ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির ঊর্ধ্বতন দুই নেতা- জাতীয় মুখপাত্র নূপুর শর্মা ও বিজেপির দিল্লির গণমাধ্যমপ্রধান নবীন কুমার জিন্দালের নবী মোহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে মর্যাদাহানিকর মন্তব্যের পর কিছুদিন ধরে দলটি এক ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝড় মোকাবিলা করছে। গত শুক্রবার উত্তরপ্রদেশের কানপুরের মুসলমানরা রাস্তায় নেমে এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। তবে বিদ্বেষবিরোধী আইনে মন্তব্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে প্রশাসন কোথাও কোথাও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে!

আমরা দেখেছি, প্রতিবাদ এরই মধ্যে ভারতের বাইরে চলে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো দাপ্তরিকভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিছু আরব দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় পণ্য বয়কটের ঘোষণা হয়েছে এবং কুয়েতের কিছু দোকান থেকে ভারতীয় পণ্য নামিয়েও ফেলা হয়েছে। কূটনৈতিক প্রতিবাদের পরই ভারত সরকার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। নূপুর শর্মাকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং নবীন কুমার জিন্দালকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলটি একটি সাধারণ বিবৃতি দিয়ে বলেছে, 'বিজেপি যে কোনো ধর্মের যে কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের অপমানের কঠোর নিন্দা জানায়।'

তবে নবীকে (সা.) যারা অপমান করেছে, তাদের 'বরখাস্ত কিংবা বহিস্কার' এবং তাদের মন্তব্য থেকে নিজেদের দূরে রাখার সরকারি চেষ্টা ভারতের ভিতরে কিংবা বাইরের প্রতিবাদকারীদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি এবং এর কারণও অজানা নয়। প্রথমত, নূপুর শর্মা কিংবা জিন্দালকে দলের মধ্যে 'বিচ্ছিন্ন বিষয়' হিসেবে তুলে ধরার অবকাশ নেই। কারণ তাঁরা উভয়েই দলের উচ্চ পর্যায়ের পদে ছিলেন। যে পদে থেকে তাঁরা দলের নীতিনির্ধারণী বিষয়ে কথা বলতে পারতেন। একই সঙ্গে দলটির নীতি ও কৌশল নিয়ে জাতির সঙ্গে তাঁরা যোগাযোগ রক্ষা করতেন। দ্বিতীয়ত এবং খুব সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁদের ইসলামবিদ্বেষ ভারত সরকারকে প্রতিনিধিত্ব করে না- এটা বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ এ বিষয়ে বিজেপির কোনো নেতাই ক্ষমাপ্রার্থনা করেননি। বিজেপির ইসলামবিদ্বেষ নীতির বহু প্রমাণ রয়েছে। এজন্য খুব একটা পেছনে যাওয়া লাগবে না। বিজেপির নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জনসমক্ষে দেওয়া তাঁর দুটি বক্তৃতায় ভারতের অতীত এবং বর্তমানের 'সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামির' জন্য মুসলিম ব্যক্তিবর্গকে জড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।

উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির যোগী আদিত্যনাথও গত রাজ্যসভা নির্বাচনে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়েছিলেন। এক বক্তৃতায় তিনি মুসলিমদের উপহাস করে বলেছিলেন, তিনি রাজ্যের নির্বাচনকে ৮০ শতাংশ (রাজ্যে হিন্দুদের সংখ্যা) ও ২০ শতাংশের (রাজ্যে মুসলিম সংখ্যা) মধ্যে যুদ্ধ হিসেবে দেখেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির হিমান্ত বিশ্ব শর্মা আরেক কাঠি সরেস। গত বছর আসামে জোরপূর্বক সংখ্যালঘু মুসলিম উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশের গুলিতে দুই মুসলমানের প্রাণহানির ঘটনাকে তিনি আগের হিন্দুদের মৃত্যুর 'প্রতিশোধ' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিজেপির শাসনামলে দেশজুড়ে বহু মসজিদ কিংবা মুসলমানদের কাছে পবিত্র স্থান, হিন্দুরা নিজেদের বলে দাবি করেছে এবং সেগুলো হিন্দুদের কাছে হস্তান্তরের কয়েকটি কর্মসূচি চালু করেছে বিজেপি।

বিজেপির নেতারা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য ইসলামবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক আইন পাস করেছেন। সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট বা সিএএ এমনই এক বৈষম্যমূলক আইন। বিজেপি সরকার কেবল মুসলিমবিদ্বেষী এই আইন পাসই করেনি, একই সঙ্গে আইনটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী ভারতীয় মুসলিমদের 'টার্গেট' করতে বিজেপি তার কর্মীদের অনুমতিও দিয়েছে। ফলে নানা সহিংসতায় হাজারো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

এসব বিবেচনায় এটা স্পষ্ট, বিজেপি সরকার নূপুর শর্মাদের বক্তব্য তাদের নিজস্ব মন্তব্য বললেও তা কপটতাপূর্ণ। বস্তুত তাদের বক্তব্য মুসলিম ও ইসলামের প্রতি বিজেপির দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশ ঘটেছে। সৌদি আরবভিত্তিক মুসলমানদের সংগঠন ওআইসির বিবৃতিতে সে বাস্তবতাই উঠে এসেছে। ওআইসি কেবল বিজেপির দুই দায়িত্বশীলের বক্তব্যেরই নিন্দা জানায়নি; একই সঙ্গে বলেছে, ভারতে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার ঘটনা বাড়ছে।

ভারত সরকার কঠোরভাবে ওআইসির বিবৃতির প্রতিবাদ করেছে। কারণ সে বিবৃতিতে এটা তুলে ধরা হয়েছে যে, বিজেপির শাসনামলে ভারত ইসলামবিদ্বেষী দেশে পরিণত হচ্ছে; যেখানে মুসলমানদের আক্রমণ ও অপমান সাধারণ ঘটনা। এখন বিশ্ব যেহেতু ভারতের সাম্প্রতিক ইসলামবিদ্বেষী আচরণের প্রতিবাদ জানাচ্ছে সেহেতু এটা মাথায় রাখতে হবে, বিজেপি যেটা বলছে ওই মন্তব্য তাদের ব্যক্তিগত। এখানে সরকারি দলের মতের প্রতিফলন ঘটেনি, তা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।

অপূর্বানন্দ: দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি বিষয়ের শিক্ষক; আলজাজিরা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক