ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য বিক্রি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ট্রাকে করে আর পণ্য বিক্রি করবে না সংস্থাটি। শুধু ডিলারদের নির্দিষ্ট দোকান থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হবে। তবে সবাই তা পাবেন না। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া 'ফ্যামিলি কার্ডধারী' ব্যক্তিরাই শুধু কিনতে পারবেন। কেনা যাবে মাসে সর্বোচ্চ দুইবার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাজারে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে এবং স্বল্প আয়ের মানুষকে সহায়তা করতে টিসিবি দীর্ঘদিন ধরে সাশ্রয়ী মূল্যে সয়াবিন তেল, চিনি, ডাল, পেঁয়াজ বিক্রি করে আসছে। যখন বাজার পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়, তখন সংস্থাটির সরবরাহ বাড়ানো হয়ে থাকে। রোজার সময় ছোলা ও খেজুরও বিক্রি করে সংস্থাটি। এতদিন এই বিক্রির ব্যবস্থাটি ছিল সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় ও জেলা সদরে। সারাদেশে ২৫০ থেকে ৩০০টি খোলা ট্রাকে টিসিবির ডিলাররা পণ্য বিক্রি করেন।

এ বছর রমজান উপলক্ষে সরকার সারাদেশে ১ কোটি পরিবারকে টিসিবির পণ্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং বরিশাল সিটি করপোরেশন বাদে দেশের অন্যান্য জায়গায় কারা টিসিবির পণ্য কিনতে পারবেন, তাঁদের তালিকা তৈরি করে পরিবারপ্রতি একটি করে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়। সূত্র জানায়, সারাদেশে ৮৬ লাখ ১৬ হাজার পরিবারকে এ ধরনের কার্ড দেওয়া হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে আগের মতো খোলা ট্রাকে বিক্রি হয়েছে। এই তিন সিটি করপোরেশনেও ১৩ লাখ ৯০ হাজার কার্ড দেওয়া হবে।

সম্প্রতি বিভিন্ন পণ্যের দাম বেশ বেড়েছে। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ এসব পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ অবস্থায় টিসিবি ফের সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। গত ১১ মে সংস্থাটি জানায়, ১৬ মে থেকে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম শুরু করা হবে। চলবে ৩০ মে পর্যন্ত। কিন্তু ১৫ মে রাতে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে পণ্য বিক্রি স্থগিত করা হয়।

সূত্র জানায়, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ট্রাকে টিসিবির পণ্য বিক্রি বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কারণ, টিসিবির ট্রাকের পেছনে ক্রেতাদের লম্বা লাইন, চাহিদা অনুযায়ী পণ্য না পাওয়া এবং বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃতভাবে উপযুক্ত ব্যক্তি পণ্য পান না। অনেকে এসব নিয়ে ব্যবসা করে। এ জন্য সুবিধাভোগী চিহ্নিত করে কার্ডের মাধ্যমে দোকান থেকে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। সে জন্য আপাতত টিসিবির পণ্য বিক্রি স্থগিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ সমকালকে বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং বরিশাল সিটি করপোরেশনের সুবিধাভোগীদের ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কাজ এখনও শেষ হয়নি। সব সুবিধাভোগীর কার্ড প্রণয়ন শেষ হলে টিসিবির পণ্য বিক্রি শুরু হবে। এ ছাড়া পণ্য আর ট্রাকে করে বিক্রি করা হবে না। ডিলারদের দোকান থেকে বিক্রি করা হবে। চেষ্টা করা হচ্ছে, অ্যাপের মাধ্যমেও বিক্রি করার। এসব পদ্ধতি উন্নয়ন এবং পণ্য সংগ্রহ করতে সময় লাগছে। এ জন্য আপাতত বিক্রি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, জুন মাসে বিক্রি শুরু হবে।

গোপালগঞ্জে জেলা প্রশাসনের তৈরি একটি বিশেষ সফটওয়্যারের সহায়তায় এবার রমজানে টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়েছে। ওই সফটওয়্যারটি এখন সব জেলায় চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা সমকালকে বলেন, জেলা প্রশাসন নিজস্ব উদ্যোগে নাগরিকের তথ্য সংবলিত সফটওয়্যার তৈরি করেছে। এর অধীনে ৩ লাখ ৫ হাজার 'পরিবার পরিচিতি' কার্ড দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার ১৯ লাখ নাগরিকের মধ্যে প্রায় ১১ লাখ মানুষের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে সফটওয়্যারে। এই কার্ড থেকেই কোন পরিবার কী ধরনের সরকারি সহায়তা পাওয়ার উপযোগী, তা ঠিক করা হয়। কোন কার্ডধারী কী সুবিধা পেয়েছেন, সে তথ্যও সার্ভারে থাকছে। একই ব্যক্তির বারবার সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই। রমজানে টিসিবির পণ্যও ওই কার্ডের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কেও এ ধরনের ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

সূত্র জানায়, টিসিবির পণ্য বিক্রি পিছিয়ে দেওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে সয়াবিন তেলের দাম সমন্বয়। বর্তমানে বাজারে কোম্পানিগুলো প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন ১৯৮ টাকা দরে বিক্রি করছে। আর টিসিবি আগের ১১০ টাকা দরে বিক্রি করার ঘোষণা দিয়েছিল। ১১০ টাকা দরে সয়াবিন বিক্রির অর্থ হচ্ছে প্রতি লিটারে ৯০ টাকা ভর্তুকি দেওয়া। এই বিশাল ভর্তুকি বহন করা সংস্থার জন্য কঠিন। এ জন্য দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করেছে টিসিবি।
তবে দাম সমন্বয়ের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান বাণিজ্য সচিব। তিনি বলেন, প্রথমে পণ্য সংগ্রহ করা হবে। পরে দাম ঠিক করা হবে।