সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির খবর পাওয়া যায় ১৬ জুন; আর ১৭ জুন সংবাদমাধ্যমে সিলেট বিভাগের ৮০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এই বন্যা বিষয়ে বিভিন্ন পূর্বাভাসের কথা জানা গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে সতর্কতা জারি করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা না করায় বহু মানুষ হঠাৎ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। আগাম খবর না পাওয়ায় তারা তাদের ঘরের সম্পদ, গবাদি পশুসহ নিরাপদে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে পারেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ১৭ থেকে ২৬ জুন সকাল পর্যন্ত বন্যায় মারা গেছে অন্তত ৮৪ জন।

বন্যায় হঠাৎ পানিবন্দি মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল জলযানের সংকট। ভুক্তভোগী মানুষ নিজেরা এবং স্বেচ্ছাসেবীরা তো প্রয়োজনীয় নৌকা জোগাড় করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেনই, এমনকি প্রশাসন ও বিভিন্ন বাহিনীর কাছেও পর্যাপ্ত সংখ্যক নৌকা ছিল না, যা বিভিন্ন সংবাদে প্রকাশিত। শুধু তাই নয়; বন্যার পরপর জলযান সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতেও বিলম্ব হয়েছে। বন্যায় প্লাবিত হওয়ার তিন দিন পর ১৯ জুন পানিসম্পদ সচিবের সভাপতিত্বে বিভিন্ন জেলার ডিসি-এসপি নিয়ে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়ালি বৈঠকে দেশের অন্য জেলা থেকে জলযান সংগ্রহ করে বন্যাকবলিত এলাকায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়।

বাংলাদেশে বন্যা খুবই নিয়মিত বিষয়। আর বন্যা হলে উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ তৎপরতায় নৌকা বা জলযানের প্রয়োজন হবে, সেটাও অজানা কোনো বিষয় নয়। এ রকম নিয়মিত বন্যার দেশে উদ্ধার ও ত্রাণকাজে প্রয়োজনীয় জলযান না থাকা এবং দুর্যোগের সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সেগুলো দ্রুত সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থা বিদ্যমান না থাকার ব্যাপারটি দুর্যোগ মোকাবিলায় অবহেলা ও প্রস্তুতিহীনতারই দৃষ্টান্ত। শুধু যাতায়াত সমস্যাই নয়; স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনের যুগে বন্যা মোকাবিলা ও ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত প্রশাসন প্রথম কয়েক দিন যোগাযোগ সমস্যাতেও ভুগেছে। বন্যায় মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কে বিপর্যয়ের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট প্রশাসনও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। বন্যা শুরুর দু'দিন পর ১৮ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যাকবলিত এলাকায় টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে ১২টি ভিস্যাট যন্ত্রপাতি হস্তান্তর করা হয় এবং সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরকে আরও ২৩ সেট ভিস্যাট যন্ত্রপাতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বন্যার আগেই প্রস্তুতি হিসেবে বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে এ কাজটি করা হলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সমস্যাটি হতোই না।

বাংলাদেশে বন্যা নিয়মিত ঘটনা হলেও বন্যার সময় কোন অঞ্চলের মানুষ কোন আশ্রয়কেন্দ্রে যাবে, কীভাবে যাবে; সেখানে তাদের খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা কী হবে; এসব বিষয়ে যে যথাযথ আয়োজন নেই, তা সাম্প্রতিক বন্যায় আবারও স্পষ্ট হলো। একদিকে সময়মতো পূর্বাভাস না পাওয়ায় মানুষ সময়মতো প্রস্তুতি নিয়ে ঘর থেকে বের হতে পারেনি; অনেকে ঘরেই আটকা পড়েছে। ছোটাছুটি করে অনেকে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই পেলেও মানুষের তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা কম হওয়ায় সেখানে তাদের থাকতে হয়েছে মানবেতরভাবে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবরণ থেকে দেখা যায়, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের প্রচণ্ড ভিড়; অল্প জায়গায় মানুষ ও পশু একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকা; নিরাপদ পানি ও খাদ্যের ব্যবস্থা না থাকা; অনিয়মিত ত্রাণ বিতরণ; অনেক জায়গায় স্রেফ এক বেলা করে চিড়া-মুড়ি খেয়ে ও বৃষ্টির পানি পান করে দিন পার করতে হয়েছে আশ্রিতদের। শত শত মানুষের জন্য অল্প কয়েকটা টয়লেট; সন্ধ্যা নামলে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা ছিল না। ঘুমানোর জন্য ছিল না কোনো ব্যবস্থা। এ রকম পরিস্থিতিতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসা পাবে, তারও আয়োজনও ছিল না। সিলেট বিভাগে পানিবন্দি মানুষ মাত্র ১০ শতাংশ আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই পেয়েছে। বাকি যারা আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে না পেরে উঁচু রাস্তা, টিলা, ব্রিজ, ছাদ কিংবা টিনের চালে আশ্রয় নিয়েছে; তাদের পরিস্থিতি ছিল আরও করুণ। তারা বৃষ্টিতে ভিজে, না খেয়ে না ঘুমিয়ে দিন পার করেছে। বৃষ্টিপাত চলাকালে যারা বৃষ্টির পানি দিয়ে পিপাসা মিটিয়েছে; বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর তারা বিপাকে পড়েছে।

বেসরকারিভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন নানাভাবে ত্রাণ তৎপরতা চালালেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। সমন্বয়ের অভাবও প্রকট। যে বিপুলসংখ্যক মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে, তাতে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী ও সমন্বিত তৎপরতা না চালানো হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নূ্যনতম প্রয়োজন মেটার কথা নয়। আর এ তৎপরতায় যে ঘাটতি রয়েছে, তা এমনকি সরকারি পরিসংখ্যান থেকেও স্পষ্ট।

ত্রাণ কার্যক্রম ছাড়া আরও যে বিষয়টি বন্যার্ত মানুষদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়েছে, তা হলো দুর্গত অঞ্চলে শুকনো খাবার, চাল, ডাল, আলু, বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি, মোমবাতিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট ও বাড়তি দাম। মুনাফাবাজরা যেন দুর্যোগের সময় সুযোগ নিতে না পারে; বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট নিরসন ও তদারকির মাধ্যমে তা নিশ্চিত করাই আধুনিক রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থার দায়িত্ব। বন্যার মধ্যে সিলেটে ৮০০ টাকার নৌকা ভাড়া ৫০ হাজার কিংবা ৫ টাকার মোমবাতি ৫০ টাকা হওয়ার অর্থ হলো, এ রকম কোনো বিকল্প সরবরাহ ও তদারকি ব্যবস্থা সেখানে ছিল না বা থাকলেও কাজ করেনি।

সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। সিলেট বিভাগের বন্যা মোকাবিলার ক্ষেত্রে যে ধরনের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার ঘটনা ঘটেছে; সে ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে যেন আর না ঘটে তার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়ার এখনই সময়। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে- যে উন্নয়ন মডেলের কারণে নদনদী নাব্য হারাচ্ছে; দখলে সংকুচিত হচ্ছে; পাহাড়-টিলা কাটা হচ্ছে; জলাভূমি ভরাট হচ্ছে; হাওরে বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণ করে পানি চলাচলে বাধা তৈরি করা হচ্ছে; সেই উন্নয়ন মডেলকে প্রত্যাখ্যান করে প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

কল্লোল মোস্তফা: লেখক, প্রকৌশলী; নির্বাহী সম্পাদক, সর্বজনকথা