বাংলা ভাষার সাংবাদিকতায় একটি যুগের অবসান হলো যেন। আমাদের প্রজন্মের সংবাদপত্র পাঠকরা বেড়ে উঠেছেন যাঁদের কলাম পড়ে; আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী নিঃসন্দেহে তাঁদের প্রথম পাঁচে থাকবেন। পরে পেশাগত কারণে তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ; ঢাকায় এলে সরাসরি দেখা হয়েছে। ফোনে বা সাক্ষাতে খোশগল্পও হয়েছে। সেখানে পেশার বাইরেও নানা বিষয়ে কথা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মাঝেমধ্যে নদী নিয়ে কথা বলতে চেয়েছি।

মনে আছে, সাপ্তাহিক ছুটির এক সকালে সমকাল থেকে ফোনে কথা হচ্ছিল। জানতে চাইলাম, তাঁর আত্মজীবনীর নাম 'ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা' কেন? বললেন, নামটির ব্যাপারে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন নোবেল বিজয়ী সোভিয়েত লেখক মিখাইল আলেকজান্দ্রোভিচ শোলোকভের বই 'অ্যান্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দ্য ডন' থেকে। সুযোগ পেয়ে জানতে চেয়েছিলাম- আপনার শৈশব-কৈশোর কেটেছে মেঘনা ও কীর্তনখোলা তীরের বরিশালে; পাঁচ দশক ধরে বসবাস করছেন টেমস তীরের লন্ডনে। কিন্তু আত্মজীবনীতে 'বুড়িগঙ্গা' নিয়ে আসার কারণ কী? সুদূর লন্ডন থেকে হাসির ঢেউ ঢাকায় আছড়ে ফেলে গাফ্‌ফার ভাই বলেছিলেন- 'আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীকে তৈরি করেছে বুড়িগঙ্গা; আর কোনো নদী নয়।' পরে এ নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। এখন সার্চ দিয়ে দেখছি, সময়টি ২০১৭ সালের জুন মাসে।

মনে পড়ে, শেষবার ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকা এসেছিলেন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। আগেরবারগুলোর মতো আমরা সদলবলে গাফ্‌ফার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেছি। তবে সেবার যাওয়ার সময়ই ঠিক করে গিয়েছিলাম, শুধু নদী নিয়ে আলাপ করব। যদিও গাফ্‌ফার ভাইয়ের বয়স ততদিনে ৮৬। রোগ- শোকভোগও কম নয়। হাঁটতে পারেন না; হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে হয়। দেখলাম, স্মৃতি তখনও নদীর মতোই প্রবহমান। নদীর প্রসঙ্গ তোলায় একটু প্রাণবন্তও হয়ে উঠলেন যেন।

জানতে চেয়েছিলাম- পঞ্চাশের দশকে বরিশাল থেকে নদীপথে ঢাকা আসতেন কীভাবে। বলেছিলেন- স্টিমারে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগত। রাত ১০টায় বরিশালে লঞ্চে উঠে পরের দিন রাত ১০টায় ঢাকার সদরঘাটে নামতে হতো। কারণ নৌপথ ভিন্ন আর কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। ফলে পথে পথে সব ঘাটে যাত্রী ও মালপত্র তোলা-নামা করতে করতে আসতে হতো। আক্ষেপও করেছিলেন- তখন দীর্ঘ সময় লাগত বটে; ভ্রমণ ছিল উপভোগ্য। নদীতেই ধরা মাছের ঝোলে বরিশালের বিখ্যাত বালাম চালের গরম গরম ভাত ছাড়াও নদীতীরের জনপদের তাজা সবজি ও ফলমূল মিলত। শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গার প্রবাহও তখন পর্যন্ত বিবর্ণ ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়নি। বিস্মিত হয়েছিলাম নদী নিয়ে তাঁর আরও নানা স্মৃতির প্রখরতা দেখে।


অবশ্য গাফ্‌ফার ভাইয়ের নদীর চেয়ে বড় বিস্ময়-জাগানিয়া ছিল তাঁর কলাম লেখার ক্ষমতা। গুণগত বা সংখ্যাগত দিক থেকে তো বটেই; হাতের লেখায় কীভাবে এত কলাম লিখে যান তিনি! একটানা ঝরঝরে গদ্য লিখে যাওয়ার এই সক্ষমতা আমি আর কারও দেখিনি। প্রথম দিকে লিখে ফ্যাক্স করে দিতেন; পরের দিকে হাতে লিখে স্ক্যান করে ই-মেইল করতেন। প্রথম দিকে তাঁর কন্যার ই-মেইল থেকে, পরের দিকে নিজেই ই-মেইল খুলেছিলেন। ল্যান্ড ফোনের স্থলে সেলফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করতে পারতেন। শেষদিকে একজন সাচিবিক কর্মীও যুক্ত করেছিলেন তিনি।

ঢাকায় সংবাদপত্রে সংখ্যা যত বাড়ছিল, তার সঙ্গে যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল গাফ্‌ফার ভাইয়ের কলামের সংখ্যা। পাশাপাশি দিবসভিত্তিক আয়োজন ও বিশেষ সংখ্যাগুলোতেও লিখতেন। বছর কয়েক আগে জানতে চেয়েছিলাম, তখন তিনি সপ্তাহে ক'টি কলাম লিখছেন। বললেন, ঢাকা ও কলকাতা মিলে আটটি। সাতটি বাংলা, একটি ইংরেজি। তারপর মুখস্থ বলে গেলেন, কোন বারে কোন সংবাদপত্রে কলাম লেখেন।

গাফ্‌ফার ভাইয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম- লেখার এই অসাধারণ ক্ষমতা তিনি সাহিত্যের বদলে কলামের পেছনে অপচয় করছেন কেন? একুশের গান শুধু নয়; পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তিনি যেসব কবিতা, গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন, তা যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তারপর 'সাহিত্যিক' আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী 'কলামিস্ট' আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী হয়ে ওঠার নেপথ্যের বেদনাদায়ক গল্পটিও বলেছিলেন সেবার। সাহিত্যে অর্থ কম, জমাও হয় ধীরে; যা মেলে তা দিয়ে সংসার চলে না। ফলে প্রবাসে অসুস্থ স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি নিয়ে সংসার চালাতে গিয়েই দ্রুততর ও পরিমাণে বেশি অর্থের জন্যই তাঁকে কলাম লেখায় মনোনিবেশ করতে হয়েছিল।

প্রবাসে অবস্থানের কারণেই কিনা জানি না; গাফফার ভাই ফোনে দেশের নানা গল্প করতে পছন্দ করতেন। এই বিষয়ে, ওই বিষয়ে মতামত ও পর্যবেক্ষণ জানতে চাইতেন। মনে আছে, যুগান্তরে যখন সম্পাদকীয় বিভাগে যোগ দিলাম- জ্যেষ্ঠ একজন সহকর্মী শুরুতেই গাফ্‌ফার ভাইয়ের কাছে সব বিষয়ে মতামত দেওয়ারও 'ঝুঁকি' সম্পর্কে 'সাবধান' করে দিয়েছিলেন। পরবর্তী কোনো কলামে সেই মতামত নামসহ উদ্ৃব্দত হয়ে যেতে পারে।

শুধু আমি নই, ঢাকার শীর্ষ সারির দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত অনেকের কাছেই লেখক ও কলামিস্ট আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীকে নিয়ে অবধারিতভাবে অনেক গল্প জমা রয়েছে। বয়স ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় ত্রিকালদর্শী এই সাংবাদিক ছিলেন সম্পাদকদেরও জ্যেষ্ঠতর; কিন্তু নবীনতম সাংবাদিকদের কাছেও তিনি ছিলেন সহজেই আপন হয়ে ওঠা 'গাফ্‌ফার ভাই'। তাঁর সঙ্গে সব বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলা যেত। তিনি স্নেহ করতেন, প্রশ্রয় দিতেন। অনুযোগ ও ধমকও দিতেন।

একবার গাফ্‌ফার ভাই সমকালে বেড়াতে এলেন। সহজ সম্পর্কের সূত্র ধরেই এক সহকর্মী জানতে চাইলেন তাঁর লেখায় মৃত ব্যক্তির উদ্ৃব্দতি বেশি থাকে কেন? তিনি সহাস্যে উত্তর দিলেন- আমি যাদের সঙ্গে বেড়ে উঠেছি, বন্ধুত্ব বা শত্রুতা করেছি, তাঁদের বেশিরভাগই বেঁচে নেই। আমি দীর্ঘজীবন লাভ করেছি, এতে আমার কী দায়?

গাফ্‌ফার চৌধুরীর প্রয়াণে আমার মতো অনেকে নিশ্চিতভাবেই ফোনের ওপাশে সহজে পাওয়া অভিভাবক হারানোর বেদনা অনুভব করছেন। আমাদের কালের সবচেয়ে আলোচিত কলাম লেখককে শোক ও শ্রদ্ধায় বিদায় জানাচ্ছেন বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী। কিন্তু আমাদের মতো যাঁদের সঙ্গে গত দুই দশক ধরে প্রায় প্রতি সপ্তাহে যোগাযোগ হতো, তাঁদের কারও পক্ষেই গাফ্‌ফার ভাইকে বিদায় জানানো সহজ নয়।

শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সমকালের সম্পাদকীয় বিভাগপ্রধান
skrokon@gmail.com