত্রিত। সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ, নদী-নালা, ঝরনা-জলপ্রপাত, বন-পাহাড়-টিলা-বন্যপ্রাণী, আদিবাসীদের জীবন- এককথায় সবকিছুর ওপর পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত-উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই সেখানে পর্যটন চলতে দেওয়া উচিত কিনা- সে প্রশ্ন সামনে এসেছে। এ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
পর্যটনশিল্প ও সেবা খাতের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে এবং পর্যটনের সম্ভাবনাময় স্থানে অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সরকার সে পর্যটন এলাকাকে 'পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা' ঘোষণা করতে পারে। বাংলাদেশ পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা ও বিশেষ পর্যটন অঞ্চল আইন, ২০১০ এর ৪(১) ধারাবলে সরকার জাফলংকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য 'পর্যটন সংরক্ষিত এলাকা' ঘোষণা করতে পারে। এতে সেখানকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ নতুন করে প্রাণ পাবে। সাময়িক অসুবিধা হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটা পর্যটনশিল্পের সম্প্রসারণে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে এটা 'প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা' ঘোষণার উদ্দেশ্যকেও সফল করবে।
আব্দুল হাই আল-হাদী :লেখক ও পরিবেশকর্মী