বৃহস্পতিবার (১৯ মে) দুপুর ২টা। বুধবার রাত প্রায় বিনিদ্র ছিলাম। তাই বৃহস্পতিবার ওই সময়ে ঘুমাচ্ছিলাম। একজন অনুজপ্রতিমের ফোনে ঘুম ভেঙে গেল। আমি হ্যালো বলার সঙ্গে সঙ্গেই ও-প্রান্ত থেকে সে দুঃসংবাদটা দিল। স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কোনো কিছুই আর বলতে পারছিলাম না। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আর আমাদের মাঝে নেই- আকস্মিক এই বার্তাটুকু সইবার মতো শারীরিক অবস্থাও আমার নেই। আমি বেশ কিছুদিন আগে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের অন্যতম উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীকে নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম। আজ আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর প্রয়াণ-সংবাদে ওই লেখাটিই উঠে এলো। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি এবং রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত অধ্যায় একুশে ফেব্রুয়ারির সঙ্গে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বলা ভালো, তিনি এর অক্ষয় অধ্যায়।

যত দিন বাঙালি জাতি থাকবে, বাংলা ভাষা থাকবে, তত দিন আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর নামটি প্রসঙ্গক্রমে উঠে আসবেই।

একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। বিশ্বের দেশে দেশে পালিত হয় একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। একুশের অর্জন ও মর্মান্তিক অধ্যায় স্মরণে প্রভাতফেরিতে কিংবা একুশকে সামনে রেখে যে কোনো অনুষ্ঠানে যে গানটি গীত হয় 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি'- এর স্রষ্টা প্রয়াত আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। বহুমুখী প্রতিভাধারী আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী একজন সব্যসাচী সাংবাদিক হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি তাঁর সৃষ্টির মাঝে অমর হয়ে থাকবেন।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীকে নিয়ে ওই লেখায় তাঁকে বিশ্নেষণ করেছিলাম শুধু একজন সাংবাদিক নয়, বহুমাত্রিক সৃষ্টির কলমযোদ্ধা হিসেবেও। দীর্ঘকাল ধরে সাংবাদিকতার ভুবনে তাঁর অবস্থান ছিল প্রধানত গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, জাতীয়তাবাদী মতাদর্শকে কেন্দ্র করে। এ ধারাতেই স্বদেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর খ্যাতি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তিনি তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসে ধারণ করেছিলেন এবং এ দুই উৎস থেকে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শক্তিতে ঋদ্ধ হয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব নীতিতে অটল থেকেছেন। তাঁর ক্ষুরধার কলমের গতি আমরা দেখেছি অবিরাম। বায়ান্নর সেই দিনগুলোর স্মৃতি আমাদের মানসপটে এখনও জ্বলজ্বল। আমরা যাঁরা একুশের পূর্বাপর অধ্যায়ে সরাসরি যুক্ত ছিলাম, তাঁরা খুব ভালো করেই জানি- আমাদের জাতীয় ইতিহাসে বাঁক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা কত গুরুত্বপূর্ণ। এই গুরুত্বপূর্ণ অংশের অংশীদার প্রয়াত আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী।

তাঁর দীর্ঘস্থায়ী লন্ডন প্রবাস নিয়ে যখন কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন, আমি তখন লিখেছিলাম- এই প্রশ্ন অর্থহীন হিসেবে বিবেচিত, ব্যক্তিগত বৃত্তে আবদ্ধ। বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়ায় আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী জন্মেছিলেন ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর। সেখানে তাঁর ক্রমান্বয়ে বেড়ে ওঠা এবং পর্যায়ক্রমে শিক্ষাজীবন শেষ করে জীবনের স্তরে স্তরে তাঁর সৃজনশীলতা-সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখে তিনি হয়ে যান ইতিহাসসংলগ্ন। ছাত্রজীবন থেকে সাহিত্যের প্রতি আকর্ষিত ছিলেন বরিশালের এই কৃতী সন্তান। কবিতা ও গল্প লেখার মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূচনা। পরে এ সৃষ্টিশীলতার বিস্তার ঘটে একাধিক উপন্যাস রচনায়। কিন্তু সাংবাদিকতায় ব্যস্ত কর্মজীবন তাঁর সাহিত্য সাধনার পথ সংকুচিত করে ফেলে।

তাঁর সাংবাদিকতার কর্মজীবন প্রধানত ইনসাফ থেকে শুরু করে আজাদ, সংবাদ, ইত্তেফাক ও পূর্বদেশের মতো দৈনিক পত্রিকা ঘিরে আবর্তিত। এরই মধ্যে কাজ করেন একাধিক সাপ্তাহিক, কচিৎ মাসিক পত্রিকায়। লন্ডনের প্রবাস জীবনেও তিনি একাধিক পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন; কখনও সম্পাদনায়, কখনও প্রকাশন-সম্পাদনায় এবং সে জীবন দেশের অনেক দৈনিক পত্রিকায় কলাম রচনায় সমর্পিত। তাতেও মাঝেমধ্যে বিতর্কের ঢেউ উঠতে দেখা গেছে। কিন্তু আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর জীবন একজন সাংবাদিক প্রবরের অনন্য জীবন এবং তাতেই তাঁর সব তৃপ্তি। আর এ কারণেই তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সৃষ্টিশীলতা সাংবাদিকতার জন্য অনেকটা আড়ালে চলে যায়। সেই পঞ্চাশের দশকে 'কথাশিল্প :জীবন প্রত্যয় ও সাফল্য' শীর্ষক নিবন্ধে তরুণ গল্পকার আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী সম্পর্কে ইতিবাচক বিশ্নেষণ করেছিলাম। এও লিখেছিলাম, মানুষ যদি তাঁর কর্মে বেঁচে থাকেন, তাহলে সেই জায়গাটি আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বায়ান্নতেই মজবুত করে নেন।

'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি'- এই কালজয়ী গানটি লিখে যিনি জাতীয় মর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন, তেমনি একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বের দেশে দেশে উদযাপনে তিনি, অর্থাৎ কবি আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপ্তি ছড়িয়েছেন। তাঁর এই ব্যাপ্তি জাতির গৌরব। আমাদের এই গর্ব ও অহংবোধ তিনি উত্তরোত্তর আরও সমৃদ্ধ করেছেন নিজ গুণেই। সাংবাদিক, কবি, গল্পকার, কথাসাহিত্যিক ইত্যাদি কোন অধ্যায়ে তাঁর সর্বাধিক মর্যাদার আসন- এ প্রশ্নের জবাব সম্ভবত একটিই, আর তাহলো 'একুশের গান'। এ নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। নির্দিষ্ট করে এই একটি ক্ষেত্রে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও নিঃসন্দেহে কালজয়ী স্রষ্টা। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী জীবনসায়াহ্নেও ছিলেন নিরলস একজন কলমসৈনিক। পাঠককে ধরে রাখার শক্তি সব লেখকের থাকে না, কারও কারও থাকে। এই কারও কারোর মধ্যে আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী অন্যতম। আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী হতে হয় সেই রকম কর্মময় অধ্যায়ের মধ্য দিয়েই। তিনি তাঁর কর্মগুণেই আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

আহমদ রফিক: ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্রগবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক