পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই সেতুর ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দেশের বাকি অংশের সঙ্গে পুরোপুরি সংযুক্ত হলো। এর আগে ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলও দেশের বাকি অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছিল। এ দুই সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সংগ্রন্থন সম্পূর্ণ হলো। বিরাট বিরাট নদনদী দ্বারা এই দেশ আগে যেভাবে বিভক্ত ছিল, সেই পর্বের অবসান হলো।

নিঃসন্দেহে পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করবে। সেখানে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে। দেশের বাকি অঞ্চলের সঙ্গে আয় ও উন্নয়ন সূচকের পার্থক্য হ্রাস পাবে। সামগ্রিকভাবে গোটা বাংলাদেশের উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে।

১৯৬৬-'৬৯ সময়কালে আমার পিতা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ফরিদপুর শহরে পদায়িত ছিলেন। সেখানকার জিলা স্কুলে কিছুকাল পড়াশোনার পর আমি ১৯৬৭ সালে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলায় অবস্থিত মোমেনশাহী (বর্তমানে মির্জাপুর) ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হই। প্রতি ছুটিতে ঢাকা হয়ে সড়কপথে ফরিদপুর যাতায়াত করতে হতো। মনে আছে, ঢাকা থেকে খুব ভোরে রওনা দিয়ে বংশী ও কালীগঙ্গা নদীর দুই ফেরি পার হয়ে আরিচা পৌঁছাতেই বেলা গড়িয়ে যেত। গোয়ালন্দ ঘাটে ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে করতে মনে হতো, পৃথিবীর বোধ হয় শেষ প্রান্তে পৌঁছেছি। গোয়ালন্দ হয়ে অবশেষে যখন ফরিদপুর শহরে বাড়িতে পৌঁছতাম, তখন রাত হয়ে যেত। কাজেই পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য কী বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে, আমার 'জীবন থেকে নেওয়া' অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারি।

তবে ভৌগোলিক সংগ্রন্থন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে মাইলফলক হওয়া ছাড়াও পদ্মা সেতু আরেকটি দিক থেকে মাইলফলক হিসেবে বিরাজ করবে- আত্মনির্ভরশীলতার দিকে বাংলাদেশের অভিযাত্রা। দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বিশ্বব্যাংক যখন এই সেতু নির্মাণে ঋণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন বাংলাদেশ স্বীয় অর্থে এই সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এটা ছিল আত্মনির্ভরশীল হতে চাওয়ার এক সাহসী ঘোষণা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ঘোষণা বেশ চাঞ্চল্যেরও সৃষ্টি করেছিল। তৃতীয় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে 'দাতা' দেশ ও সংস্থার প্রতি সল্ফ্ভ্রম ও কৃতজ্ঞতাপূর্ণ মনোভাব বিরাজ করে। এসব দেশের অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের শরৎকালের সভায় যোগদান করে ঋণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসাকে তাঁদের সাফল্যের অন্যতম সূচক মনে করেন। তাজউদ্দীন আহমদ ছাড়া বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীদের জন্যও এ কথা কমবেশি প্রযোজ্য। এ পটভূমিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা ও সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল।

ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে জাতীয় আত্মনির্ভরতা একটি সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিনের গবেষণার ভিত্তিতে ১৯৮৭ সালে 'বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যা- বর্তমান উন্নয়ন ধারার সংকট ও বিকল্প পথের প্রশ্ন' শীর্ষক গ্রন্থে আমি যে বিকল্প উন্নয়ন ধারার প্রস্তাব করেছিলাম, তার চার মৌল বৈশিষ্ট্যের অন্যতম ছিল আত্মনির্ভরতা। এটা ছিল সমসাময়িক উন্নয়ন ধারার 'পরনির্ভরতা'র বিপরীত বৈশিষ্ট্য। আত্মনির্ভরতার প্রতি বিশেষ অনুরাগের কারণেই আমি যখন ১৯৯৮ সালে 'বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)' প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিই, তখন আত্মনির্ভরতাকেই এ সংগঠনের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে প্রস্তাব করি এবং তা গৃহীত হয়। তার পর থেকে 'বেন' প্রায় ২৫ বছর ধরে অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল সংগঠন হিসেবে, অর্থাৎ কোনো দাতা সংস্থা কিংবা সরকারি অনুদান না নিয়ে শুধু সদস্যদের অর্থায়নের ভিত্তিতে তার কাজ পরিচালনা করে যাচ্ছে।

এটা ঠিক, বাংলাদেশের কিছু অর্থনীতিবিদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল- প্রথমত, বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে স্বল্পসুদে টাকা পাওয়া যাচ্ছিল। তা বাদ দিয়ে যদি অন্য বৈদেশিক সূত্র (যেমন চীন) থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয় তবে তার জন্য অনেক বেশি হারে সুদ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, যদি বিদেশি ঋণের পরিবর্তে নিজস্ব অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয়, তাহলে অর্থনীতির অন্যান্য, বিশেষত সামাজিক খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করার মতো অর্থ থাকবে না। তৃতীয়ত, যদি বাজেট ঘাটতির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, তাহলে হয় অভ্যন্তরীণ ঋণদাতাদের অধিক হারে সুদ দিতে হবে, নতুবা মুদ্রাস্ফীতির বিপদ ডেকে আনা হবে। প্রাথমিক বিচারে এসব যুক্তির ওজন আছে। তবে, আরেকটু তলিয়ে দেখলে দেখা যেত, প্রথমত, আনুষ্ঠানিক সুদের হার কম হলেও বিভিন্ন শর্ত ও অন্যান্য আচরণের কারণে ঋণের প্রকৃত দায় (কস্ট) বেশি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ সূত্রের ঋণদাতাদের সুদ পরিশোধ আর বিদেশি ঋণদাতাদের সুদ পরিশোধ এক নয়। তৃতীয়ত, উন্নত দেশের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে অব্যবহূত (যেমন শ্রম) সম্পদ বেশি থাকে; ফলে ঘাটতি সংস্থান মূল্যস্ম্ফীতি সৃষ্টি নাও করতে পারে। বিশেষত, যদি টাকাটা ভালো উৎপাদনশীল কাজে বিনিয়োজিত হয়। শেষোক্ত বিচারে পদ্মা সেতু নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন। এ ছাড়া বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি গতিশীল বিচারে দেখা প্রয়োজন ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, আমার মনে হয়েছিল, এই অর্থনীতিবিদ বন্ধুরা বিষয়টির রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাতের দিকটির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না। আত্মনির্ভরশীলতার দিকে অভিযাত্রার যে বৃহত্তর তাৎপর্য রয়েছে, সেটি যেন সংকীর্ণ অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের নিচে আড়াল হয়ে যাচ্ছিল।


যাই হোক, এসব মতভেদ ও বিতর্ক পাড়ি দিয়ে ২০১৪ সালে শুরু হওয়ার পর পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হলো। এই বিশাল ও কারিগরি দিক থেকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং সেতুর নির্মাণকাজ সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করে দেখিয়েছে বাংলাদেশ। নিঃসন্দেহে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে বহু মানুষের অবদান, যাঁদের সবার কথা এখানে বলা সম্ভব নয়। তবে বিশেষভাবে মনে পড়ছে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর কথা; পরিবেশ আন্দোলনে একসঙ্গে কাজ করার সূত্রে যাঁর সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। তিনি বেঁচে থাকলে আজ কত আনন্দিত হতেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যদের অবদান লঘু না করেও এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, এই সাফল্যের মূল কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। পদ্মা সেতু-সংক্রান্ত সব অনিশ্চয়তা এবং চ্যালেঞ্জের স্রোতের মধ্যে তিনিই সফল কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করেন। তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতি দিতে কারও কুণ্ঠা বোধ করা উচিত নয়।

নিশ্চয়ই পদ্মা সেতু নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। বিশেষত, কেন এই সেতু নির্মাণের খরচ সূচনার ১২ হাজার কোটি থেকে শেষ পর্যন্ত ৩০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করল- অনেকে সে প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব প্রশ্নের উত্তরও দেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণের অভিজ্ঞতা নানা কারণেই একটি বিশেষ মূল্যবান অভিজ্ঞতা এবং গোটা বিশ্বের জন্যই তা আগ্রহের বিষয়। কাজেই বিরূপ না হয়ে সরকার বরং এই আলোচনাকে আরও উৎসাহিত করতে পারে। সে লক্ষ্যে সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে পারে। আমি নিশ্চিত, উন্নয়নবিষয়ক বিশ্ব পর্যায়ের বহু সংস্থা, গবেষক এবং বহু উন্নয়নশীল দেশের নীতিনির্ধারকরা এই শ্বেতপত্র অধ্যয়নে আগ্রহী হবেন।

পদ্মা সেতু নিয়ে দু-একটি বিষয়ে একটু সতর্কতা অবাঞ্ছনীয় হবে না। একটি হলো, মোংলা বন্দরের অধিকতর ব্যবহার। নিঃসন্দেহে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমানো দরকার; কিন্তু কিছু বিবেচ্য বিষয়ও রয়েছে। প্রথমত, যেখানে চট্টগ্রাম বন্দর সমুদ্র উপকূলে, সেখানে মোংলা বন্দর উপকূল থেকে প্রায় ১০০ কিমি অভ্যন্তরে। সেখানে পৌঁছাতে হলে জাহাজকে সুন্দরবনের ভেতর পশুর নদী দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। বঙ্গোপসাগরে ঘড়ির বিপরীতমুখী প্রবাহের কারণে মেঘনা মোহনার বিপুল পলির উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের উপকূলের পশ্চিমাংশে পৌঁছায় এবং পশুরসহ অন্যান্য নদী দিয়ে উত্তরমুখে প্রবাহিত হয়। ফলে পশুর নদীর নাব্য একটি সাংবৎসরিক চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, যদিও ব্যয়বহুল খননকাজের মাধ্যমে জাহাজ চলাচলের জন্য পশুর নদীকে নাব্য রাখা হয়, তাহলেও বিপুলসংখ্যক জাহাজের চলাচল সুন্দরবনের জন্য হুমকির সৃষ্টি করবে। তৃতীয়ত, মোংলা বন্দরে বিপুলসংখ্যক জাহাজের চলাচল অনিবার্যভাবে পশুর নদীর দুই তীর এবং সুন্দরবনের উত্তর সীমার শিল্পায়ন এবং বাণিজ্যিকীকরণ অনিবার্য করে তুলবে। ফলে পশুর ও অন্যান্য নদী দূষিত হয়ে পড়বে এবং সারা সুন্দরবনে এই দূষণ ছড়িয়ে পড়বে। এ বছরের মার্চ মাসে আমি পুনরায় মোংলা বন্দর এবং দাকোপ উপজেলায় গিয়েছিলাম। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে মোংলা বন্দর এলাকা এবং পশুর নদীর দুই তীরের যে ধরনের পরিবর্তন দেখেছি, তাতে এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারছি না। কাজেই মোংলা বন্দরের অধিকতর ব্যবহার বিষয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নির্মীয়মাণ পায়রা বন্দর দেশের পশ্চিমাঞ্চলের বিকল্প সমুদ্রবন্দরের ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে পায়রা বন্দরও পলিভরণের সমস্যায় আক্রান্ত।

সতর্কতার দ্বিতীয় বিষয় হলো, পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়নকে উৎসাহিত, সুগম এবং ত্বরান্বিত করবে, সন্দেহ নেই। একই সঙ্গে তা নিয়ে আসবে শিল্প-দূষণ। এ ব্যাপারে দেশের মধ্যাঞ্চল এবং পূর্বাঞ্চলের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। শিল্পায়ন গাজীপুরের শালবনকে উজাড় করেছে এবং এর স্বকীয় গড় ভূপ্রকৃতি বিনষ্ট করেছে। ধলেশ্বরী নদীর বক্ষ এবং দুই তীরকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। হবিগঞ্জের সুতাং নদীর পানিকে দুর্গন্ধযুক্ত আলকাতরায় পরিণত করেছে। দূষণের এই তালিকার শেষ নেই। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল হলো বঙ্গবন্ধুর জন্মভূমি। সেখানকার নদনদী ও পরিবেশের প্রতি বঙ্গবন্ধুর যে অসাধারণ মমত্ব, তা তাঁর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' থেকেই স্পষ্ট। অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দূষণের মাত্রা এখনও তুলনামূলক কিছুটা কম। পদ্মা সেতু যদি সেখানে দূষণের বাহনে পরিণত হয়, তবে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি অবমাননাই করা হবে। সুতরাং, পদ্মা সেতু নিয়ে নিশ্চয়ই আমরা আনন্দিত ও উৎসাহিত। এর পাশাপাশি কিছু শঙ্কা মনে রাখাও মঙ্গলকর হতে পারে।

ড. নজরুল ইসলাম: প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন)