এক সময়ের অবহেলিত উত্তরাঞ্চলের মানুষকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে ১৯৫৩ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ সময় পর ২০০৮ সালের ৫ জুন ৩০ একর জায়গার ওপর পাবনা শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্বে ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের পাশে রাজাপুর নামক স্থানে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে।

আজ ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। শুরুতে ৩টি অনুষদের অধীনে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই, ইইই, গণিত এবং ব্যবসায় প্রশাসন- এই চারটি বিভাগ। ১৮০ জন শিক্ষার্থী, ১২ জন শিক্ষক এবং ৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে।

৫টি অনুষদের অধীনে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২১টি বিভাগ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিভাগগুলো বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, ফার্মাসি, রসায়ন ও পরিসংখ্যান; প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের অধীনে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, স্থাপত্য এবং নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা; ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে ব্যবসায় প্রশাসন এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজম্যান্ট; মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে অর্থনীতি, বাংলা, ইংরেজি, সমাজকর্ম, লোকপ্রশাসন, ইতিহাস ও বাংলাদেশ স্টাডিজ এবং জীব ও ভূ-বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ। বর্তমানে ১৭৭ জন শিক্ষক, ১০৫ জন কর্মকর্তা এবং ১৯৪ জন কর্মচারী এখানে কর্মরত। প্রতিষ্ঠানটি নবীন হলেও এখানকার এক দল তরুণ শিক্ষক মেধা, প্রজ্ঞা, শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক কার্যক্রম, পাঠদান পদ্ধতি আর নিরলস চেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী শিক্ষা দিতে পারছেন। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা অ্যালপার ডগার (এডি) সায়েন্টিফিক ইনডেক্স র‌্যাঙ্কিংয়ে ২০২২-এ বিশ্বসেরা গবেষকের তালিকায় স্থান পেয়েছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬ জন গবেষক। তাঁদের মধ্যে ২৫ জন শিক্ষক এবং একজন শিক্ষার্থী। বেশকিছু ক্ষেত্রে সুযোগের স্বল্পতা থাকলেও এই স্বল্প সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজুড়ে ৪৮০ কোটি টাকার অধিকতর দ্বিতীয় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ১২ তলা দুটি একাডেমিক ভবন, ১০ তলাবিশিষ্ট একটি শেখ রাসেল ছাত্র হল এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ছাত্রী হল, ১০ তলাবিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন, ৪ তলা কনভেনশন সেন্টার, ৪ তলা টিএসসি ও গেস্ট হাউস ভবন, একটি অ্যাম্পিথিয়েটার, একটি পুলিশ ফাঁড়ি, আনসার ক্যাম্প, একটি বিদ্যুৎ সাবস্টেশন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি মন্দির, প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণে বিশ্ববিদ্যালয় গেটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ইতোমধ্যে কিছু স্থাপনার নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং কিছু কাজ সমাপ্তির পথে। ইতোমধ্যে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বরাদ্দ পেয়েছে ৪৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থই পাবনার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। ফলে পাবনার অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটছে। শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, যোগাযোগসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এখানকার মানুষ স্বপ্ন দেখছে এবং তাকে বাস্তবে রূপদান করতে পারছে। বিশেষ করে এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা তাদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে সহজে বাস্তবায়ন করতে পারছে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষামূলক কাজও করে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানবিক, জেলাভিত্তিক, বিভাগ ভিত্তিকসহ বিভিন্ন সংগঠন তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে- সাংস্কৃতিক সংগঠন অনিরুদ্ধ নাট্যদল, আবৃত্তি সংগঠন কণ্ঠস্বর, আবৃত্তি দল, ব্যান্ড বা গানের দল ডিসটিউন, কাব্য, বিতর্ক সংগঠন পাস্ট ডিবেটিং সোসাইটি, পাস্ট ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, পাস্ট ফিল্ম সোসাইটি, বিজ্ঞান সংগঠন সায়েন্টেরিয়া, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট বিষয়ক সংগঠন ইয়ুথ অ্যালায়েন্স সলভার গ্রিন, ফার্মা ক্যারিয়ার ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবী বা সেবামূলক সংগঠন জোনাকী, নতুন সূর্যোদয়, আগামীর সূর্য, হেল্প, বন্ধু এবং রোভার স্কাউটস গ্রুপ।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা, আন্তরিকতা এবং শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি দিন দিন অগ্রগতি ও উন্নতি সাধন করছে।

মো. বাবুল হোসেন: জনসংযোগ কর্মকর্তা, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়