পদ্মা সেতু বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মহিরুহ প্রকল্প। প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল উপকারভোগী জনগোষ্ঠীর জন্য এত বড় কোনো প্রকল্প এর আগে দেশে বাস্তবায়িত হয়নি। সেই সঙ্গে প্রকল্পটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের একটি স্বপ্নের বাস্তবায়নও বটে! পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষের সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতির সম্পৃক্ততার একটি সোপান হিসেবেও বিবেচিত আমাদের কাছে। আজ পদ্মা সেতু উদ্বোধন লগ্নে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করি এই প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন, প্রকল্পের প্রাথমিক সম্পদ সঞ্চালন, বিশেষ করে এই প্রকল্পের প্রকৌশল পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলী, যে সব সরকারি কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন তাঁদের এবং বিশেষ করে কভিডে প্রয়াত বুয়েটের অত্যন্ত স্বনামধন্য অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে, সেই সঙ্গে নদীশাসন প্রকল্পের সম্মুখ সারিতে যিনি জড়িত ছিলেন, সেই অধ্যাপক আইনুন নিশাতকেও। এছাড়াও সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং সেতু বিভাগের অনেক প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিশেষ করে প্রকল্পের পরিচালক, যিনি অনেক দেশপ্রেম, আকাঙ্ক্ষা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে আজকের পদ্মা সেতুর যে অবস্থা তা বাস্তবায়ন করেছেন। সেই সঙ্গে অবশ্যই সরকারে যে দলটি রয়েছে, বিশেষ করে সরকারপ্রধানের একটি অভিপ্সা কিংবা শক্তিশালী আকাঙ্ক্ষা, যে কোনো মূল্যে তাঁদের রাজনৈতিক একটি অভীপ্সা ছিল, প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি ছিল যে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করতে হবে।
পদ্মা সেতুর সামাজিক প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত ত্রিশ-চল্লিশ বছরে বাংলাদেশ ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। ফলে ঢাকা আর চাপ সইতে পারছে না। গ্রামের প্রচুর দরিদ্র মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। যদিও এখন জনশুমারি চলছে, এর মাধ্যমে হয়তো সঠিক পরিসংখ্যান জানা যাবে। তবু বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি ছাড়িয়ে গেছে। আগেই বলেছি, এত জনসংখ্যার ভার ঢাকা নিতে পারছে না। আমরা প্রায়ই দেখি, ঈদে গ্রামমুখী যে জনস্রোত; তাতে প্রায় এক কোটি লোক ঢাকা ছেড়ে চলে যায়। তখন ঢাকাকে কিছুটা স্বাভাবিক মনে হয়। এখন আমাদের বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে, যেটি আমাদের পরিকল্পনাবিদদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। কেবল ঢাকাই নয়, অন্যান্য প্রধান নগরগুলোও জনসংখ্যার ভার বইতে পারছে না। সন্তানের লেখাপড়ার জন্য, চাকরির জন্য, ব্যবসা, চিকিৎসা ও সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের পরীক্ষার জন্য সবাইকে ঢাকা আসতে হচ্ছে। আমরা আশির দশকে বিকেন্দ্রীকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ; সেটি আমরা