করোনা সংক্রমণ কমে আসা এবং টিকাদান কার্যক্রমে গতির কারণে গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়তে থাকে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা শুরু হয়। পাশাপাশি গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আরও তীব্র হয়েছে। আমাদের আমদানির পরিমাণ তেমন না বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে অনেক। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে দেশে আমদানি ব্যয় আগের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৪২ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে, যার পরিমাণ ২ হাজার ৭৫৭ কোটি ডলার। একই সময়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে লেনদেনে চলতি হিসাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় রেকর্ড ১ হাজার ৫৩২ কোটি ডলার। এর আগে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও রেমিট্যান্স চাঙ্গা থাকলে চলতি হিসাবে ঘাটতি কম কিংবা উদ্বৃত্ত থাকে। কিন্তু প্রণোদনা থাকার পরও রেমিট্যান্সে গতি নেই। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ১৬ শতাংশ কমে গেছে।

গত বছরের নভেম্বরের পর থেকে মাসে আমদানি ব্যয় ৭০০ কোটি ডলারের বেশি। অথচ এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে রপ্তানি আয় বাড়েনি। রেমিট্যান্স তো কমেই গেছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। গত বছরের তুলনায় রিজার্ভ অনেক কমে এসেছে। রিজার্ভ এখন ৪২ বিলিয়ন ডলারের নিচে, যা গত বছরের আগস্টে ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বাজারের চাহিদা মেটাতে রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রচুর ডলার বিক্রি করছে। চলতি অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ পর্যন্ত বিক্রি করেছে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংক বিক্রি করলেও বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কাটেনি। ফলে ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত তারিখে আমদানি দায় পরিশোধের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারছে না। অর্থ পরিশোধে দেরি হলে অপর পক্ষের কাছ থেকে 'ঋণ পরিশোধে সক্ষম নন' হিসেবে চিহ্নিত হতে হয়। এটি নিয়মিত ঘটতে থাকলে সেই বাজার বিনিয়োগকারী কিংবা ঝুঁকি গ্রহণকারীদের কাছে আকর্ষণ হারায়। এ পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত এলসি কনফারমেশন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে তা বাণিজ্য এবং ঋণের জন্য অর্থ আদান-প্রদানে ডিসকাউন্টিংয়ের সুযোগ কমিয়ে দেয়।

বর্তমানে প্রতিবেশী দেশগুলোর এলসি কনফারমেশন বা নিশ্চিত করার খরচ আমাদের চেয়ে কম। ভারতের ব্যাংকগুলোর এ বাবদ ব্যয় শূন্য দশমিক ৫০ থেকে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ। পাকিস্তানে ১ দশমিক ২৫ থেকে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর এলসি নিশ্চিত করার ব্যয় ২ থেকে ৩ শতাংশ। অথচ পাকিস্তানের সার্বভৌম রেটিং বি৩, যা বাংলাদেশের বিএ৩-এর তুলনায় তিন ধাপ নিচে। যদি আমাদের মোট আমদানির ৩০ শতাংশের এলসি কনফারমেশন প্রয়োজন হয়, যথাযথ উদ্যোগ নিলে এ ব্যয় অন্তত দশমিক ৫০ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো সম্ভব। এতে বছরে ১২ কোটি ডলারের বেশি সাশ্রয় হবে। শুধু নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে আচরণগত উন্নয়নের মাধ্যমে যা করা সম্ভব। একইভাবে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের ব্যয় সাশ্রয় করা যাবে।

ওপরের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা বিশেষত মার্কিন ডলারের আরও প্রবাহ এবং তারল্য নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য উৎসাহিত করতে হবে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স। নিরুৎসাহিত করতে হবে বিলাসপণ্য আমদানি। মুদ্রা বিনিময় হার বাজারের চাহিদা এবং সরবরাহ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং মুনাফা বাড়ানোর জন্য সর্বোত্তম দাম পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। যাঁরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠান, তাঁদের জন্য আকর্ষণীয় হারে বিনিময়মূল্য দিতে হবে।

উল্লেখ করা যেতে পারে, বর্তমানের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য অনেক দেশ নিজেদের মুদ্রার মান অবমূল্যায়নের অনুমতি দিয়েছে। গত এক দশকে টাকার মান অন্যান্য অনেক মুদ্রার তুলনায় বেশ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। এ সময়ে ডলারের বিপরীতে ভিয়েতনামের মুদ্রা ডং-এর অবচয় ঘটেছে ১১ শতাংশ। ভারতীয় রুপির ৪০ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ান রুপির ৫৫ শতাংশ, পাকিস্তানি রুপির ১১৪ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কান রুপির ১৭৫ শতাংশ দর কমেছে। টাকার ক্ষেত্রে এ হার ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ। তাই আমাদের অতিমূল্যায়িত মুদ্রার মান ধরে রাখার প্রয়োজন আছে কিনা, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা প্রয়োজন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত বাজারের চাহিদা এবং সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে টাকার বিনিময় হার সামঞ্জস্যের অনুমতি দেওয়া।

ডলার এবং টাকার বিনিময় হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বিন্দুতে পৌঁছানোর জন্য সঠিক অংশে সঠিক ধরনের প্রণোদনা দেওয়া বর্তমানের চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্যতম কার্যকর কৌশল হতে পারে। এ কৌশল আমাদের কষ্টার্জিত রিজার্ভ সংরক্ষণ করতেও সহায়তা করবে। এ ছাড়া বাজারের উল্লেখযোগ্য অস্থিরতা এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য সহায়তা অব্যাহত রাখতে পারে, বিশেষত টাকার ওপর বাড়তি চাপের সময়ে প্রয়োজনীয় সরকারি জরুরি পণ্যের জন্য।

বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে এরই মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তার ডলার বিক্রির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে টাকার বেশ কয়েকবার অবমূল্যায়ন করেছে। এই বিনিময় হারে আন্তঃব্যাংকে লেনদেন হওয়ার কথা। আদতে তা হচ্ছে কিনা, নিয়মিত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেখা যাচ্ছে, ডলারের বিপরীতে সাম্প্রতিক সময়ে টাকার দর বেশ খানিকটা কমেছে। এর সঙ্গে মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতাও কিছুটা কমেছে। এখন আমদানি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স পর্যায়ে আন্তঃব্যাংক দরের সঙ্গে খুব বড় পার্থক্য নেই। এমনকি খোলাবাজারে মাঝে যে প্রতি ডলার ১০০ টাকা ছাড়িয়েছিল, সে অবস্থা এখন নেই। খোলাবাজারের সঙ্গে ব্যাংকের দরের পার্থক্যও কমে এসেছে। আমদানিতে লাগাম টানার কিছু ব্যবস্থা এনবিআর নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার নীতি সুদহার বাড়িয়ে চাহিদা কমানোর বার্তা দিয়েছে। আগামী সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে। মুদ্রানীতির ভঙ্গি বর্তমানের সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলে প্রত্যাশিত।

জাকির হোসেন: সাংবাদিক