করোনা মহামারির মধ্যে (২০ জুন ২০২০) শারীরিকভাবে বিদায় নিয়েছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ কামাল লোহানী। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লক্ষ্যে অবিচল থেকে তিনি মানবমুক্তির সংগ্রামে লড়াই চালিয়ে গেছেন। তিনি বাংলার মানুষের অধিকার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পূর্বপুরুষদের সংগ্রামের উত্তরাধিকারকে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে আমৃত্যু লড়ে গেছেন।

লোহানী ভাইয়ের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় দুই দশকের অধিক সময় হলেও তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে ২০১১ সালের ১৭ জুন; তাঁকে আহ্বায়ক করে 'বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা জাতীয় কমিটি' গঠনের পর। এর পর ২০১২ সালে উদীচীর সভাপতি হলে তাঁর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছি। এ সময়ে দেখেছি কত সহজে তিনি মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন! তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বেশ কিছু লেখা লিখেই আমার কাছে পাঠিয়ে দিতেন কম্পোজ করার জন্য। কারণ শেষের দিকে চোখে খুব কম দেখতেন। এ সময়ের লেখাগুলো সবাই পাঠোদ্ধার করতে পারত না। চোখে ভালো না দেখতে পেলেও মানুষের জন্য কিছু করার যে আকাঙ্ক্ষা, তা থেকেই মনের দৃষ্টি মেলে তিনি লিখতেন।

লোহানী ভাই জনগণে বিশ্বাস করতেন। তিনি মনে করতেন, গণশক্তির প্রবল জোয়ারের কাছে কোনো শক্তিই টিকতে পারে না, যা তিনি তাঁর লেখনীর মধ্যেও প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, গণশক্তির সেই প্রবল জোয়ার সৃষ্টি করতে হলে তাঁর চেতনাকে শানিত করে তুলতে হয়। আর সেটা পারে সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন।

কামাল লোহানীর অনেক পরিচয়। তিনি রাজনীতি-সংস্কৃতি-সাংবাদিকতাসহ মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ অসংখ্য কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম ক্ষেত্র সংস্কৃতি। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনীতির পাঠ শুরু হয়। তারপর ক্রমান্বয়ে সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করেছেন দৈনিক সংবাদ, দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক বার্তা, দৈনিক জনপদ, দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক আজাদসহ বিভিন্ন পত্রিকায়। তিনি সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সম্পৃক্ত হয়ে সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম সম্পাদক, সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কামাল লোহানী পিআইবি, বেতারের ট্রান্সক্রিপশন পরিচালক ছিলেন। সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে তিনি দুই মেয়াদে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া ছায়ানটের প্রথম সাধারণ সম্পাদক নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়লে তিনি তাঁর হাল ধরেন। ১৯৬৭ সালে কামাল লোহানী এবং হাসান পারভেজ মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী। ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পটভূমি রচনায় অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে। ১৯৭১ সালে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৫ মে মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। এর অন্যতম সংগঠক ও বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বেতারে তাঁর ভরাট কণ্ঠেই দেশবাসী প্রথম বিজয়ের খবর জানতে পারে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিষ্ঠিত হয় গণশিল্পী সংস্থা। তিনি এর প্রতিষ্ঠা ও বিস্তৃতি ঘটাতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘদিন সে সংগঠনে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

দুর্দান্ত সাহসী ও দৃঢ়চেতা এ মানুষটি ২০১২ থেকে '১৬ সাল পর্যন্ত উদীচীর সভাপতি ছিলেন। যুক্ত থেকেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে। তাঁর নেতৃত্বে ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা গণজাগরণ আন্দোলনে সামনে থেকে লড়াই করেছে উদীচী।

তিনি সত্য বলতে কখনও দ্বিধা করতেন না এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ- এর জন্য সব সময় সোচ্চার থেকেছেন। তিনি চলে গেলেও আমি বিশ্বাস করি, তাঁর রেখে যাওয়া কাজ অনন্তকাল আমাদের শক্তি ও সাহস জোগাবে। তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরভাস্মর হয়ে। তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা।

অমিত রঞ্জন দে: সাধারণ সম্পাদক, উদীচী