এখনও করতে পারিনি। এর বাস্তবায়নে পদ্মা সেতু প্রচ ভাবে সহায়তা করবে বলে আমি মনে করি। বরিশালে আমি একটি স্বনামধন্য ও বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে চিনি, যারা অত্যন্ত সুন্দর অবকাঠামো দাঁড় করিয়েছে। ঢাকা থেকে তারা মাওয়া ঘাট হয়ে কেমিস্ট, ড্রাগিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের নিজেদের স্পিডবোটে নিয়ে যেত। শুধু তাই নয়, বিদেশিদের হেলিকপ্টারেও নিয়ে যেত তারা। কিন্তু চাকরিতে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পর তাঁরা চাকরি ছেড়ে দিতেন। থাকতে চাইতেন না। অথচ প্রতিষ্ঠানটি সেখানে কেমিস্ট, ড্রাগিস্ট, ফার্মাসিস্টসহ ম্যানেজারিয়াল কমিউনিটির সন্তানদের জন্য খুব সুন্দর ও উঁচুমানের স্কুলও প্রতিষ্ঠা করেছেন। তবু তারা মেধাবীদের আকর্ষণ করতে পারেনি! কারণ, সবকিছু যে ঢাকাকেন্দ্রিক। পদ্মা সেতু এই বাধা কাটিয়ে দেবে বলে আমি মনে করি। অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে মেধাবীদের যদি এখন বরিশালে নিয়ে যাওয়া যায় তবে এই যে অন্তর্বর্তীমূলক উন্নয়ন কিংবা উন্নয়নের মহাসড়কে দক্ষিণবঙ্গকে সম্পৃক্ত করা তার বেনিফিট আমরা পাব। অর্থনীতিতে ট্রান্সপোর্টেশন ও কানেক্টেভিটির গুরুত্ব যে কী তা আমাদের সবারই জানা।
মনে পড়ে ২০০৭-০৮ সালের কথা। যখন পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা করা হচ্ছিল জোরেশোরে। তখন বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান প্রফুল প্যাটেল বলেছিলেন, পদ্মা সেতুর ইন্টার্নাল রেট অব রিটার্ন অনেক হবে। যেহেতু দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার তথা এশিয়ান হাইওয়েকে সম্পৃক্ত করবে এবং বিশেষ করে যেহেতু ব্যবসা-বাণিজ্যে একটা প্রণোদনা সৃষ্টি হবে দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে। দক্ষিণবঙ্গের উৎপাদিত পণ্য পরিবহন করে অতি সহজে ঢাকায় আনা যাবে, যাতে কৃষক তাঁর ন্যায্য মূল্য পাবেন। ফড়িয়াবৃত্তি কমবে। তেমনটি ঢাকার মানুষও কিছুটা কম দামে নির্ভেজাল তরিতরকারি কিংবা দক্ষিণবঙ্গে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী পাবে। এটির একটি বিরাট অবদান রয়েছে। যে কোনো বড় প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ ফল বা রিটার্নের হার। প্রথম দিকে বঙ্গবন্ধু সেতুর প্রাক্কলিত ইন্টার্নাল রেট অব রিটার্ন ছিল ১১ থেকে ১২ শতাংশ। তখন উত্তরবঙ্গ থেকে উৎপাদকরা বা বিক্রেতারা তরিতরকারি ঢাকায় আনতে পারছিলেন না পরিবহনের সুযোগ নেই বলে।
সেই সঙ্গে অতিরিক্ত খরচ ও চাঁদাবাজিও ছিল। ফলে বগুড়া, দিনাজপুরের কৃষক বেগুন জমিতেই পুড়িয়ে ফেলেছেন। অথচ ঢাকায় তখন বেগুন বিশ-ত্রিশ টাকা। কিন্তু যখন আমরা দেখলাম যে দিনাজপুর থেকে, রংপুর থেকে শস্য অতি সহজে বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে ঢাকায় আনা যাবে এটাকে আমরা তখন আমাদের ফিন্যান্সিয়াল মডেলিংয়ে ইনক্লুড করলাম। তখন দেখলাম যে আমাদের ইন্টার্নাল রেট অব রিটার্ন বেড়ে গিয়েছে। যখন দেখলাম সিরাজগঞ্জের গো-চাষিদের আর দুধ ফেলে দিতে হবে না রাস্তায়, তাঁরা ঢাকায় দুধ পরিবহন করতে পারবেন এবং ভালো দামে বিপণন করতে পারবেন। এর ফলে যমুনা সেতুর ইন্টার্নাল রেট অব রিটার্ন প্রায় ১৪ ছাড়িয়ে গেল। পদ্মা সেতু হচ্ছে মেঘ না চাইতে জল। বিশ্বব্যাংক নিজেই শুরুতে বলেছিল, পদ্মা সেতুর ইন্টার্নাল রেট অব রিটার্ন হবে ১৯ থেকে ২০ শতাংশ। সেতুর মাধ্যমে সমাজে অপরিসীম প্রভাব পড়বে দক্ষিণ অঞ্চলের কৃষি, কৃষকদের ন্যায্য মূল্য দেওয়া, আরও বেশি শিল্প-কলকারখানা এবং আরও বেশি বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করার মাধ্যমে। সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর সময়কালে আমরা গভীরভাবে ভেবেছিলাম কী করে বাংলাদেশের কৃষিকে, বিশেষ করে ধান চাষকে উত্তর থেকে দক্ষিণে নিয়ে যাওয়া যায়, যাতে করে কচুরিপানার ওপরেও ধান চাষ করা যায়, বিশেষ করে পটুয়াখালী, বরিশাল অঞ্চলে। কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের বিজ্ঞানীরাও ভাবছিলেন। এখন আমরা যদি দক্ষিণ অঞ্চলে কচুরিপানার ওপরে কিংবা লো-লায়িং ল্যান্ডে বোরো চাষ করতে পারি, তবে আস্তে আস্তে উত্তরবঙ্গ থেকে কৃষিকে কিছুটা হলেও দক্ষিণে নিয়ে যেতে পারি। এতে আমাদের উৎপাদন ও বিপণনের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের ফলে এবং শ্রীলঙ্কা ক্রাইসিসের ফলে সরকারও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে নতুন করে ভাবছে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতও আমাদের অনেক সময় গম দিতে পারেনি, চাল দিতে পারেনি, চিনি দিতে পারেনি। কারণ তাদের নিজেদেরও চাহিদা রয়েছে। সেই ক্ষেত্রে আমরা যদি কৃষিটাকে আস্তে আস্তে উত্তর থেকে কিছুটা দক্ষিণে নিয়ে যেতে পারি, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে পারি তাহলে বিরাট উপকার হবে। কৃষককেও প্রণোদিত করা যাবে। পাটচাষিদেরও প্রণোদনা দেওয়া যাবে, যদি ইকো ফ্রেন্ডলি চাষাবাদকে আমরা প্রণোদিত করতে চাই। সেক্ষেত্রে সেতু হওয়ায় উৎপাদিত পণ্যটি, কিংবা পরিশোধিত পণ্যটি ঢাকায় চলে আসতে পারবে। এতে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি ঢাকায় বসবাসরত জনগণও কিছুটা সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো ও তাজা খাবার পাবে। আমাদের বিপণনের সমস্যার কারণে বা অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলের বাধার কারণে কৃষক তাঁর ন্যায্য মূল্য পান না এবং সাধারণ ক্রেতাও ফড়িয়াদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় অনেক দামে সে জিনিসটি কিনতে হয়। এটা কিন্তু পরোক্ষভাবে মূল্যস্ম্ফীতির চাপও কিছুটা কমিয়ে আনবে। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দৌড়গোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সেতু বড় ভূমিকা রাখবে।
পদ্মা নদী নিয়ে আব্দুল আলীমের গান রয়েছে। সর্বনাশা পদ্মা নদী। গত ১০০ বছরে পদ্মা অসংখ্যবার তার গতিপথ পরিবর্তন করেছে। পদ্মা আসলেই এক অজানা রহস্য! স্বাভাবিকভাবে যখন সেতুর কাজ শুরু হয় তখন বেশ কিছু জিনিস আমাদের কাছে নতুন ঠেকেছে। এর একটি হচ্ছে পাইলিং। যমুনা সেতুতে আমাদের এত গভীরে যেতে হয়নি। সেখানে কিছুটা নিচেই শক্ত মাটি ছিল বেশিরভাগ। হার্ড রক বা শক্ত মাটির পাটাতন, যেটির ওপরে পাইলগুলো থাকবে। সে হার্ড রক পাওয়ার জন্য এক্ষেত্রে অনেক গভীরে যেতে হয়েছে।
লেখক :অর্থনীতি বিশ্নেষক