এক কঠিন সময়ে দেওয়া হয়েছে সামনের অর্থবছরের বাজেট। করোনা মহামারির কারণে সরবরাহ চেইন নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ইউক্রেন-রুশ যুদ্ধ। গম, ভোজ্যতেল, সার, জ্বালানি তেল ও গ্যাস সরবরাহে দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। জাহাজ পরিবহন খরচ বেড়েছে চার-পাঁচ গুণ। এসবের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব মূল্যস্ম্ফীতির ওপর। এমনিতেই করোনা সংকট মোকাবিলায় অস্বাভাবিক প্রণোদনার ফলে বাজার তারল্যে সয়লাব হয়ে ছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হলো জোগান ঘাটতি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে মূল্যস্ম্ফীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে। এ জন্য এসব দেশে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি চালু করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বেসিক সুদের হার বাড়িয়ে চলেছে। মানুষের হাতে পণ্য কেনার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব আমাদের মতো দেশের রপ্তানির ওপর পড়তে বাধ্য। ওসব দেশ থেকে আমদানি করা পণ্য ও সেবার দাম তো বাড়ছেই। তাই আমাদের মতো দেশেও বাড়ছে আমদানীকৃত মূল্যস্ম্ফীতি। এমন প্রেক্ষাপটেই পেশ করা হয়েছে বাংলাদেশের বাজেট। তাই বিশ্ব বাস্তবতার কথা মাথায় রেখেই এর পর্যালোচনা কাম্য।
বাজেট প্রস্তাবনাটি দেখে মনে হচ্ছে, আমাদের বাজেট প্রণেতারা সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ যথার্থভাবে চিহ্নিত করে এগুলোর বিষয়ে সচেতন থেকেই বাজেট প্রস্তুত করেছেন। এ সংবেদনশীলতার বড় উদাহরণ হতে পারে জ্বালানি, সার ইত্যাদি বাবদ ভর্তুকি ও প্রণোদনায় বরাদ্দ বৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরে জিডিপির শতাংশ হিসাবে ভর্তুকি ও প্রণোদনা ১ দশমিক ৭ শতাংশ। আসছে বছরে হচ্ছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ বিদ্যমান বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে জিডিপির শতাংশ হিসাবে চলতি বছর থেকে আসছে বছরে বাজেটের আকার ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা দুটিই কমাতে হয়েছে। এর মধ্যেও ভর্তুকি ও প্রণোদনার অনুপাত বৃদ্ধিকে স্বাগত জানাতেই হবে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ অনুপাত প্রয়োজনবোধে আরও বাড়তে পারে। তা সত্ত্বেও আসন্ন অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা মাথায় রেখে কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোরও সুযোগ রয়েছে। যেমন অনুন্নয়ন বা পরিচালন ব্যয় প্রস্তাবিত বাজেটে ৪ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এটি জিডিপির ৯ শতাংশ। তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ খাতে বা উপখাতে মূলধন ব্যয় কমিয়ে এ অনুপাত কমানো যেত।
সার্বিক বাজেট পর্যালোচনা করে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দেওয়া যেতে পারে। বাজেট চূড়ান্ত করার আগে আইনপ্রণেতাদের এগুলো বিবেচনায় নিয়ে সংসদে আলাপ করলে বাজেটকে সংশোধন করে আরও জনবান্ধব করার সুযোগ রয়েছে। প্রস্তাবনাগুলো এমন হতে পারে :
১. আমাদের বাজেট ঘাটতি আরও ১ শতাংশ বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ করা যায়। তাতে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া যাবে সামাজিক খাতগুলোতে। তবে উচ্চ সুদে বাণিজ্যিক ঋণ না নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিতে হবে।
২. সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ মোট বাজেটের ১৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার কথা ভাবা যায়। বাড়তি বরাদ্দ দিয়ে কাভারেজ ও সহায়তা দুটিই বাড়াতে হবে। অগ্রাধিকার দিতে হবে নগরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষকে।
৩. স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭-৮ শতাংশ করা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উপখাতে এ বাড়তি বরাদ্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দিতে হবে।
৪. কৃষি ভর্তুকি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়িয়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি করা হয়েছে। তবে সাম্প্র্রতিক বছরগুলোর গড় ভর্তুকির চেয়ে অন্তত দুই গুণ বরাদ্দ অর্থাৎ অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা কৃষি ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ দেওয়া গেলে তা একই সঙ্গে কৃষির বিকাশ, খাদ্য আমদানি হ্রাস; সর্বোপরি অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধিতে বিশেষ সহায়ক হবে।
৫. চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকায় আম নিয়ে আসার জন্য যে 'ম্যাঙ্গো ট্রেন' রয়েছে তার আদলে অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণেও সহায়তার জন্য 'কৃষি ট্রেন' নাম দিয়ে নতুন উদ্যোগ নেওয়া যায়। একই সঙ্গে অনলাইনে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের বিদ্যমান প্ল্যাটফর্ম ও নতুন স্টার্টআপগুলোর জন্য প্রণোদনার কথা ভাবা দরকার।
৬. মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডারদের মধ্যে ইন্টার-অপারেবিলিটি নিশ্চিত করা হচ্ছে। এমএফএস ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল সল্যুশনগুলো ব্যবহার করে আরও সহজে দেশে রেমিট্যান্স নিয়ে আসার নতুন উদ্যোগের কথা ভাবা যায়।
৭. আমদানি ব্যয় কমাতে পারলে বহিঃঅর্থনীতিতে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলা করা সহজ হয়। দেশীয় কোম্পানি জাহাজ তৈরি করলে বা কিনে এনে তা দিয়ে আমদানি-রপ্তানির কাজ করা গেলে বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। তবে বছরে বেঁচে যাবে ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাজেটে এ খাতে কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এখন দরকার এ জন্য নতুন তহবিলের। বাংলাদেশ ব্যাংক এ জন্য যে রিফাইন্যান্স তহবিল গঠন করেছে, তার আকার ও ব্যাপ্তি বাড়ানো যেতে পারে।
৮. ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বাবদ নাগরিকদের ব্যয় বৃদ্ধির যে সম্ভাবনা কর প্রস্তাবের কারণে তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবা দরকার।
৯. পাচার করা অর্থ সামান্য করারোপ করে ফেরত আনার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা নৈতিকতা ও বাস্তবতার নিরিখে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক দেশে এবং আমাদের দেশেও এমন সুযোগ আগে দেওয়া হয়েছিল। ফলাফল ভালো হয়নি। উল্টো সরকারের গায়ে কালি লেগেছে। সামাজিক পুঁজির ক্ষয় হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হবে। এগমন্ড গ্রুপের সদস্য আমরা। এপিজি গ্রুপের প্রভাবশালী সদস্য আমরা। এসব ফোরামে অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ শক্তিশালী। এসব ফোরামে বাংলাদেশকে কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে। তাই এ প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
১০. পদ্মা সেতু চালু হলে গোটা অর্থনীতিই নতুন গতি পাবে। দক্ষিণাঞ্চলের কানেকটিভিটির যে নাটকীয় উন্নতি হবে তার সর্বোচ্চ সুফল ঘরে তোলার চেষ্টা করতে হবে। এ জন্য ওই অঞ্চলে বিনিয়োগে বাড়তি প্রণোদনা দেওয়ার কথা ভাবা যায়। বিভিন্ন স্টার্টআপ তহবিলের একটি অংশ ওই অঞ্চলের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা উচিত।
১১. বাণিজ্য ঘাটতি এখন ২৭ বিলিয়ন ডলার। চলতি হিসাবেও ঘাটতি ১৪ বিলিয়ন ডলার। তাই বৈদেশিক মুদ্রাবাজার এতটা অস্থির। টাকার মান কমছে। এর ভালোমন্দ দুই ধরনের প্রভাবই পড়ছে। এদিকে বাজেটে আরও নজর দিতে হবে। মুদ্রা বিনিময় হারের মতো সুদের হারকেও নমনীয় না করলে বহিঃঅর্থনীতির অস্থিরতা কাটবে বলে মনে হয় না। তাই সুদের হারকে সীমিত আকারে হলেও বাজারমুখী করা দরকার।
সব শেষে বলব, বাজেটটি সবেমাত্র পেশ হয়েছে। সংসদে ও সংসদের বাইরে নানা আলাপ হবে। নতুন নতুন প্রস্তাব আসবে। এসব প্রস্তাব সমন্বয় করে দিনের শেষে বাজেটটি ঢেলে সাজালে এর বাস্তবায়ন যেমন সহজতর হবে; জনমনে তেমনি বেশ খানিকটা স্বস্তিও আসবে।
আতিউর রহমান :ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর