নারী সন্তান গর্ভে ধারণ করেন; সন্তানের জন্ম দেন। নারীর মাতৃত্ব ও প্রজননক্ষমতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে শিল্প-সাহিত্য-সংগীত-সংস্কৃতিতে স্তুতির অভাব নেই। নারী নিজেও এ জন্য গর্বিত কম নয়। হাজার হাজার বছরের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, নারীর এই শারীরিক-মানসিক ক্রিয়াকর্মে তার নিজস্ব, স্বাধীন, নিরপেক্ষ মতামতের মূল্য সমাজ, রাষ্ট্রে প্রায় অপাঙ্‌ক্তেয়। নারীর মানবাধিকার আন্দোলন দেশে দেশে যত সোচ্চার হয়েছে; গর্ভপাত সম্পর্কে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আইন হয়েছে। বাংলাদেশে গর্ভপাত আইনত সোজাসুজি স্বীকৃত নয়। মাসিক সঞ্চালনকে বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণের শিকার নারীর গর্ভপাত ১৯৭২ সালে বৈধ করা হয়। পরবর্তীকালে গর্ভপাতের বিকল্প মেন্সট্রুয়াল রেগুলেশনে অনুমতি দেওয়া হয়। ২০১২ সালে ঔষধ প্রশাসন মেডিকেল ব্যবস্থাপনায় গর্ভপাতের জন্য মিদোপ্রিস্টন এবং মিস্প্রোটনকে বৈধতা দেয়।
নারীর জীবনের হুমকির বিষয়ে চিকিৎসকদের মতামত দেওয়া-নেওয়ার ক্ষমতা আছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই আইনে বিভিন্নতা আছে। ২০ থেকে ২৮ সপ্তাহ গর্ভপাতের জন্য আইন শর্তসাপেক্ষে বিভিন্ন রাজ্যে স্বীকৃত হয়েছে। চলতি বছর কলকাতা হাইকোর্ট বিশেষ অস্বাভাবিকতা বিবেচনায় ৩৫ সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভপাতের স্বীকৃতি দেন।
জোরালোভাবে এই আন্দোলনের সূতিকাগার বলা চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৬০ সাল থেকে এই আন্দোলন সেখানে জোরালো হতে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিরাপদ ও বৈধ গর্ভপাতের বিষয়টি সব নারীর অধিকার মর্মে স্বীকার করে। বৈধ শব্দটি অবশ্যই আপেক্ষিক। সোজা কথায় নারীর শারীরিক এবং মানসিক অক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোনো নারীকে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য করার অর্থ নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই সংক্রান্ত ১৯৭৩ সালে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের 'রো ভার্সেস ওয়েভ' সংক্রান্ত রায়টি ছিল ইতিহাসের ইতিবাচক মাইলফলক। এই কেসের রায়ের ওপর ভিত্তি করে ১৯৯২ সালে প্ল্যান্ড প্যারেন্টহুড ভার্সেস কেসি মামলার রায়ও গর্ভপাত আইনের পক্ষে যুগান্তকারী হিসেবে বিবেচিত হয়। আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গর্ভপাত আইনের বৈসাদৃশ্য কিছু বিদ্যমান।
সবকিছুকে হতবাক করে গত ২৩ জুন আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট 'থমাস এফ ডবস ভার্সেস জ্যাকসন উয়োম্যানস হেলথ অর্গানাইজেশন' মামলার রায়ে গর্ভপাতকে সংবিধানবিরোধী আখ্যা দেয়। মিসিসিপি রাজ্যের মেডিকেল ইমার্জেন্সি ভিত্তিতে ১৫ সপ্তাহের গর্ভপাত আইন এর ফলে রক্ষা পায়। রায়ের পরদিন ভ্যাটিকান রাজ্যের পোপ এই রায়ের সমর্থনে বিবৃতি দেন। পরিবার সংক্রান্ত মূল্যবোধ রক্ষায় তিনি নারীদের নতুন প্রাণ জন্ম দিতে উদ্বেগাকুল ও ভীত না হওয়ার পরামর্শ দেন এবং স্বার্থপর না হওয়ার আহ্বান জানান। আমেরিকাসহ বিশ্বের মানবাধিকার কর্মী ও বিভিন্ন নারী আন্দোলন এই রায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। খোদ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস, সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা, তাঁর স্ত্রী মিশেল ওবামা, কানাডার প্রেসিডেন্ট জাস্টিন ট্রুডো, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ প্রমুখ দেশি-বিদেশি নেতা নারীর মানবাধিকার হরণের এই নতুন পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছেন।
এই রায় কার্যত গণতান্ত্রিক আমেরিকার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। রায়বিরোধী বিচারপতিগণ ধর্ষণের শিকার নারী, নাবালিকা, জন্মদাতা পিতা দ্বারা গর্ভধারণের যন্ত্রণার কথাও বর্ণনা করেন। নারীর মানবাধিকার হারানোর আইনি প্রক্রিয়ায় একমত না হতে পেরে তাঁরা যেন নিরুপায়। আমেরিকার নারী সমাজ, সুশীল সমাজ, প্রগতিশীল সমাজ এ রায় কখনোই মেনে নেবে না। তার জন্য আবার সেই গোড়ার লড়াইয়ে ফিরে যেতে হবে। ইতোমধ্যে জিএনডব্লিউপি সব মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ, ইউএন উয়োম্যানসহ সবাইকে আন্দোলনে শরিক হতে আহ্বান জানায়। নারীর আজ উপলব্ধির সময় এসেছে মানবাধিকার আদায়, অর্জন ও রক্ষায় রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কত জরুরি। বিশ্বাস করি, আমেরিকান সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত নারীর মানবাধিকার আদায়ের আন্দোলন ও সংগ্রামে সুপ্রিম প্রতিবন্ধকতা হতে পারে না। নারী সমাজ আন্দোলন করে যত পথ এগিয়েছে, সামনে অপেক্ষা করছে তার চেয়েও দীর্ঘতর পথ- সেটাই আবার নতুন করে প্রমাণ হলো।
দেবাহুতি চক্রবর্তী: সম্পাদক, আন্তর্জাতিক উপপরিষদ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