সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রলয়ঙ্করী বন্যা কতটা অসহায় অবস্থায় ফেলেছে দুর্গত পরিবারগুলোকে; তারই কিছু নজির তুলে ধরা হয়েছে সোমবার সমকালের এক প্রতিবেদনে। 'ত্রাণের আশায় সড়কে হাজারো বানভাসি' শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন ত্রাণের আশায়। বন্যার পানি নেমে গেলেও তাঁরা নিজ ভিটায় ফিরতে পারছেন না; কারণ একদিকে স্মরণকালের ভয়াবহ এ দুর্যোগ তাঁদের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, আরেকদিকে তাঁদের ক্ষুধা নিবারণের কোনো উপায় নেই। এলাকায় আয়ের কোনো সংস্থান নেই মূলত কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী এ মানুষদের। যখনই কোনো সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা ত্রাণ নিয়ে আসে; তার ওপর হামলে পড়ছেন তাঁরা। ত্রাণ সংগ্রহের এ প্রতিযোগিতায় বহু শিশুকেও নামতে হয়েছে ক্ষুধার তাড়নায়। বানভাসি মানুষের দুর্ভোগের এ অসহনীয় চিত্র যে শুধু সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ এলাকার; তা নয়। জেলার আরও বহু এলাকায় একই অবস্থা বিরাজ করছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জে অনেক এলাকা আছে, যেখানে এখনও মানুষ পানিবন্দি। তাঁরা কতটা দুর্ভোগে আছেন, তা চিন্তা করলেও গা শিউরে ওঠে। এ অবস্থায় ত্রাণ সরবরাহের পাশাপাশি বন্যার্তদের পুনর্বাসন কর্মসূচিও দ্রুত শুরু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। মনে রাখতে হবে, সিলেট অঞ্চলের মানুষ মাত্র এক মাস আগে আরেক দফা বন্যার ধকল মোকাবিলা করেছেন। এপ্রিলেও বিশেষত সুনামগঞ্জের নিচু এলাকার মানুষকে অকাল বন্যার ছোবল সইতে হয়েছিল। আবার ওই অঞ্চলের মানুষের জন্য এটাই যে শেষ বন্যা; তা তো নয়। বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, সীমান্তের ওপার থেকে আসা পানির তোড়ে সামনে আবারও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতিসংঘসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের প্রশংসা পেলেও এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, এবারের সিলেট অঞ্চলের বন্যায় পূর্বাভাস থাকার পরও সংশ্নিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো একটু দেরিতে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেছে। এমনকি ওই অঞ্চলের সাংসদসহ জনপ্রতিনিধিদেরও শুরুর দিকে বেশ কিছুদিন দুর্গতদের পাশে দেখা যায়নি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো বটেই; মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও আমরা অনেক প্রশ্ন ও ক্ষোভ উগরে পড়তে দেখেছি। এর আগে এমন দুর্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা দুর্গতদের বাঁচাতে ঘটনার পরপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। পাড়া-মহল্লা-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজপথে গণমানুষের কাছ থেকে ছোট ছোট সাহায্য সংগ্রহ করে বানভাসি মানুষদের তা পৌঁছে দেওয়া হতো। বন্যার পানি নেমে গেলে দুর্গতদের মাঝে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগ যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, তার জন্য ওষুধ সংগ্রহ থেকে শুরু করে খাবার স্যালাইন বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হতো। এবার তেমনটা দেখা যায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠন সিলেট অঞ্চলের বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ালেও তা কতটা আন্তরিক, আর কতটা ফটোসেশনের জন্য তা নির্ণয় করা কঠিন নয়। প্রতিবেদনটিতে শুধু সিলেট অঞ্চলের দুর্গত মানুষের সংকটের কথা বলা হলেও আমরা জানি, ঠিক একই সময়ে উজান থেকে আসা অস্বাভাবিক পানির কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলাও বন্যাক্রান্ত হয়েছে। সেসব এলাকার দুর্গত মানুষও পর্যাপ্ত ত্রাণের অভাবে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন।
আমরা মনে করি, বানভাসি কোনো মানুষেরই এ বঞ্চনা প্রাপ্য নয়। সংশ্নিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর উচিত আরও আন্তরিকতা এবং সম্ভাব্য সবকিছু নিয়ে এদের পাশে দাঁড়ানো। দুর্গত মানুষদের বাঁচাতে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার হয়তো কোনো সুযোগ নেই। তবে তাদের এ আন্তরিকতা মাঠ পর্যায়ে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা, তা-ও তদারক করা দরকার। একই সঙ্গে এটাও আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই, অতীতে আইলাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে দেখা গেছে, সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে যথেষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ দিলেও উপকারভোগীদের কাছ পর্যন্ত যাওয়ার আগে এর অনেকাংশই হাওয়া হয়ে গেছে। ফলে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ শেষ পর্যন্ত বঞ্চিতই থেকে গেছেন। এবার এ ধরনের দুর্নীতি-অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো হবে, এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।

বিষয় : বানভাসির বঞ্চনা সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন