বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির পাশাপাশি আমাদের দেশের অঞ্চলভেদে আঞ্চলিক সংস্কৃতি রয়েছে। অঞ্চলভেদে প্রতিটির ভিন্নতা খুবই স্পষ্ট। একটির সঙ্গে অপরটির যোজন ব্যবধান। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা সর্বাধিক দুর্বোধ্য। অপরাপর অঞ্চলের মানুষের পক্ষে এ দুই অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা বোঝা সহজ নয়। আঞ্চলিক ভাষাগুলোর বর্ণমালা নেই বিধায় লিখিত আকারে স্থায়িত্বের উপায়ও নেই। আঞ্চলিক ভাষা টিকে থাকে, বেঁচে থাকে কেবল ভাষার ব্যবহারে এবং মানুষের মুখে মুখে। নানা বিবর্তনে পৃথিবীর অগণিত আঞ্চলিক ভাষা লুপ্ত হয়ে গেছে। তার প্রধান এবং একমাত্র কারণটি বর্ণমালাহীন আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার লোপ। আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার না হলে সেই ভাষা লুপ্ত হওয়ার পথ ধরে।
ধর্মীয় উৎসব-পার্বণকে কেন্দ্র করে কতিপয় সামাজিক আচার-সংস্কৃতির অমিল লক্ষ্য করা যায়, যার সঙ্গে ধর্মের নূ্যনতম সম্পর্ক নেই। মহরম মাস মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মাস এবং শোকের মাস হিসেবে বিবেচিত বা গণ্য। কারবালা প্রান্তরে এজিদের বাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল ইমাম হোসেনের বাহিনী। এর চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি ঘটে অজস্র অনুসারীসহ ইমাম হোসেনকে নির্মম হত্যার মধ্য দিয়ে। মুসলিম সম্প্রদায়ের শিয়াদের শোকের আনুষ্ঠানিকতা এক্ষেত্রে বহুবিধ। তবে সুন্নি মুসলিমরাও এক থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত নানা আনুষ্ঠানিকতায় শোক পালন করে থাকেন। মহরমের ১০ তারিখ আশুরার দিনটিকে কেন্দ্র করে নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা দেশজুড়ে পালিত হয়। আশুরার দিনটিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে, শোক পালনের সঙ্গে যার কোনোই সম্পর্ক নেই। নেই সংগতিও। প্রায় প্রত্যেক কন্যাসন্তানের পিতাকে মেয়ের বিয়ের পর প্রথম আশুরার দিনে রান্না করে পোলাও-কোরমা, আস্ত মুরগির রোস্টসহ (স্থানীয় ভাষায় দুরুস-পোলাও) অঢেল খাদ্য পাঠানোর রেওয়াজ রয়েছে। এই সামাজিক আচার পালনে ব্যর্থ হলে কন্যার পিতা-পরিবারের সামাজিক মান-মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে মুখ রক্ষার উপায় থাকে না। তাই শত কষ্ট হলেও অনেক অপয়া কন্যাসন্তানের বাবাকে এই সামাজিক আচার পালনে বাধ্য হতে হয়।
শবেবরাত শব্দটি আরবি নয়, ফারসি শব্দ। আমাদের উপমহাদেশে দিনটি অধিক গুরুত্বের সঙ্গে ধর্মীয় গাম্ভীর্যে পালিত হয়ে থাকে। অথচ আরব দেশে শবেবরাত দিনটি ধর্মীয়ভাবে পালনের নজির নেই। পাঁচ বছর ইরাকের বিভিন্ন স্থানে কর্মসূত্রে ছিলাম। শবেবরাতের দিনে বা রাতে নূ্যনতম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সেখানে দেখিনি। মুসলিম অধ্যুষিত ইরাকে শবেবরাত পালনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করছি। আমার প্রথম কর্মস্থল ছিল উত্তর ইরাকের কিরকুকে। সেখানেই প্রথম শবেবরাত পালন করেছিলাম। এদিন সরকারি ছুটি ছিল না। ছিল না দিনটিকে কেন্দ্র করে সামান্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। আরবিভাষী ও কুর্দিভাষী স্থানীয়দের কাছে দিনটির বিষয়ে জিজ্ঞেস করে কারও কাছেই সদুত্তর পাইনি। তাঁরা অবাক হয়েছেন দিনটির ধর্মীয় ব্যাখ্যা শুনে। দিনটি পালন তো পরের কথা, এর ধর্মীয় তাৎপর্য সম্পর্কে অকপটে অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। আমাদের দেশের কিছু প্রবাসী কর্মজীবী মানুষ সেখানকার এক মসজিদে মাগরিব-এশার নামাজ আদায়ের পর মসজিদের কেয়ারটেকারের বারবার তাগিদ সত্ত্বেও মসজিদ ত্যাগ না করে নামাজরত ছিলেন। অগত্যা কেয়ারটেকার পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে নামাজরত সবাইকে ধরে থানা হাজতে নিয়ে যায়। এ নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে হইচই পড়ে গেলে বাগদাদের বাংলাদেশ দূতাবাসে খবর দেওয়া হয়। পরদিন সকালে দূতাবাসের দায়িত্বশীলরা এসে আটককৃতদের হাজতমুক্ত করেন। ইরাকের অপরাপর দিনগুলো থেকে এই দিনটিকে পৃথকভাবে দেখার সুযোগ আমার হয়নি। কোথাও দিনটিতে ধর্মীয় আচার-আনুষ্ঠানিকতা দেখিনি। সাধারণ দিনের মতো তাৎপর্যহীন রূপেই দিনটি দেখেছি। চট্টগ্রামে দিনটিতে পূর্বাপর ধর্মীয় সামাজিক আচারের নিয়মে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে খাদ্য পাঠানোর সামাজিক আচার রয়েছে। রান্না করা পোলাও, কোরমা, আস্ত মুরগির রোস্ট পাঠানোর সামাজিক বাধ্যবাধকতা কন্যাসন্তানের পিতা বা তাঁর পরিবারকে পালন করতে হয়।
