দেশে গ্যাস সংক্রান্ত নানা দুর্ঘটনায় যেভাবে মানুষ হতাহত হচ্ছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। গ্যাসের ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণ ও গ্যাসলাইনে লিকেজ-সৃষ্ট বিস্ম্ফোরণের ঘটনা। রোববার সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, পুরান ঢাকার বংশালের একটি বাসায় গ্যাস বিস্ম্ফোরণে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, রান্নাঘরের গ্যাসলাইন ছিদ্র হওয়ায় জমে থাকা গ্যাসে এ বিস্ম্ফোরণ ঘটে। গ্যাস বিস্ম্ফোরণের শিকার হয়ে অগ্নিদগ্ধ মানুষের মৃত্যু যেমন মর্মন্তুদ; তেমনি এমন ঘটনায় অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর যাঁরা বেঁচে থাকেন, তাঁদের অবস্থাও হয় করুণ। পাল্লা দিয়ে গ্যাস দুর্ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তার কারণও অস্পষ্ট নয়। অনেক ক্ষেত্রে গ্যাসলাইন জরাজীর্ণ হয়ে পড়ার সংবাদও ইতোপূর্বে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এই ঝুঁকিকে আরও প্রকট করে তুলছে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ।

আমরা জানি, গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ থাকায় মানুষ সিলিন্ডারে এলপি গ্যাস ব্যবহার করে। কিন্তু সতর্কতার সঙ্গে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার না করার কারণেই এটি বিপজ্জনক হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাসাবাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স এবং গ্যাস বেলুনের সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ম্ফোরণ থেকে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল প্রায় ৯শ। অর্থাৎ দিনে গড়ে দুটির বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের পাশাপাশি সিলিন্ডারের হোসপাইপ, রেগুলেটর, গ্যাস ভাল্‌ভের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের ত্রুটির কারণে গ্যাস লিক হয়। সেই লিকেজ থেকে গ্যাস বেরিয়ে বাইরে কোথাও জমতে থাকে। সামান্য আগুন, এমনকি স্ম্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে জমে থাকা সেই গ্যাসে ভয়াবহ বিস্ফারণ হয়।

দেশে মানহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের ব্যবহার চলছে ভয়ংকরভাবে। সরকারের বিস্ম্ফোরক অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডারের মেয়াদ ১০ থেকে ১৫ বছর হয়ে থাকে। এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে ব্যবহূত গ্যাস সিলিন্ডারের অধিকাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ। যথাযথ মনিটরের অনুপস্থিতিতে বাসাবাড়ি, হাসপাতালের পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহূত হচ্ছে। সিলিন্ডারের মান এবং মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ পর্যবেক্ষণ কাজ সরকারের বিস্ম্ফোরক অধিদপ্তরের। আমরা চাই, নিয়মিতভাবে এ কাজটি করা হোক। একই সঙ্গে যথেচ্ছভাবে নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহারের যে অভিযোগ রয়েছে, তাও খতিয়ে দেখা দরকার।

বলার অপেক্ষা রাখে না, নিরাপদে গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাব যেমন প্রকট, তেমনি গ্যাস ব্যবহারকারীদের সচেতনতার অভাবও কম নয়। আমরা দেখছি, গ্যাস বিস্ফোরিত হয়ে এতই আকস্মিকভাবে এ দুর্ঘটনা ঘটে যে, তা থেকে সাধারণত পরিত্রাণ পাওয়া যায় না। অগ্নিদগ্ধে আহতদের চিকিৎসা অপ্রতুল, ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এ ক্ষেত্রে প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক- এ দুই ব্যবস্থাতেই গুরুত্ব দিতে হবে। গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করার ক্ষেত্রে মেয়াদ দেখাসহ কীভাবে সিলিন্ডার রাখতে হবে এবং পরিবহন করতে হবে তা সবার জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটলেও তাৎক্ষণিক কী করা উচিত সে জ্ঞানও ব্যবহারকারীদের দেওয়া চাই। আমরা মনে করি, গ্যাস দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোও দায় এড়াতে পারে না। মেয়াদোত্তীর্ণ এবং মানহীন গ্যাস সিলিন্ডার যাতে গ্রাহকের কাছে না যায়, প্রাথমিকভাবে তা কোম্পানিকেই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস বিস্ম্ফোরণে হতাহতের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনেও তাদের দায়িত্ব নেওয়া প্রয়োজন।

গ্যাস বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা এড়াতে সম্মিলিতি প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি সবাইকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। আগে কেবল শহরেই গ্যাসনির্ভরতা ছিল। এখন গ্রামেও মানুষ সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করছে। এখনই সচেতন না হলে দুর্ঘটনা বাড়তেই থাকবে। ফলে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কাজও আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে যে বেড়েছে, তা বলতেই হবে। সে জন্য সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের জনবল বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করে হলেও তদারকির বিষয়টিতে জোর দিতেই হবে।

বিষয় : গ্যাস বোমা সম্পাদকীয় বিস্ফোরক অধিদপ্তর

মন্তব্য করুন