বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রান্তিক জনপদে ঘোরাঘুরি করলে নানা রকম অবকাঠামোগত, প্রাকৃতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এখন সচরাচর দেখা যায়। বহু বছর যিনি বাংলাদেশের গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলায় পা রাখেননি, তিনি যদি নতুন করে এসব জনপদে পা রাখেন, তাঁর চোখে পড়বে বিস্ময়কর সব পরিবর্তন। বিশেষত যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চল ছাড়া দেশের বিস্তীর্ণ সমতল অঞ্চলে যে কোনো জায়গায় চলাচলের জন্য পথ, সেতু, পরিবহন মিলবে সহজেই। গ্রামের মানুষ এখন আর হাঁটার ফুরসত পায় না। প্রকৃত অর্থে তার আর হাঁটার সুযোগ নেই। ঘর থেকে পা ফেললেই কাছে এসে দাঁড়াবে 'অটো' নামে ব্যাটারিনির্ভর যন্ত্রযান। অথবা বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রচালিত রিকশা। সহনীয় ব্যয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলাচল এখন 'জলবৎ তরলং' সুযোগ এনে দিয়েছে। যদিও যে কোনো উপজেলা শহরে কিংবা জেলা শহরের ডায়াবেটিক হাসপাতালে রোগীর বাড়ন্ত পরিসংখ্যান ঘাঁটলেই বোঝা যাবে, এই না হাঁটার কী খেসারত আমাদের দিতে হচ্ছে!
মোবাইল ফোন এবং তথ্যপ্রযুক্তি সত্যি সত্যিই বিরাট পরিবর্তন এনেছে গ্রামীণ জীবনের অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে। পণ্য ও সেবা পরিবহনের সুযোগ বহুধা বিস্তৃত। ভোগ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্য-সেবার বাজার এখন প্রান্তিক জনপদও ঘিরে রেখেছে প্রবলভাবে। সরকার বছরের পর বছর গ্রামীণ জনপদে নানা নামে সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্কের সংখ্যা দিনের পর দিন বাড়িয়েই চলেছে। গ্রামীণ অর্থনৈতিক জীবনও বদলে গেছে ভীষণভাবে। বিশেষ করে গ্রামের কৃষিজীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। শুধু ধান বা গম এখন আর আবাদের মূল ক্ষেত্র নয়। বৈচিত্র্যময় 'ক্যাশ ইনসেন্টিভ'ময় ফসলের আবাদ হচ্ছে ব্যাপক। সরকারের কৃষি বিভাগ তাতে প্রণোদনা দিচ্ছে। দেশের বহু প্রান্তে বাণিজ্যিকভাবে আনারস, পেয়ারা, মালটা, ড্রাগন, জামরুল, আঙুরসহ নানারকম বৈচিত্র্যময় মৌসুমি ফলের আবাদ হচ্ছে। আম, লিচু, কাঁঠাল, কতবেল, কলা, জামের আবাদেও হাইব্রিড প্রযুক্তি প্রভাব রেখেছে বিশালভাবে। মৎস্য, পশু ও প্রাণিসম্পদ প্রতিপালনেও বিপ্লব ঘটে গেছে। আমাদের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে দেশের অভ্যন্তরীণ খাত বিকশিত হয়েছে। বলা ভালো, আমাদের আবাদ সংস্কৃতিতে বাণিজ্যিক প্রবণতা দারুণভাবে মানুষকে প্রভাবিত করেছে। ফলে মানুষ 'মুনাফা'কেই মোক্ষম করেছে। 'মুনাফা' নিশ্চয় খারাপ কিছু নয়। তবে যে কোনো মূল্যে, যে কোনো কিছুর বিনিময়ে মুনাফা করার প্রবণতা জনজীবনে নানারকম নেতিবাচক প্রভাব ফেলার সুযোগও তৈরি করেছে। বিশেষ করে যথেচ্ছ সার, বিষ, কীটনাশকসহ ক্ষতিকর হরমোন ব্যবহার আমাদের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কয়েক মাস ধরে গ্রামীণ জনপদে ঘোরার ফলে একটা নতুন বিষয় চোখে পড়ল এবং সেটা একটা বড় সংকট বলেই আমার কাছে প্রতীয়মান। সেটা হলো- গ্রামীণ জনপদের ভূমির প্রকৃতি খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ভীষণভাবেই আবাদি কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে নানা কারণে। প্রথমত, আবাসনের চাহিদা বাড়ছে। এক পরিবার ভেঙে বাস্তব প্রয়োজনেই বহু পরিবারে রূপ নিচ্ছে; পরিবারগুলো যত বিকশিত হচ্ছে, ততই আবাসনের চাহিদা বাড়ছে। গ্রামের একটা বড় অংশে বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে যাঁরা একটু অনগ্রসর স্তরে আছেন তাঁদের ঘরবাড়ি হচ্ছে আনুভূমিকভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, প্রায় অপরিকল্পিতভাবে। এখনও উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামে ঘরবাড়ি বানাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ বিষয়ে কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অনুমতির দরকার হয় না। পৌরসভা সদরে হয়তো ঘরবাড়ি তৈরি করতে কখনও কখনও প্রাতিষ্ঠানিক অনুমতি নিতে হয়। যদিও সে অনুমতি দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনও খুব দুর্বল ও অপরিকল্পনায় ভরা। ফলে শুধু আবাসনের প্রয়োজনেই আবাদি জমি কমে যাচ্ছে বিপুলভাবে। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক প্রয়োজনে, নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা তৈরির আয়োজনে, বহুবিধ শিক্ষা-সামাজিক-প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বানানোর দরকারে, নতুন নতুন অফিস-প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য চাপ পড়ছে কৃষিজমির ওপর। তৃতীয়ত, ইটভাটার প্রয়োজনে মাটি দরকার। এই মাটিও আসছে কৃষি ও আবাদি জমি বিনষ্ট করেই। ইটভাটা একটা বাণিজ্যিক মুনাফানির্ভর ব্যবসা। ফলে চড়া দামেই কৃষিজমির মাটি বিক্রি হচ্ছে এ কাজে। উন্নয়নকাজ বাড়ছে বলে ইটের চাহিদা বাড়ছে। ফলে কৃষিজমির ওপর আঘাত আসছে বিপুলভাবেই। চতুর্থত, একটা নতুন প্রবণতা চোখে পড়ল টাঙ্গাইল অঞ্চলে। এই জেলার একটা বড় অংশ গড় অঞ্চল। ফলে এখানকার মাটি বেশ উর্বর ও বিশেষ গুণসম্পন্ন। এই জেলার মধুপুর, ঘাটাইল, সখীপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকার মাটি এখন বিকাশমান টাইলস ইন্ডাস্ট্রির বড় খোরাক। এই এলাকার মাটি টাইলস শিল্পের জন্য খুবই উপযোগী। ফলে এ এলাকার যে কোনো প্রান্তে ঘুরলেই দেখা যাবে মাটি খননযন্ত্র যা স্থানীয়ভাবে 'ভেকু' নামে পরিচিত। এই মাটি উচ্চ দামে বিক্রি হয়। ফলে কখনও লোভে পড়ে, কখনও উচ্চ লাভের আশায়, কখনও মধ্যস্বত্বভোগীদের ইন্ধনে জমির মালিক এই ফাঁদে পা দেন। কখনও ক্ষমতাবানরা এমনভাবে পাশের জমির মাটি কেটে নেয় যে, বাধ্য হয়ে নিজের জমি কাটার জন্য ভেকুর মুখে তুলে দিতে বাধ্য হন জমির মালিক বহু নিরীহ ব্যক্তি। মাটির ওপরের একটা বড় অংশ গভীরভাবে কেটে তুলে ফেলা হয় বলে এই জমি আবাদি কাজে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। নষ্ট হয়ে যায় এর উর্বরতাও।
গ্রামীণ জনপদে এভাবে আবাদি জমি অপরিকল্পিত উপায়ে উন্নয়নের নামে বা প্রয়োজনেই বিবিধভাবে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। বলা ভালো, এসব অপরিণামদর্শী প্রবণতা রোখার জন্য সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা নেই। এই ভবিষ্যৎবিনাশী কাজ ঠেকাতে প্রান্তিক ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে যে সমন্বয় থাকা দরকার, তার উপস্থিতি নেই। বরং ক্ষেত্রবিশেষ স্বার্থজনিত সংঘাত এ কাজকে উৎসাহিতই করে। জনপ্রতিনিধিরা স্থানীয় রাজনীতিতে নিজের প্রভাব রাখতে এসব কাজে কখনও নিজেরা জড়িয়ে যান, কখনও নিজের পক্ষের লোকদের সাহস জোগান। স্থানীয় প্রশাসন কখনও কখনও নির্দিষ্ট আইনের অভাবে, কখনও রাজনৈতিক চাপে, কখনও কৌশলের অংশ হিসেবে 'দেখেও না দেখার ভান করে।'
আবাদি ও কৃষিজমি সুরক্ষা এখন তাই বড় চ্যালেঞ্জও বটে। শুধু তাই নয়, কৃষিজমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। এই কাজে সুনির্দিষ্ট আইনি-প্রশাসনিক নির্দেশনা দরকার। জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় দরকার। মানুষের সচেতনতাও দরকার। আর দরকার সরকারের নীতিনির্ধারকদের সুদৃষ্টি। দলমত নির্বিশেষে সবার সমর্থনও দরকার। আবাদি জমি ব্যবহারের জন্য বিচ্ছিন্নভাবে সরকারের যেসব আইন-বিধি আছে, তার সমন্বয় করে একটি পরিপূর্ণ নির্দেশনা মাঠপ্রান্তে পাঠানো প্রয়োজন অবিলম্বে।
আমাদের উন্নয়ন নিশ্চয়ই দরকার, অবকাঠামোও দরকার। ইটভাটা-টাইলসও লাগবে, কিন্তু তা আমাদের সীমিত সম্পদ আবাদি জমির যথেচ্ছ বিনাশ করে নয়। সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বয়, কৃচ্ছ্র, তদারকির মাধ্যমে সব চাহিদা পূরণের লক্ষ্য সামনে রেখে আবাদি ও কৃষিজমি সুব্যবহারের একটা নীতি-নির্দেশনা তৈরির কাজটি তাই জরুরি ভিত্তিতে হাতে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
শুভ কিবরিয়া: সিনিয়র সাংবাদিক
kibria34@gmail.com