ডলারের বাজার দুই-তিন মাস ধরেই ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে উঠেছে। ব্যাংক ও খোলাবাজার উভয় ক্ষেত্রেই চাহিদার তুলনায় ডলার পাওয়া যাচ্ছে কম। এ কারণে ব্যাংকেও এই দর ১০০ টাকার কাছাকাছি। স্পট রেটের পরিবর্তে কিছুদিনের ফরোয়ার্ড কেনাবেচা কিংবা ক্রস কারেন্সি ট্রেডের মাধ্যমে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারেও ডলার ৯৪-৯৬ টাকায় লেনদেন হচ্ছিল। অন্যদিকে প্রায় সব ব্যাংকই আন্তঃব্যাংক মুদ্রা বাজারের রেটের চেয়ে অনেক বেশি দামে গ্রাহকদের আমদানি দায় নিষ্পন্নের জন্য ডলার বিক্রি করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ৪ থেকে ৬ টাকা বেশি দামে ডলার বিক্রি করছে। কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক ১০ টাকা বেশি দামেও বিক্রি করছে বলে প্রমাণ মিলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৮৭ টাকায় ডলারের দাম ধরে রাখতে চাইলেও নিজেরা যেহেতু বেসরকারি ব্যাংককে ডলার দিতে পারছে না, তাই বর্ধিত দামে ডলার বিক্রি হচ্ছে জেনেও না জানার ভূমিকায় রয়েছে।

পত্রিকান্তরে আমরা জেনেছি, খোলাবাজারে ডলারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার ডলারের দর ১০৪ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। অবশ্য বুধবার দিনশেষে এই দাম ১০০ টাকার নিচে নেমে এসেছে। তবে এটাও জেনে রাখতে হবে, খোলাবাজারে নগদ ডলারের লেনদেন যেহেতু মোট বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ৫ শতাংশেরও কম, তাই আমাদের প্রকৃত এবং বেসরকারি পর্যায়ে বহুলাংশে ব্যবহূত লেনদেনের হারকেই মূলত বিবেচনায় নিতে হবে। আর সেই হারটি এখন ৯৬-৯৮ টাকা।

বাংলাদেশের মতো বিকাশমান দেশগুলোর প্রায় সবক'টিতেই ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার প্রায় ৫ থেকে ৫০ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটেছে। বাংলাদেশে হয়েছে সাড়ে ৩ শতাংশ। বিভিন্ন কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্যও অনেক বেড়েছে। সঙ্গে আবার কিছু দেশে রয়েছে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা বা বাজার নজরদারির দুর্বলতা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশের রপ্তানি খাতে বড় প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড ছাড়িয়েছে। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকারের চলতি হিসাবে ঘাটতি তৈরি হয়েছে ১৪ বিলিয়ন ডলার। বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। দেশের প্রবাসী রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানি প্রবৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ব্যর্থতার অবশ্য অন্যতম মূল কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি।

গত বছরের মাঝামাঝি থেকে রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় অতিরিক্ত মাত্রায় বাড়তে শুরু করে। অথচ সেই তুলনায় বাড়েনি রেমিট্যান্স প্রবাহ। এতে তৈরি হয় ডলারের সংকট। এমন পরিস্থিতিতে ছোট ব্যবসায়ীদের অনেকেই ঋণপত্র বা এলসি খুলতে পারছেন না। বিশেষ করে দেশের ছোট ও মাঝারি মানের আমদানিকারকরা ঋণপত্র খুলতে হিমশিম খাচ্ছেন।

চলতি অর্থবছরে আমাদের প্রাক্কলিত আমদানি হচ্ছে ৮৫-৯০ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে আমাদের রপ্তানি থেকে আসতে পারে ৫০ বিলিয়ন। আমদানি-রপ্তানি আয়ের মধ্যে ব্যবধান ৩৫ থেকে ৪০ বিলিয়ন। এই ৪০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আসে ২০ থেকে ২১ বিলিয়ন। অর্থাৎ মোটামুটি হিসাবে ২০-২৫ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি থাকে। আগামী মাসগুলোতে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য যদি আরও বেড়ে যায় তাহলে ঘাটতি হতে পারে ২৫-৩০ বিলিয়ন ডলার। ঘাটতি মোকাবিলায় এফডিআই বা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ থেকে আসে ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার। বিদেশি সাহায্য আসে ১ থেকে ২ বিলিয়ন ডলার। বাকিটার জোগান দিতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের।

পত্রিকান্তরে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ডলারের ক্রমাগত মূল্য বৃদ্ধিতে কার লাভ? অভিযোগ রয়েছে, আমদানির চাহিদা বৃদ্ধি ও সংকটের সুযোগ নিচ্ছে কিছু ব্যাংক। সংকটের এই সুযোগে তারা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আমদানি নিষ্পন্নে ইচ্ছামতো দর আদায় করছে। বাজার তথ্যানুযায়ী বর্তমানে আমদানি পেমেন্টের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের প্রতি ডলারের জন্য গুনতে হচ্ছে ৯৪ থেকে ৯৬ টাকা। নতুন এলসি খুলতেও নাকি বেশি দর হাঁকছে ব্যাংকগুলো। এতে ব্যাংক এমনকি এনবিআরের আয় বাড়লেও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এলসি খোলার সময় ব্যাংকগুলো ডলারের যে দর ধরে; পেমেন্টের দিনে সেই দর নিচ্ছে না। এমনকি পেমেন্টের তারিখে যে দর থাকে, সেই দরেও ডলার দিচ্ছে না। নতুন এলসি খুলতেও বেশি দর দাবি করা হচ্ছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো ডলার মজুত করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমনিতেই খোলাবাজারের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো হাত নেই। তবে ব্যাংকগুলো বেশি দামে ডলার বিক্রি করলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায়ই হস্তক্ষেপ করে থাকে। এ ছাড়া অনেকেই পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রি করে ডলার কিনেও মুনাফা করেছেন বলে অভিযোগ এসেছে। ডলারের দাম আরও বাড়বে- এই আশায় প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে অনেকেই ডলার কিনেছেন।


ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া দামে এলসি খোলা সম্ভব হচ্ছে না। আবার বিদেশে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ৯৫ টাকা দরে রেমিট্যান্স আনতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। এ কারণে এলসি খুলতে আসা ব্যবসায়ী অনেককেই ফেরত দিতে হচ্ছে। দেশের আন্তঃব্যাংক মুদ্রা বাজারে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত প্রতি ডলারের মূল্য ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা। যদিও এ দামে কোনো ব্যাংকেই ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। আগেই বলেছি, ব্যাংকগুলো বড় ব্যবসায়ী থেকে ডলারপ্রতি ৯০-৯৫ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করছে ৯৮ টাকার কাছাকাছি। ব্যাংকগুলোর অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংক যেহেতু তাদের ডলার দিতে পারছে না; আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার কিংবা এক্সপোর্ট রিটেনশন হিসাবধারীদের কাছ থেকে তাদের ৯৫-৯৬ টাকায় ডলার কিনতে হচ্ছে।

ডলারের সংকট মোকাবিলায় চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে বৈদেশিক রিজার্ভ থেকে সব মিলিয়ে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের সাড়ে ১০ মাসে, ৫৩০ কোটি (৫.৩০ বিলিয়ন) ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ব্যাংকগুলোকে ডলার সরবরাহ করা ছাড়াও বিলাসী পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত ও কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া রপ্তানি আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর মনোযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি রেমিট্যান্স বাড়ানোর ব্যাপারেও ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এর আগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী; রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধের নির্দেশ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানিতে লাগাম টানার উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি, হোম অ্যাপ্লায়েন্স হিসেবে ব্যবহূত ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীর আমদানি ঋণপত্রের নূ্যনতম নগদ মার্জিন ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় নয়, এমন পণ্যের নগদ মার্জিন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে ৫০ শতাংশ।

সবাই বলছেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে এখন ডলারের চাহিদা যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দর বেড়েছে। সংকটও তৈরি হয়েছে। যেসব ব্যাংকের রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় ভালো, তারা অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় আছে। কিন্তু যাদের রেমিট্যান্স কম, তারা এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর কাছ থেকে প্রায় ১০০ টাকায় ডলার কিনছে।

আমদানি বাড়ায় বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) রেকর্ড ২২৪ কোটি (২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর গত সপ্তাহে রিজার্ভ ৪১ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। গত জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ- প্রতি মাসেই ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে দেশে। এ হিসাবে এই রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। গত বছরের ২৪ আগস্ট এই রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। তখন ওই রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ১০ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যেত।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসছে, সংকটের সমাধান কোথায়? আমাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, প্রবাসী আয়ে ভাটা এবং খোলাবাজারে ডলারের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে কিছুদিনের জন্য হলেও ১. বাণিজ্যিক ব্যাংকের নেট ওপেন পজিশন বা ডলার ধরে রাখার ক্ষমতায় লাগাম টানতে হবে; ২. ব্যাক টু ব্যাক দায় নিষ্পন্নে প্রয়োজনের অধিক এক্সপোর্ট রিটেনশন কোটা হ্রাস করতে হবে; ৩. শুধু মার্জিন বাড়িয়ে নিরুৎসাহিত নয়, সব ধরনের বিলাসী পণ্যের আমদানি বন্ধ রাখতে হবে; ৪. রেমিট্যান্স বাড়ানোর সর্বতো উদ্যোগ নিতে হবে; ৫. কার্গিল, গ্লেনকোর, লুইড্রেফিস কিংবা ডব্লিউ অ্যান্ড ডব্লিউ গ্রেইন্সের মতো বিশ্বের বৃহৎ পণ্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাজারমূল্যে দীর্ঘকালীন পণ্য সরবরাহ চুক্তি করতে হবে; ৬. বাংলাদেশ সরকারকে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ত্বরান্বিতকরণসহ তার পণ্য বা কমোডিটি ট্রেডিং ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে; ৭. শুধু স্পট পারচেজ নয়, কমবেশি হারে ফিউচার বা পণ্যের ভবিষ্যৎ বাজারেও লেনদেনের জন্য তৈরি হতে হবে। কারণ বৃহৎ পণ্য জোগানদাররা তাদের বেশিরভাগ পণ্যই ভবিষ্যৎ চুক্তিতে বিক্রি করে দেয়। সেই সঙ্গে ডলারের সঙ্গে টাকার মূল্যমান বাজারের চাহিদা জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। অফিসিয়াল চ্যানেলে ডলার আনায় সজাগ থাকতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে মূল্যস্টম্ফীতির চাইতেও অধিক ক্ষতিকর হচ্ছে অনিশ্চয়তা এবং সঠিক ব্যাখ্যার ব্যর্থতা।

মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্নেষক