কবি আবুল হোসেনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'নববসন্ত' যখন ১৯৪০ সালে প্রকাশ হয়, তাঁর বয়স তখন ১৮। তারুণ্যের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৮ বছর বয়সের যে বন্দনা গেয়েছেন; বাস্তবে কবি আবুল হোসেনের 'নববসন্ত' যেন সে জানানই দিয়ে গেছে। আবুল হোসেনকে বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে যে প্রথম আধুনিক কবি বলা হয়; 'নববসন্ত' তারই দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ জীবন (১৯২২-২০১৪) পেলেও আবুল হোসেন লিখেছেন সে অর্থে কম। ১১টি মৌলিক কাব্য, একটি অনূদিত কবিতার বই এবং দুটি স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ 'আমার এই ছোট ভুবন', 'আর এক ভুবন।' কিন্তু তিনি যে কবিতা লিখেছেন; তার শৈল্পিক গুণ, বিষয় বিন্যাস এবং শব্দচয়ন নিঃসন্দেহে এক নতুন দ্যোতনা সৃষ্টি করেছে।
সমসাময়িক মুসলমান কবিদের মধ্যে তিনি ব্যতিক্রমী ধারা সৃষ্টি করে গেছেন। কবি আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, গোলাম কুদ্দুস- এঁদের মধ্যেও কাব্যগ্রন্থ প্রকাশে তিনিই প্রথম। আহসান হাবীবের কাব্যগ্রন্থ 'রাত্রিশেষ' প্রকাশ হয় ১৯৪৭ সালে। ফররুখ আহমদের 'সাতসাগরের মাঝি' প্রকাশ হয় ১৯৪৪ সালে। আর ১৯৪০ সালে 'নববসন্ত' প্রকাশ করেন আবুল হোসেন; যে গ্রন্থের জন্য এখনও তাঁকে অনেকে 'নববসন্তের কবি' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ওই সময় এই কাব্যগ্রন্থ দিয়ে আবুল হোসেন সবার নজর কাড়তে সক্ষম হন। নববসন্তে (আমরা :বাংলার মেয়ে) আবুল হোসেন প্রথম লিখেন সমিল গদ্য কবিতা-
আজকের দিনে রান্নাঘরের অন্ধকারের মাঝে/ যে মেয়েরা বসে চীনে বাসন মাজে/ মশলা পিষতে চোখ ভরে আসে জলে/ তাদেরো অন্ধ জীবনের তলে।
আবুল হোসেন জন্মগ্রহণ করেন বাগেরহাটে। তাঁর বাবা পুলিশ বিভাগে চাকরি করতেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর লেখালেখির সূচনা এবং তখন আধুনিক বাংলা কবিতার শৈশব। তাঁর ভাষায়, 'আধুনিক বাংলা কবিতার শৈশব থেকেই তো আমি তার অবিচল সঙ্গী। এ কবিতার শুরু রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে। বিদ্রোহ তাঁর ভাষার বিরুদ্ধে; ছন্দের ব্যবহারের বিরুদ্ধে যে ভাবালুতা, পেশাহীনতা, অতিনৈতিকতা বাংলা কবিতার ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলো; তা থেকে তাকে মুক্তি দিয়ে ভাষায় আঙ্গিকে বক্তব্যে নতুনত্বের অন্বেষণে বের হলো আধুনিক কবিতা। শুধুমাত্র আবেগই নয়, চিন্তাও কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে দেখা দিলো। ছন্দের যুক্তি, গদ্য এবং ব্যঙ্গ হয়ে পড়লো কবিতার প্রধান উপজীব্য। মুখের ভাষাকে কাব্যের ভাষায় রূপান্তরিত করতে লাগলাম। গদ্য ও পদ্যের ভাষার বেড়া ভেঙ্গে দিতে গেলাম কবিতায়।' 
কবি আবুল হোসেন অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন। স্নাতকোত্তর করেছেন সমাজবিজ্ঞানে। তাঁর সরকারি চাকরিতে তিনি প্রথম আয়কর বিভাগে কাজ করেন; পরে বেতারে। তারপর তথ্য বিভাগে। যুগ্ম সচিব হিসেবে তিনি ১৯৮২ সালে অবসর গ্রহণ করেন। লেখালেখির জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদকসহ উল্লেখযোগ্য পদক ও পুরস্কার লাভ করেন।
বাংলা ভাষার আধুনিক যুগের প্রধান কবি প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গেই কবি আবুল হোসেনের ঘনিষ্ঠতা ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ এবং কবি জসীম উদ্‌দীনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। তিনি লেখক জীবনের শুরুতেই সঙ্গ পেয়েছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুব, হুমায়ুন কবীর, সৈয়দ মুজতবা আলী, বুদ্ধদেব বসুর। তিনি 'নববসন্ত' উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। আর 'নববসন্ত' প্রকাশের পর কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন।
আবুল হোসেন ব্যক্তিগতভাবে 'নববসন্ত'কেই বেশি পছন্দ করেন। যদিও তার পরের কাব্যগ্রন্থগুলোও বেশ আলোচনায় আসে।
১৯৩৫ সাল থেকে লিখতে শুরু করা এই কবি ২০১৪ সালে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন। তিনি বিদায় নেন ২৯ জুন; তখন নিশ্চিত বর্ষাকাল। তবে তিনি 'নববসন্তের কবি' হিসেবে হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
মাহফুজুর রহমান মানিক :সাংবাদিক ও গবেষক
mahfuz.manik@gmail.com