ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া হয়ে পদ্মা সেতু পেরিয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার 'এক্সপ্রেসওয়ে' ব্যবহারে টোল পুনর্নির্ধারণের যে উদ্যোগ মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যাচ্ছে, তা অনেক প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়। গত বছর মার্চ মাসে দেশের প্রথম এই 'ঝটিকাপথ' উদ্বোধন হলেও কথা ছিল, টোল চালু হবে পদ্মা সেতু চালুর দিন থেকে। দেশের বৃহত্তম ও বহুল আলোচিত ওই সেতু যে আগামী ২৫ জুন উদ্বোধন হতে যাচ্ছে, মঙ্গলবারই সেই খবর দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। আমরা জানি, সেতুর দু'পাশের এক্সপ্রেসওয়ে নিয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ গঠিত একটি কমিটি আগেই টোল নির্ধারণের কাজটি সম্পন্ন করেছিল। সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, টোল নীতিমালা-২০১৪ অনুযায়ী মাঝারি ট্রাককে ভিত্তি ধরে টোল নির্ধারণ করা হয়েছিল কিলোমিটারপ্রতি ২০ টাকা ১৮ পয়সা। কিন্তু সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ের টোল মিলে ব্যবহাকারীদের ওপর আর্থিক চাপের কথা বিবেচনা করে তা অর্ধেকেরও কম বা ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরই মধ্যে টোলের সেই হার অর্থ বিভাগেও অনুমোদিত হয়েছে। এখন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগেই টোল ফের বাড়াতে চায় কর্তৃপক্ষ। আমাদের প্রথম প্রশ্ন, আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচিত ও নিষ্পন্ন টোলের সেই হার এখন কেন বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ল? নির্ধারিত টোল চালুর আগেই পুনর্নির্ধারণের যুক্তি কী?
এভাবে একবার টোল নির্ধারণ করে কার্যকর হওয়ার আগেই বাড়ানোর প্রস্তাব আমাদের সামনে দ্বিতীয় প্রশ্নটি দাঁড় করিয়ে দেয়- যথেষ্ট আলাপ-আলোচনা ও চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই কি টোল নির্ধারণ করা হয়েছিল? একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এমন 'অস্থিরতা' কেন? বস্তুত, এক্সপ্রেসওয়ের টোল নিয়ে সংশ্নিষ্টদের প্রস্তুতিহীনতার প্রমাণ এটাও যে- সেতু উদ্বোধনের মাত্র এক মাস বাকি থাকলেও এখন পর্যন্ত টোলপ্লাজা নির্মাণ করা হয়নি। টোল নির্ধারণ কমিটির একটি সূত্র যদিও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নির্ধারিত সময়ে তুলে আনতেই এখন 'ছাড় না দিয়ে' টোল পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন, এই যুক্তি আমাদের কাছে খোঁড়াই বিবেচিত হয়। নীতিমালার চেয়ে কম টোল নির্ধারণ করলে আইনি প্রশ্ন ওঠার বিষয়টিও অবান্তরই মনে হয়। মূল বিষয় যেহেতু নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলে আনা; টোল আদায়ের সময়সীমা বাড়িয়ে দিলে ক্ষতি কী? সমকালেই প্রকাশিত অপর এক প্রতিবেদনে আমরা দেখেছিলাম যে- এক্সপ্রেসওয়েতে পৌঁছার জন্য রাজধানী ঘিরে যে প্রায় ৮৯ কিলোমিটার চার লেন মহাসড়ক নির্মাণ করতে হবে, তার প্রস্তুতি এখনও প্রাথমিক পর্যায় অতিক্রম করেনি। এতে যেমন ঢাকা-উত্তরবঙ্গ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ব্যবহারকারীদের, তেমনই ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ব্যবহারকারীদের দক্ষিণবঙ্গ যাওয়া-আসা করতে হবে ঢাকা নগরীর ভেতর দিয়ে। এমনিতেই যানজটে জেরবার রাজধানীর সড়ক পরিস্থিতির অবনতি তো ঘটবেই, খোদ এক্সপ্রেসওয়েতে প্রবেশেও সৃষ্টি হতে পারে ব্যাপক যানজট ও জনদুর্ভোগ। এর মধ্যে টোল হার পুনর্নির্ধারণ নিয়ে তোড়জোড় ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়া ছাড়া আর কী? জানা যাচ্ছে, এক্সপ্রেসওয়ের টোল হার পর্যালোচনা ও পুনর্নির্ধারণের জন্য মঙ্গলবার একটি সভা হওয়ার কথা থাকলেও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিদায়ী ও আসন্ন সচিবের দায়িত্ব হস্তান্তরকাল বিবেচনায় তা স্থগিত করা হয়েছে। আমরা দেখতে চাইব, টোল পুনর্নির্ধারণের বদলে বরং বিদ্যমান হার বাস্তবায়নেই মনোযোগ দেবে সংশ্নিষ্টরা।
অস্বীকার করা যাবে না যে, যেসব মহাসড়ক চার লেনে বা এক্সপ্রেসওয়েতে উন্নীত হয়েছে, সেগুলোতে টোল আদায়ের সরকারের নীতিগত প্রস্তুতি পুরোনো। একসময় সড়ক ও সেতুমাত্রই বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য হলেও এখন প্রায় সব বৃহৎ সেতুতে রয়েছে টোল ব্যবস্থা। রাজধানীর প্রথম উড়াল সড়ক উন্মুক্ত হলেও পরবর্তীগুলো এসেছে টোলের আওতায়। এমনকি চট্টগ্রাম বন্দর সড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের একাংশ এবং ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের চলনবিল অংশে কয়েক বছর ধরেই টোল আদায় করা হচ্ছে। পদ্মা সেতুর দুই পাশের এক্সপ্রেসওয়ে এ ব্যবস্থারই নবতর সংযোজন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পদ্মা সেতুর টোল হারের উচ্চতা নিয়ে এরই মধ্যে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। তার ওপর যদি এক্সপ্রেসওয়েতেও উচ্চ হার পুনর্নির্ধারণ করা হয়, তাহলে অবকাঠামোগত উৎকর্ষ নিয়ে ব্যবহারকারীদের উৎসাহ ও উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়তে বাধ্য। বাংলা প্রবাদে রয়েছে- আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারী। আলোচ্য এক্সপ্রেসওয়ের ক্ষেত্রে গুণের বদলে দামের বিষয়টিই কি প্রাধান্য পেয়ে যাবে?

বিষয় : এক্সপ্রেসওয়ের টোল পুনর্নির্ধারণ

মন্তব্য করুন