আমাদের স্থানীয় সমাজ আজও সামন্ত যুগের ধারাবাহিকতা বহন করে চলেছে। তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এসব সামাজিক আচার। এই অনাকাঙ্ক্ষিত উদ্ভট সামাজিকতা সৃষ্টির মূলে সমাজের ধনিক শ্রেণির সমাজপতিরা নিশ্চয় দায়ী। আমাদের সমাজের সমাজপতিরা আর্থিকভাবে অনেকেই অধিক সচ্ছল। তাঁদের বিত্ত-বৈভব প্রদর্শনের জন্য তাঁরা সমাজে নিজেদের জাহির করতেই এসব সামাজিক আচারের জন্ম দিয়েছেন। নিজেদের অর্থের জৌলুস প্রকাশ করতেই চালু করেছেন উৎসব-পার্বণকেন্দ্রিক হরেক সামাজিক আচার-রেওয়াজ, যেগুলো সাধারণের জন্য অনাচারতুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় সমাজপতিদের আদেশ-নির্দেশে সমাজ চালিত হয়ে থাকে। তাঁদের আরোপিত সামাজিক আচারগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণের জন্য দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। একমাত্র ভুক্তভোগীরাই অনুভব করে থাকেন সমাজের অনাকাঙ্ক্ষিত আচার-রেওয়াজ পালনের দায় কত কষ্টে তাঁদের মেটাতে হয়। ধর্মীয় সম্পর্কবিহীন এসব আচার-রেওয়াজ সামাজিকতার খোলসে টিকে রয়েছে বটে, তবে অর্থনৈতিক কারণে এসব নিষ্ঠুর-অমানবিক সামাজিকতা সাধারণের জন্য চরম বিড়ম্বনার বোঝাস্বরূপ, যা তাঁদের নিয়মিত ভারাক্রান্ত করে চলেছে। নিদারুণ অর্থদণ্ডের মাশুল তাঁদের দিতে হয় সামাজিক বাধ্যবাধকতার অজুহাতে। বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলেও নানা অসংগতিপূর্ণ সামাজিক আচার নিশ্চয় রয়েছে। তবে চট্টগ্রামের মতো অধিক ব্যয়বহুল সামাজিক বিড়ম্বনা অন্য অঞ্চলে হয়তো নেই। এসব অপ্রয়োজনীয়-গুরুত্বহীন সামাজিক আচারের অবসান অপরিহার্য। এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিও জরুরি। যেসব সামাজিকতা সাধারণের জন্য পীড়নমূলক, সেগুলো পরিহার কেবল আবশ্যিক নয়, অপরিহার্যও।
আমার এক আত্মীয়ের মৃত্যুর পর জানাজা পড়ানো নিয়ে পাশাপাশি দুই মসজিদের ইমামের তীব্র বিবাদ দেখে হতবাক হয়েছিলাম। জানাজার নামাজে ইমামতি কে করবেন এই নিয়ে পরস্পরের তীব্র বাগ্‌যুদ্ধ। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। মৃতের পরিবারের ওপর পরস্পর তাঁরা চাপ সৃষ্টি করেন জানাজার ইমামতি পাওয়ার উদ্দেশ্যে। শেষ পর্যন্ত সামাজিকভাবে বিষয়টির শান্তিপূর্ণ মীমাংসা হলেও আমার কাছে পুরো বিষয়টি বুঝতে সময় লেগেছিল। ভেবেছিলাম হয়তো মৃতের প্রতি অত্যধিক ভালোবাসায় তাঁরা জানাজা পড়ানোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায়-প্রতিযোগিতায় পরস্পর একে অপরের বিরুদ্ধে বিবাদে লিপ্ত হয়েছে। পরে জেনেছি, আসল উদ্দেশ্য অন্যখানে। জানাজায় ইমামতিতে ইমামকে অর্থ প্রদানের রেওয়াজ চট্টগ্রামে রয়েছে। এ ছাড়া দাফন প্রক্রিয়া, মিলাদ, কুলখানি-কোরআন খতমসহ নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন নিশ্চিত হবে সেই ইমামের দ্বারা, যিনি জানাজার নামাজের ইমামতির সুযোগ পাবেন। আর্থিক কারণই দুই ইমামের পরস্পরের বিবাদ-প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল কারণ ছিল। দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে জানাজার নামাজের ইমামতির জন্য ইমামকে অর্থ প্রদানের নজির আছে বলে জানা নেই। কিন্তু চট্টগ্রামে যে রয়েছে, সেটা আমি স্বয়ং প্রত্যক্ষ করেছিলাম। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়- হায়রে ভজনালয়, তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়।
মযহারুল ইসলাম বাবলা :নির্বাহী  সম্পাদক, নতুন দিগন্ত