মাঈন চৌধুরী, ডাকনাম পিটু। বাড়ি ফেনী শহরে। একদা উদীচীর গায়ক। ছাত্র ইউনিয়নের আদর্শে উজ্জীবিত। কমিউনিজমে বিশ্বাসী। নানাবিধ গান তাঁর কণ্ঠে। রবীন্দ্রসংগীত। গণসংগীত। লোকগীতি গায়, গজলও। নিশ্চিত গুণী শিল্পী।

পঞ্চাশ উত্তীর্ণ মাঈন চৌধুরীর নিবাস বার্লিনে। স্ত্রী রিটা শেফার। জার্মান। সরকারের উঁচু পদে আসীন। কন্যা লেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পর্বে। মাঈন চৌধুরী জার্মান পাসপোর্টধারী। সর্বান্তঃকরণে বাঙালি। ভাত, ডাল চাই ডিনারে। নিজেই পাচক। তার পাচন সুস্বাদু। মাঈন চৌধুরী বার্লিনসহ জার্মানির বাঙালিমহলে পিটু নামেই সমধিক পরিচিত। হেতু, গায়ক। বিভিন্ন শহরে আমন্ত্রিত। কদর সর্বত্র। পিটু বেতনভুক সমাজকর্মী। নানাদেশের উদ্বাস্তুর সঙ্গে কাজে সম্পর্কিত। ওঁর কাছেই শোনা যায় কোন দেশের শরণার্থীর আচার-ব্যবহার, কালচার কী রকম। জাফর ইকবালের কাছেও শুনি। তিনিও বেতনভুক সমাজকর্মী। তাঁরও বিদেশি উদ্বাস্তু নিয়ে কাজ। কাজের ধরন ভিন্ন। মূলত উদ্বাস্তুর পরিবারের নানা সমস্যা সম্পর্কিত।

জাফর ইকবাল বরিশালের। জার্মান নাগরিকত্ব পাসপোর্টে। ওঁর স্ত্রী তাহমিনা। ইংরেজি ভাষাসাহিত্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। বার্লিনে একটি স্কুলে যুক্ত। ওঁদের একমাত্র সন্তান আসিফ ইকবাল স্কুলপড়ূয়া।

বলার কথা এই- দু'জনের কাছে ভিনদেশি শরণার্থীর দেশীয় আচার-ব্যবহার, দেশীয় সংস্কৃতি (আচার-ব্যবহারেই দেশীয় সংস্কৃতির রূপস্বরূপ প্রকাশিত), এমনকি সামাজিকতা, মেজাজ ও উদ্ঘাটিত বৈশ্বিক সমাজচিত্র বোঝা যায় দেশকালের চিত্রণে।

মাঈন চৌধুরী, জাফর ইকবালের মুখনিঃসৃত বাণীতে আমরাও কিছু চিত্রচিত্রণ পাই। ধনী হই। বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজচিত্রও পাই ওঁদের কাছে- খালেদ নোমান (নমি হিসেবে অধিক পরিচিত), মামুন (আবদুল্লাহ আল মামুন), বাবুল (সৈয়দ বাবুল), মামুন (মামুন ইসলাম খান), গৌতম ভট্টাচার্য, লুৎফুর (লুৎফুর খান), নূরী (লুৎফরের স্ত্রী; বার্লিনের আওয়ামী লীগ নেত্রী), মিজান (মিজানুর রহমান খান, আওয়ামী লীগ নেতা), রুবেল (নূরে আলম সিদ্দিকী, আওয়ামী লীগের বার্লিন নেতা), আউয়াল (আউয়াল খান) মেক্সিকান রেস্তোরাঁ 'পায়েলা'র মালিক। ওঁর রেস্তোরাঁয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সংবর্ধিত হন। সংবর্ধনায় ডক্টর মোমেন বলেন, 'বিদেশে অনেক বাংলাদেশি চাকরি, ব্যবসায় সফল নিজেদের অধ্যবসায়ে, পরিশ্রমে। আমরা গর্বিত।'

উল্লিখিত ব্যক্তিকুলের সংস্পর্শিত হলে দেশের হালহকিকত কী, খবর পাই। বাংলাদেশের মিডিয়ায় কী প্রচারিত, প্রকাশিত ইন্টারনেট বা অন্য কোনো মাধ্যমে ওয়াকিবহাল।

বাংলাদেশের সংবাদপত্র তথা মিডিয়ায় নিত্যদিন দুর্ঘটনা, মৃত্যু, ধর্ষণ, নানা কেলেঙ্কারি, রাজনীতি, মন্ত্রীদের বাহাস ফলাও করে প্রকাশিত। পাঠেও অরুচি, অনেকের। বরং টিভিতে ভারতীয় সিরিয়াল দেখতেই উৎসাহী।

