আসন্ন বাজেটে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর সরকার কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বলে বুধবার সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে যেমনটা বলা হয়েছে, মোবাইলে কথা বলা ও খুদেবার্তা পাঠানোর বদলে মানুষ এখন বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে কথা বলছে, তাই এ খাতে অর্জিত সরকারের রাজস্ব কমে গেছে। এ অবস্থায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিমাণ ইন্টারনেট কিনবে তার ওপর ভিত্তি করে সংশ্নিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে বাড়তি ট্যারিফ নেওয়ার কথা ভাবছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের কাছ থেকেও ভ্যাট সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়েছে এনবিআর। দেশে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইন্টারনেট কেনে মূলত আইআইজি বা ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে নামক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। আইআইজি তা সংগ্রহ করে থাকে সাবমেরিন কেবল কোম্পানি থেকে। তাছাড়া কিছু ইন্টারন্যাশনাল টেরেসট্রিয়াল কেবল কোম্পানি আছে, যারা বিদেশ থেকে ইন্টারনেট আমদানি করে বিভিন্ন পর্যায়ে সরবরাহ করে। এখন সরকার যদি কোম্পানি পর্যায়ে ইন্টারনেট কেনাবেচার ওপর বাড়তি কর আরোপ করে, আর তা যদি অন্য সব ব্যবসার মতো শেষমেশ গ্রাহকের ঘাড়ে চাপে, তাহলে আমরা সরকারের ওই পরিকল্পনায় উদ্বিগ্ন না হয়ে পারি না। আমাদের উদ্বেগটা আরও বেড়ে যায় যখন সরকার এর পাশাপাশি সরাসরি গ্রাহকের ওপর নতুন করে ভ্যাট আরোপের কথা ভাবে। বলা বাহুল্য, বর্তমানে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সরবরাহ করা ইন্টারনেটের ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দেয়। তাছাড়া কোম্পানিগুলোকে ৩৫ শতাংশ করপোরেট কর দিতে হয়। এ পুরো খরচটাই কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে তুলে নেয়।
আমাদের উদ্বেগের কারণটা হলো, সরকার ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর বাড়তি বা নতুন কর এমন এক সময়ে চাপাতে যাচ্ছে, যখন দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার দাপটে সাধারণ মানুষ প্রায় দিশেহারা। একদিকে সীমিত আয়ের মানুষদের প্রকৃত আয় কমে গেছে, অন্যদিকে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত খরচসহ সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় অত্যধিক বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় বাড়তি ইন্টারনেট বিল চাপানো হলে তা ওই মানুষগুলোর কাছে গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো মনে হবে। প্রসঙ্গত, দেশের টেলিকম সেক্টরের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির দেওয়া তথ্যমতে, গত এপ্রিল পর্যন্ত আইএসপি ও পিএসটিএন- যারা ব্রডব্যান্ড, ডিএসএল ও কেবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে তাদের গ্রাহক সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১০ লাখের মতো। এদের সঙ্গে যদি বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির কাছ থেকে ইন্টারনেট সেবাগ্রহণকারীকে যোগ করা হয়- যাদের সংখ্যা সরকারি বিভিন্ন তথ্যমতে ৫ কোটির কম নয়, তাহলে ওই ইন্টারনেটের মূল্যবৃদ্ধির চাপ জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশকে বইতে হবে তা হলফ করে বলা যায়। সমস্যা আরও আছে। তাহলো, বিটিআরসি গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট প্যাকেজের দর ঠিক করে দিলেও কোম্পানিগুলো কত টাকা নিয়ে কতটুকু সেবা দিচ্ছে, তা নজরদারি করার কোনো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নেই। ফলে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহক প্রতারণার অনেক অভিযোগ থাকলেও তার কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। এ অবস্থায় ইন্টারনেট বিল বৃদ্ধি পেলে গ্রাহকরা বাড়তি দুর্ভোগ ও হয়নানির শিকার হবেন।
গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট খরচ বৃদ্ধি নিয়ে আমাদের উদ্বেগের আরেকটা কারণ হলো, তা বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কর্মসূচির আওতায় সরকার ইতোমধ্যে যেসব অবকাঠামোগত ও প্রণোদনামূলক কার্যক্রম করেছে, তারই ফল হিসেবে গত এক দশকে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এমনকি গ্রাম পর্যায়েও এ সেবা চলে গেছে, যার ফলে একদিকে বিদেশ এখন গ্রামবাসীর কাছে আঙিনায় পরিণত হয়েছে, আরেক দিকে গ্রামীণ অর্থনীতি দারুণ গতি পেয়েছে। ইন্টারনেটের এ প্রসারের কারণেই আমরা লাখ লাখ তরুণ-তরুণীকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে নিজের বেকারত্ব ঘুচানোর পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতিতে অবদান রাখতে দেখছি। ইদানীং এমনকি গ্রাম-শহরের বহু গৃহিণী যে নানা ধরনের অনলাইন বাণিজ্যে যুক্ত হয়েছেন তা-ও এ ডিজিটাইজেশনেরই ফল। আমরা স্বীকার করি, বাড়তি রাজস্ব সরকারের দরকার, তবে তা করতে গিয়ে কোনোভাবেই ডিজিটাইজেশনকে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর বাড়তি কর চাপানোর বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি আমরা আহ্বান জানাই।