পাকিস্তানের আইয়ুব আমলের শেষদিকের কথা। সারাদেশ, বিশেষ করে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান মৌলিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে উত্তাল। সঙ্গে যোগ হয়েছে কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আন্দোলন। যে কোনো সময় গণঅভ্যুত্থান ঘটে যেতে পারে। মাঠ প্রস্তুত; প্রস্তুত ইতিহাসের সাইরেন। কিন্তু আইয়ুবের বশংবদ আমলা আর বিডি (বেসিক ডেমোক্রেসি) মেম্বাররা তা মানতে নারাজ। তারা অহর্নিশ আইয়ুব আর তার তথাকথিত উন্নয়নের গুণগানেই ব্যস্ত। ঘটা করে পালন করছে 'উন্নয়নের দশক'। সে অবস্থাতেই ইত্তেফাকের সম্পাদক বিশিষ্ট সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তার পত্রিকায় এদেরকে লক্ষ্য করে ছুড়ে দিলেন তার ঐতিহাসিক বাক্য 'ইহাদের চোখে বিলাই মুতিয়া দিয়াছে'। রাতারাতি এই বাক্য রূপান্তরিত হলো একটা প্রতিবাদের স্লোগানে। বাকিটা ইতিহাস, যা সবারই জানা।

বিশ্বাস করা হয়, বিড়ালের প্রস্র্রাব যদি কারও চোখে লাগে, তার দৃষ্টিশক্তি নাকি ঝাপসা হয়ে যায়; কোনো জিনিসকেই সে সঠিকভাবে দেখতে পারে না। সে কথা মনে করেই হয়তো মানিক মিয়া এই বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন।

আজ আর আইয়ুব খান নেই; নেই সেই বিডি যুগ। কিন্তু কিছু মানুষ এখনও রয়ে গেছে, যারা সেই আইয়ুব আমলের বিডি মেম্বারদের মতোই প্রভুর গুণগানে ব্যস্ত। সামনে যা ঘটে তারা তা দেখে না। দেখলেও ভুল দেখে। কখনও দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার কারণে, কখনও বা প্রভুকে সন্তুষ্ট করার জন্য।

সম্প্রতি কারও কারও বক্তব্য শুনে দূর শৈশবে পড়া মানিক মিয়াকে মনে পড়ে। তারা বলছেন- বাংলাদেশে এখন কোনো বেকারত্ব নেই; উল্টো শ্রমিক সংকট রয়েছে। অথচ মাত্র দু'মাস আগেই (৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলাদেশের অন্যতম গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের এক জরিপের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, বাংলাদেশে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ আর স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ৩৭ শতাংশ কর্মহীন বা বেকার। একই প্রতিবেদনে বিবিসি আরও জানিয়েছে, এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। তার ওপরে রয়েছে পাকিস্তান। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ আর পাকিস্তানের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রসংগত স্মর্তব্য, দু'বছর আগে ইউরোপীয় ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) জানিয়েছিল, বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট বেকার। তারা আরও জানিয়েছিল, প্রতি বছরই ২২ লাখ নতুন লোক কাজের বাজারে আসছে। এর মাঝে মাত্র ৭ শতাংশ কাজ পাচ্ছে, আর দুই-তৃতীয়াংশই বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। সেই হিসাবে প্রতি বছর ১৪ থেকে ১৫ লাখ লোক বেকারের মিছিলে যোগ দিচ্ছে। মনে পড়ে, ২০১৯-এর জুনে আমাদের শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান সংসদে দাঁড়িয়ে জানিয়েছিলেন, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৭৭ হাজার।

এ তো গেল পরিসংখ্যানের কথা। পরিসংখ্যানের বাইরেও তথ্য থাকে। শোনা যায়, ৪০তম বিসিএসে নাকি ৫ লাখ চাকরিপ্রার্থী পরীক্ষা দিয়েছিলেন। পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ৪৩ পদের বিপরীতে ৭৩ হাজার আবেদন জমা পড়েছিল। বেকারদের নিয়োগ পরীক্ষার এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে।

বস্তুত গত দু'বছরে করোনার কারণে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক যৌথ জরিপ থেকে জানা যায়, করোনাকালে ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। এই জরিপ আরও জানাচ্ছে, দারিদ্র্যের কারণে ২৮ শতাংশ মানুষ শহর থেকে গ্রামে চলে গিয়েছিল। এর মাঝে ১৮ শতাংশ শহরে ফিরে এসেছে। চাকরি হারানোর কারণে ১০ শতাংশ ফিরতে পারেনি। এ গবেষণা থেকে আরও জানা যায়, কভিডের আগে শহরের দরিদ্র মানুষের মাঝে বেকারত্বের হার ছিল ৭ শতাংশ। আর কভিডের পর এই হার বেড়ে হয়েছে ১৫ শতাংশ। (সূত্র :প্রথম আলো, ৪ নভেম্বর ২০২১)।

ওপরের হিসাবের বাইরেও কে না জানে, করোনাকালে অর্ধশতাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে! যার ফলে হাজার হাজার (কেউ কেউ বলে লক্ষাধিক) শ্রমিক তাদের চাকরি হারিয়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি ২০২২, দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীভুক্ত প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) এক সমীক্ষা অনুযায়ী, কভিড-১৯ এর কারণে দেশের অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত ৩৭ শতাংশ মানুষ বেকার হয়েছে। এ ছাড়াও আইএলও জানিয়েছে, করোনা মহামারির কারণে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার হয়েছে দ্বিগুণ। গত দুই বছরে করোনার কারণে ১৬ লাখ ৭৫ হাজার তরুণ কাজ হারিয়েছে। (সূত্র :ইত্তেফাক, ২৯ জানুয়ারি)।

প্রথম আলোর প্রাগুক্ত রিপোর্ট থেকেই জানা যায়, গত দুই বছরে শহরাঞ্চলের মানুষের আয় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। গ্রামাঞ্চলে কমেছে ১২ শতাংশ। এদিকে যথাযথ চাকরি না পাওয়ার কারণে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মাঝে হতাশা বাড়ছে। বাড়ছে আত্মহননের প্রবণতা। গত এক বছরে বেশ ক'জন তরুণ-তরুণী জীবন সম্বন্ধে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। বলাই বাহুল্য, বেকারত্ব হতাশার জন্ম দেয়। আর হতাশা আত্মহননের।

এর পরও দেশে কেউ যদি বেকার দেখতে না পান, তহালে কী বলার আছে! তারা হয়তো নিজেদের তৈরি গজদন্ত মিনারের বাইরে কিছু দেখেন না কিংবা দেখতে চান না। যে দৃশ্য তাদের চোখকে আরাম দেয়, তারা তা-ই শুধু দেখেন। শ্রদ্ধেয় মানিক মিয়া জীবিত থাকলে আজ কী লিখতেন, জানি না।

আমাদের নীতিনির্ধারকরা বরাবরই সত্যকে পাশ কাটিয়ে যেতে চান। যদিও বোধে আসে না- সত্য স্বীকারে তাদের সমস্যা কোথায়! যে কোনো দেশের নীতিনির্ধারকরা বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই, তা সে যত কঠিনই হোক, সমস্যা সমাধানে এগিয়ে যায়। আমরাও তাই চাই। চাই, আমাদের কর্তারা বাগাড়ম্বর বাদ দিয়ে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে যথাযথ ব্যবস্থা নেবেন। না হয়, চলমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় আমাদের সামনে আরও কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে, তা বলাই বাহুল্য।

মোশতাক আহমেদ: কলাম লেখক ও জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা