সমকালে প্রকাশিত শিক্ষা-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক। শূন্য পদের বোঝায় বেহাল লক্ষ্মীপুরের প্রাথমিক শিক্ষা (১৫ জুন); নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক লাঞ্ছনাকারী আওয়ামী লীগ নেতার ভাই গ্রেপ্তার (১৪ এপ্রিল); গফরগাঁওয়ে জমি দখল হওয়ায় ক্লাসরুমেই স্থাপন করা হয়েছে দোলনা (১১ জুন); ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে চুয়েট বন্ধ (১৫ জুন); ধর্ম অবমাননার নামে ফাঁসানো হয় বিজ্ঞানের শিক্ষককে; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রগুলো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে- এই হলো গুটিকয়েক সংবাদ, যা শিক্ষাব্যবস্থার করুণ চিত্র তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট। এদিকে আমরা দেখেছি, শাহবাগে গণঅনশন করেছেন এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা দিয়ে পাস করা চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁদের দাবি- সনদপ্রাপ্তদের শিক্ষকতা পেশায় নিয়োগ দিতে হবে, যা অত্যন্ত যুক্তিসংগত। শিক্ষা কার্যক্রম যাঁরা পরিচালনা করবেন সেই শিক্ষকদের অভুক্ত রেখে, সম্মানহানি করে কোনো দেশ অগ্রগতির পথে যেতে পারে না। আর সে কারণে ৪৮ বছর আগে ১৯৭৪ সালের মে মাসে কুদরাত-এ-খুদা কমিশন তাদের কাজ সমাপ্ত করে যে রিপোর্ট বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিয়েছিল, এর মধ্যে প্রায় সব সমস্যা সমাধানের পথ ছিল। সেই রিপোর্টের ২২তম অধ্যায়ের ২২.১-এ শিক্ষকদের দায়িত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছিল- 'শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকরা হচ্ছেন যে কোনো শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র এবং শিক্ষার মান শিক্ষকের মান ও প্রচেষ্টার ওপর নির্ভরশীল। তাই শিক্ষার সর্বস্তরে উচ্চতম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে বাছাই করে নিতে না পারলে এবং জাতীয় জীবনে শিক্ষকরা যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণের দাবিদার; সমাজ তাঁদের সে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত না করলে আমাদের সুপারিশকৃত কোনো শিক্ষা সংস্কারই সফল হবে না।'

২২.২-এ বলা হয়েছিল- শিক্ষার মান শিক্ষকদের মানের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের শিক্ষকদের কাছ থেকে শিক্ষার যে মান আমরা আশা করি, তা থেকে তাঁরা যত নিল্ফেম্ন থাকবেন; আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে ততদূর পশ্চাতে পড়ে থাকবে। এ ক্ষেত্রে মান বলতে আমরা শুধু উচ্চশিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া আরও অনেক কিছু বুঝি। আমাদের শিক্ষকদের নিজ পেশা ও জাতির প্রতি কর্তব্য সম্পর্কে সুউচ্চ ধারণা, গঠনমূলক কাজে সহায়তার ইচ্ছা, বিদেশ থেকে আনা যন্ত্রপাতি ও সাজসরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পারিপার্শ্বিকতার সহজলভ্য বস্তুনিচয় ও এর সাহায্যে শিক্ষাদানের সংকল্প এবং পেশাগত উচ্চ নীতিজ্ঞান ও সম্মানবোধ ইত্যাদির অধিকারী হওয়া উচিত। যদি আমরা শিক্ষকদের গুরুত্ব স্বীকার করি, যেমন সাধারণত আমরা করে থাকি, তবে শিক্ষকদের পক্ষেও তেমনি উপরোক্ত গুণাবলির গুরুত্ব যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে হবে।

আবার ২২.২১ নম্বরে বলা হয়েছে- স্বীয় যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষকদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদা লাভ করা উচিত। কিন্তু বর্তমান অবস্থা তদনুরূপ নয়। আমাদের শিক্ষকদের, বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অবস্থার দিকে তাকালে এ কথা অনুধাবন করা যায়। শিক্ষকরা এমন হারে বেতন পান না যাতে তাঁরা সন্তুষ্ট থাকতে পারেন এবং তাঁদের কৃতিত্বের মর্যাদাও দেওয়া হয় না। সামান্য ও অনিয়মিত বেতনের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্য ব্যক্তি শিক্ষকতার দিকে আকৃষ্ট হন না। হলেও তাঁদের অনেকে কিছু দিনের দুঃখময় অভিজ্ঞতার পরে অন্য পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য হন। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের মধ্যে প্রতি বছর ১০ শতাংশেরও বেশি শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। পৃথিবীর আর কোনো দেশে শিক্ষকদের চাকরি ত্যাগের এমন হিড়িক দেখা যায় না।


৪৮ বছর আগে শিক্ষা কমিশন যদি শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বলতে পারে, তাহলে অন্তত চারবার সরকার পরিচালনা করেও সেই সমাধানের পথে হাঁটা হলো না কেন? জানা যায়, তৎকালীন কতিপয় আমলার মনোভাব এবং প্রভাব খুদা কমিশন রিপোর্টকে বাস্তবায়নের পথে এগোতে দেয়নি। আজও সেই আমলারাই এই জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন; তা এমপিওভুক্তির সমস্যা সমাধান না করে হোক; দৃষ্টান্তবহির্ভূত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার আয়োজন করে হোক; এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা প্রদানের ব্যাপারে হোক; তাঁদের প্রয়োজনীয় বদলি বা যে কোনো কারণে হোক; নানা জটিলতা সৃষ্টির পেছনে কাজ করছে।

এদেশে স্কুল ও কলেজ চালানোর স্বীকৃতি নিয়ে ৩, ৫ বা তদূর্ধ্ব বছর অতিক্রান্ত হলেও এমপিওভুক্ত না হওয়ার কারণে শিক্ষকরা আন্দোলন করেছেন। কিন্তু সুরাহা হয়নি। বরং এমপিওভুক্তির নতুন নতুন আইনের বেড়াজালে তাঁদের আবদ্ধ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলার পরও আজ অবধি ফয়সালা না হয়ে নতুন নতুন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। হয়রানির জাল বিস্তার করে রেখেছে মন্ত্রণালয় আর শিক্ষকস্বল্পতার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম গতিপথ হারিয়েছে।

খুদা কমিশনে আরও বলা হয়েছে- প্রাক-স্বাধীনতাকালে অনুসৃত শিক্ষা সংকোচন নীতির বৈশিষ্ট্য ছিল ক্রমান্বয়ে শিক্ষকদের বেতন, পদমর্যাদা, পদোন্নতি ইত্যাদি খর্ব করা। ফলে বর্তমানে সারাদেশে সরকারি কলেজগুলোতে প্রফেসরের কোনো পদ নেই। তদুপরি এসব কলেজের শিক্ষক ও অধিকাংশ কর্মচারীকে বছরের পর বছর অস্থায়ী করে রাখা হয়েছে; সাবস্টেনটিভ বা স্থায়ী করা হয়নি। বেতন ও চাকরির অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার দিক দিয়েও তাঁদের প্রতি চরম ঔদাসীন্য প্রদর্শিত হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাক-স্বাধীনতা যুগের এসব অন্যায়-অবিচারের আশু প্রতিকার হওয়া উচিত। অন্যান্য সরকারি চাকুরের মতো শিক্ষকদেরও প্রবেশন বা শিক্ষানবিশকাল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাকরিতে স্থায়ীভাবে বহাল করা প্রয়োজন। তদুপরি সমযোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের ক্ষেত্রে সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন হারে কোনোরূপ তারতম্য থাকা উচিত নয়। সেখানে নির্বিঘ্নে শিক্ষাদান কার্য সমাধান করতে শিক্ষকদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি থাকার কথা বলা হয়েছে। শহরাঞ্চলে সরকারি বাসস্থান প্রদানের ব্যাপারে শিক্ষক ও শিক্ষায়তনের অন্যান্য কর্মচারীকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। যদি বাসস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব না হয়, তবে মূল বেতনের একটি ন্যায্য অংশ বাড়ি ভাড়া ভাতারূপে দেওয়া উচিত। এ ধরনের শিক্ষা ও শিক্ষকের স্বার্থে মানবিক সুপারিশগুলো খুদা কমিশনের সম্মানিত সদস্যরা করেছিলেন।

শিক্ষকদের বাদ রেখে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন কখনোই সম্ভব হবে না। সরকার এবং আমলা-কর্মচারীরা যত শিগগির তা বুঝবেন জাতি উপকৃত হবে; মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হবে।

শেষ করতে চাই শিক্ষাবিদ লুনাচারস্কির উদ্ৃব্দতি দিয়ে। তিনি বলেছিলেন, 'শিক্ষক হলেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি জায়মান প্রজন্মের কাছে যুগযুগান্তরের সঞ্চিত যাবতীয় মূল্যবান সাফল্য হস্তান্তর করবেন। কিন্তু কুসংস্কার, দোষ ও অশুভকে ওদের হাতে তুলে দেবেন না।' এটাই হলো শিক্ষকের গুরুত্বের মাপকাঠি। সুতরাং তাঁকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। মনে রাখা প্রয়োজন, কেবল তাঁর হাত দিয়েই আমরা সুস্থ কুঁড়িগুলোকে লালন করতে পারি; যাদের জন্য আমরা লড়াই করছি, যাদের জন্য আমরা টিকে আছি এবং যাদের ছাড়া জীবন ও সংগ্রাম অর্থহীন। শিক্ষকরা অবহেলিত থাকবেন কেন? আমাদের যাবতীয় সংগ্রামের মধ্যে এটাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথম উন্নয়নই হবে শিক্ষায়। শিক্ষার উন্নয়নের সঙ্গে সব উন্নয়নই জড়িত।

এ. এন. রাশেদা: সাবেক অধ্যাপক, নটর ডেম কলেজ; সম্পাদক শিক্ষাবার্তা