কথাটি সম্ভবত খালেদ নোমান বলছিলেন একবার (কিংবা অন্য কেউ। ঠিক মনে পড়ছে না) : 'ভারতীয় বাংলা সিরিয়াল বাংলাদেশের অন্দরে ঢুকে গেছে। রাত ৮টার আগেই রান্নাবান্না শেষ করে গৃহিণী টিভির সামনে। টেলিফোন বাজলেও ধরে না। এই নিয়ে মোল্লাদের ক্ষোভ। ভারতীয় চ্যানেল বন্ধের দাবি। হিন্দু কালচার বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। হিন্দি সিরিয়াল, ছবি না দেখে ঘুমোতে যায় না। কালচারালের আধিপত্য নানা দেশে নানাভাবে প্রবেশ। যেমন আমেরিকান কালচার।' কথাগুলো হুবহু এ রকমই বলেছেন, দাঁড়ি-কমাসহ, তা হয়তো নয়। তবে অনেকটাই কাছাকাছি।

প্রায় চার দশক (বা বেশি) বার্লিনের বাসিন্দা নমি। বার্লিন দেয়ালধস এবং দুই জার্মানির একত্রীকরণের প্রত্যক্ষদর্শী। যেমন আরও অনেক বাঙালি।

চট্টগ্রাম কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন নমি। বিপ্লবী ছাত্র সংগঠনে যুক্ত একদা। সমাজবাদ, মার্ক্সবাদে উদ্বু্বদ্ধ। চট্টগ্রামের 'অরিন্দম নাট্যগোষ্ঠী'র প্রাক্তনী। বার্লিনের 'রাকিবো' জার্মান নাট্যদলেও অভিনয় করেছেন। এখন একটি কফি বার (কফি ছাড়াও বিয়ার, ওয়াইন, নানাবিধ পানীয়সুলভ)-এর মালিক। বাংলাদেশ কালচারাল সংগঠনের নেতৃত্বে।


বিশ্বের রাজনীতি, বিশেষত বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতি, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুরধার কথা বলেন। দলবল নির্বিশেষে তুলাধুনা। মোল্লা, মোল্লাগোষ্ঠী, ফতোয়াবাজ, ধর্মান্ধদের কঠোরতম সমালোচক। যুক্তি যথাযথ। সব কথা লিখলে কোনো পত্রিকার হিম্মত নেই প্রকাশের। মোল্লা, ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে। পত্রিকা জ্বালিয়ে দেবে। মোল্লা, ধর্মান্ধদের ভয়ে লেখা, সমালোচনার স্বাধীনতাও হারিয়েছে। হারানোর সহযোগী সরকারও। সরকারের তোল্লায়ে মোল্লাগোষ্ঠীর বাড়বাড়ন্ত। দিনে দিনে বাড়ে কালকেতু। দুধকলা দিয়ে কেউটে পুষলে ছোবল মারবেই একদিন। সময়-সুযোগে। বাংলায় মোক্ষম প্রবাদ- 'বিয়ের রাতে বিড়াল মারো'। না মারলে পরিণতি কী? কী হয়? কতটা প্রশ্রয় পায়? প্রত্যেক ভুক্তভোগীর জানা। জানলাম এক মোল্লাগোষ্ঠীর আস্ম্ফালনে। দৌরাত্ম্যে। হুংকারে।

সাবেক বিচারক শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিকের নেতৃত্বে সমন্বয় কমিটির তদন্ত রিপোর্টে পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রকাশ, গত ৯ বছরে মৌলবাদী, ধর্মান্ধ, মোল্লাগোষ্ঠীর বীভৎস কাণ্ড, কার্যকলাপ।

প্রবাদ- চোরের মায়ের বড় গলা। ঠিক তাই। এক প্রভাবশালী ধর্মীয় গোষ্ঠী (সরকার যাদের কাছে নতজানু) বলেছে :'সব মিথ্যে'। এও বাহ্য। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট উড়িয়ে দিচ্ছে। হুমকি দিচ্ছে। কমিটিকে শায়েস্তা করার হুঁশিয়ারি। তদন্ত কমিটির সঙ্গে যাঁরা এবং যেসব মানবাধিকার সংস্থা জড়িত তাঁরা নাকি ভুঁইফোঁড়। রেহাই পাবে না। দলবল নিয়ে কঠোর সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বুঝুন স্পর্ধা। স্পর্ধার আশকারাদাতা কে, কারা?

অনুজ স্বপন টেলিফোনে বললেন, আগে ভণ্ড মোল্লা, মৌলভি, মাদ্রাসার মাস্টার হুজুরদের বদমায়েশি, কেচ্ছা, ধর্ষণ অপকর্ম মিডিয়ায় যৎসামান্য আসত। এখন ফলাও করে প্রকাশিত। কারণ প্রত্যেকের হাতে স্মার্টফোন। সামাজিক মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। ছবিসহ। দেশের লোকে জানতে পারছে হেফাজতের মামুনুল হকের কেচ্ছা। এক মাদ্রাসার শিক্ষক কিশোরী মেয়ে নুসরাতকে ছাদে নিয়ে কেরোসিন দিয়ে পুড়িয়ে মারার ঘটনা। বগুড়ার এক মাদ্রাসার ছাত্রী বয়স ১০, মাদ্রাসার শিক্ষক মসজিদে নিয়ে ধর্ষণ করে ধরা পড়েছে। এদের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ, গ্রামবাসী, দেশবাসী সোচ্চার।

ধর্মের নামে ধর্মীয় পান্ডাদের কীর্তিকলাপ। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একবার ওডিশার পুরির জগন্নাথ মন্দিরে গিয়েছিলেন; পুরোহিতদের বাধায় হিন্দু নন- এই ফতোয়ায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ইন্দিরা কুর্নিশ জানান।

যুবতীরা ঢুকলে পান্ডাদের প্রশ্ন নেই; কোন ধর্মের- জিজ্ঞেস করে না। মন্দিরের আঁধার পথে পান্ডারা যুবতীদের হেনস্তা করে প্রবেশের ছাড়। বছর তিনেক আগে কবি মাকিদ হায়দার জগন্নাথ মন্দিরে গিয়ে পান্ডাদের বদমায়েশি দেখে তুলনা করেন বাংলাদেশের ভণ্ড মোল্লার চরিত্রে অমিল।

খাঁটি কবি নাকি ক্রান্তদর্শী। হয়তো। লিখবেন, এমন দেশটি কোথায়ও খুঁজে পাবে নাকো তুমি। এবং সেই দেশ, সকল দেশের সেরা। আমার জন্মভূমি।

প্রায় পঞ্চাশ বছর (১৯৭৪ সাল থেকে) নির্বাসনে। আমার দেশ, জন্মভূমি দেখিনি। ইতোমধ্যে হয়তো সকল দেশের সেরা। কতটা, বন্ধুকুলের বয়ানে ফোনে, চিঠিতে (ইদানীং ই-মেইল) বিস্তারিত। সংবাদপত্রে আরও। কবুল করি, সংবাদপত্র পড়ি না। কালেভদ্রে অবশ্য। বন্ধুদের প্ররোচনায় মাঝে মাঝে। 'অমুক খবর, প্লিজ পড়ূন।' বাধ্য হই।

ইন্টারনেটে সংবাদপত্র খুললেই গা শিউরে ওঠে। রীতিমতো অসুস্থ হই! বয়স হয়েছে। ঠিক নয় কাবু হওয়া। কিন্তু হতে হয়। কতটা হলে বিবেকশূন্য হবে, এই অসিলায়, প্রতিজ্ঞা করলুম, একনাগাড়ে সাত দিন বাংলাদেশের খবরের কাগজ পড়ব। পড়ে, ঘিলু ওলটপালট। হত্যা, ধর্ষণ, রাহাজানি, প্রতারণা, ডাকাতি, ভূমি দখল, টাকা চুরি (বড় অঙ্কে, ব্যাংক বা নানা সরকরি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে), দুর্নীতি, নেতা-মন্ত্রীর বাখোয়াজ। সুসংবাদ নেই; দুঃসংবাদ প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতায়।

প্রশ্ন জাগে- এইসব সংবাদ পড়ে বাংলাদেশের মানুষ কতটা সুস্থ? নাকি অসুস্থতায় অভ্যস্ত? সম্ভবত সুস্থ! ফরমালিনে ভেজাল খাবে, দূষিত বাতাসে নিশ্বাস নেবে, কালচারও করবে! এমন দেশটি কোথায়ও (কোথাও) খুঁজে পাবে নাকো তুমি। সে যে সকল দেশের সেরা।

পরপর তিন বছর চ্যাম্পিয়ন বিশ্ব দুর্নীতির তালিকায়। এ বছরেও ছুঁইছুঁই। কেন পয়লা, 'শ্রেষ্ঠ' হয়নি? বাংলাদেশ সরকার নাকি দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স। বাহবা দিচ্ছিলুম। টোল খাই। শরীফ উদ্দিনের ঘটনায়। দুদকের বরখাস্ত এই কর্মকর্তার চাকরি পুনর্বহালের আবেদন খারিজ। দুদকের অফিসিয়াল নিয়ম-নথিতে একজনের চাকরিচ্যুতির যে বিধান ভয়ংকর অমানবিক, আইনবহির্ভূত। কে পাস করেছিল এই আইন? কারা মূলে? সরকার কি খতিয়ে দেখেনি? হেতু কী?

বাংলাদেশ সরকার গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে দুর্নীতি ধ্বংসের। তাই? দেশবাসী কি প্রমাণ পাচ্ছে? দুর্নীতি দমনে শরীফ উদ্দিন তৎপর, মামলা করছেন দুর্নীতিবাজদের। হায়! স্থান থেকে বদলি। সরকারের দুর্নীতিবাজরা তার বিরুদ্ধে; মন্ত্রী, নেতার কর্মীর, দাপুটের চক্ষুশূল। হত্যার হুমকি। বেচারার অপরাধ দুর্নীতি দমনে। অতঃপর চাকরিচ্যুত। সৎ মানুষের জায়গা নেই।

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো, সে যে আমার জন্মভূমি। কোথায় যাচ্ছে সেই দেশ? উত্তরদাতা সুবুদ্ধির সমাজ। দেশ। তথাকথিত রাজনীতিক। তুমি আমি গৌণ।

কবি