উন্নয়নশীল দেশগুলোকে চীনের ঋণ প্রদানের হার বৃদ্ধির সঙ্গে 'ঋণের ফাঁদ' নামক অভিযোগে চীনকে দণ্ডিত করার প্রবণতা দ্রুততার সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ অন্য ঋণদাতাদের ঋণ প্রদানের হার কমে যাওয়ায় উন্নয়নের লক্ষ্যে চীন অর্থায়ন বৃদ্ধি করেছে। চীনা ঋণ-সংক্রান্ত নেতিবাচক প্রচার-প্রচারণা নতুন স্নায়ুযুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।
ঋণফাঁদ কূটনীতি কী?
'ঋণফাঁদ কূটনীতি'- বেশ চটকদার এই শব্দযুগল ২০১৭ সালে ভারতীয় ভূ-কৌশলবিদ ব্রহ্মা চেলানি প্রথম ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, যখন কোনো ঋণগ্রস্ত দেশ অর্থ প্রদানের শর্তাবলি পূরণ করতে পারে না, তখন অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক বিভিন্ন সুবিধা লাভে চীন সেই দেশকে ঋণ প্রদান করে। এভাবে দরিদ্র দেশগুলোকে ঋণে জর্জরিত করার মধ্য দিয়ে চীন প্রধানত সেসব দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে।
চীনের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জন্য তাঁর এই শব্দযুগলকে যে ব্যাপক হারে ব্যবহার করা হচ্ছে; তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বাধিতভাবে হার্ভার্ডের বেলফার সেন্টার ক্রমঅগ্রসরমান এই এশীয় শক্তির ভূ-কৌশলগত স্বার্থ-সম্পর্কিত এক নেতিবাচক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে। এদিকে, অন্য অনেক বিষয়ের মতোই বাইডেন প্রশাসন এ ব্যাপারে ট্রাম্পের নীতি অনুসরণ করছে। এমনকি পশ্চিমা গবেষকরাও সাধারণ পর্যায়ে চীন বিতর্কের নতুনভাবে বর্ণিত এ আখ্যান নিয়ে সন্দিহান। লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের এক গবেষণার উপসংহারে বলা হয়, এটি সম্পূর্ণরূপে ভুল, ত্রুটিপূর্ণ এবং এর সত্যতা যাচাই করার মতো কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই। ১৮ বছরে ১৬৫ দেশে ১৩ হাজার ৪২৭টি প্রকল্পে চীনের ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট এইডডেটা। ঋণখেলাপির পর চীনের বিদেশি সম্পদ অধিগ্রহণের একটি উদাহরণও তারা খুঁজে পায়নি।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার লক্ষ্যে এই 'ঋণফাঁদ কূটনীতি' ব্যাখ্যা করা হলেও এটি ঋণ প্রদানের প্রকৃত প্রভাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ প্রকল্পের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চীন ঋণ প্রদান করে। এটি দাতা-নির্ধারিত কোনো 'পলিসি ঋণ' নয়। কিছু দেশ 'অতিরিক্ত ঋণ' গ্রহণ করলেও বেশিরভাগ দেশই তা করে না। আর ব্যবসায়িক চুক্তিতে জটিলতা হতেই পারে; বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হয় না।
যদিও প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়নে ইচ্ছাকৃত অপব্যবহারের সুযোগ কম থাকে; ঋণগ্রহীতা দেশ সাধারণত কোণঠাসা অবস্থায় থাকে। ঋণের উৎস যেটাই হোক না কেন; বিদেশি বিনিয়োগ এবং অর্থায়নের বিভিন্ন শর্তের কারণে এমনটি হয়ে থাকে। তাই শুধু চীন থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেই নয়; এ ধরনের ঋণ গ্রহণের ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।
শ্রীলঙ্কা
চীনা ঋণের ফাঁদ নামক অপপ্রচারে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয় শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের ঘটনা। সাধারণ মিডিয়ার ধারণা, শ্রীলঙ্কা যাতে ঋণ সংকটে পড়ে, এ জন্য চীন এই বন্দর নির্মাণে ঋণ প্রদান করেছিল। পরে এই পূর্বানুমান অনুসারেই ঋণ মওকুফের বিনিময়ে চীন এই বন্দর দখল করে এবং চীনা নৌবাহিনী এটি ব্যবহার শুরু করে।
কিন্তু বিভিন্ন স্বতন্ত্র গবেষণা এই ব্যাখ্যাকে ভুল প্রমাণ করে। গত বছর দি আটলান্টিক 'চীনা ঋণের ফাঁদ একটি মিথ' শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর সাবটাইটেলে বলা হয়, 'এই ব্যাখ্যা বেইজিং এবং এর সঙ্গে জড়িত উন্নয়নশীল দেশ- উভয়কেই ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে।'
প্রতিবেদনে বলা হয়, 'আমাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, চীনা ব্যাংকগুলো বিদ্যমান ঋণের শর্তাবলি পুনর্গঠন করতে আগ্রহী এবং প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো দেশ থেকে সম্পদ নিজেদের অধিকারে নেয়নি; আর হাম্বানটোটা থেকে তো একেবারেই নয়।'
এই প্রকল্প চালু করেছিলেন শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে; চীন বা এর কোনো ব্যাংকার নয়। কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি এবং ডেনিশ ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম রামবোল এর সম্ভাব্যতা যাচাই করে এটি কার্যকর হবে বলে সিদ্ধান্ত দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত উভয়ে শ্রীলঙ্কার ঋণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার পরেই কেবল নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চায়নিজ হারবার গ্রুপের সঙ্গে জড়িত হয়।
শ্রীলঙ্কার কাঠামোগত অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং বৈদেশিক ঋণ কাঠামোর ফলে পরে দেশটিতে ঋণ সংকট তৈরি হয়। পশ্চিমা-অধ্যুষিত পুঁজিবাজার থেকে অত্যধিক ঋণ গ্রহণকে এর জন্য দায়ী করেছে চ্যাথাম হাউস প্রতিবেদন; চীনা কোনো ব্যাংককে নয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী জার্নাল ফরেন পলিসিও শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের জন্য চীনা ঋণের ফাঁদকে দায়ী করেনি। এর পরিবর্তে বলে, 'শ্রীলঙ্কা বহু বছর ধরে যে উন্নয়ন সহায়তা গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, তার ক্ষতি পোষাতে ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশল সফলভাবে বা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আপডেট করেনি।'
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের কোয়ান্টেটিভ ইজিং সংকুচিত করার সিদ্ধান্তে বিশ্ববাজারে সুদের হার বাড়ছে এবং এর কারণে ঋণ গ্রহণের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার পশ্চিমা-অধ্যুষিত পুঁজিবাজার ঋণ পরিশোধ সংক্রান্ত সমস্যা অব্যাহত থাকায় দেশটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে সাহায্য চাইতে বাধ্য হয়। তাই কেউ কেউ যুক্তি দেন- চীন থেকে আরও বেশি ঋণ নেওয়াই এ প্রজাতান্ত্রিক দ্বীপরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত হবে।
বাস্তবিক পক্ষে শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার পর ঋণের সঙ্গে সম্পদ বিনিময়ের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। এর পরিবর্তে একটি চীনা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ১ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে বন্দরটি ইজারা নেয়। এভাবে শ্রীলঙ্কা নিজেদের বৈদেশিক রিজার্ভ বৃদ্ধি করে এবং অন্যান্য দেশ, বিশেষত পশ্চিমা ঋণদাতাদের কাছে তাদের ঋণ পরিশোধ করে। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ নৌ কমান্ডের অধীন এই বন্দর চীনা নৌবাহিনীর জাহাজ ব্যবহার করতে পারে না। 'এক কথায়, হাম্বানটোটা পোর্ট ঘটনায় চীনা কৌশলের তেমন নজির পাওয়া যায়নি, তবে শ্রীলঙ্কার প্রশাসনিক দুর্বলতার অসংখ্য প্রমাণ মিলেছে।'
মালয়েশিয়া
মালাক্কা প্রণালিতে প্রভাব বিস্তারের জন্যও মিডিয়া চীনকে অভিযুক্ত করেছে। চীনের তেল আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে আসে। আর এ জন্যই বেইজিং মালয়েশিয়ার বিতর্কিত ইস্ট কোস্ট রেল লিংকে (ইসিআরএল) ঋণ প্রদান বৃদ্ধি করেছে বলে দাবি করেন 'ঋণফাঁদ' প্রবক্তারা।
চ্যাথাম হাউসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, 'ভূ-রাজনীতি নয়, বরং শ্রীলঙ্কার মতোই ক্ষমতার লোভে চীনা বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন অর্থায়নকে কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডাকে এগিয়ে নিতে ঋণগ্রহীতা সরকারের প্রচেষ্টা এখানে মূল সমস্যা।'
অভিযুক্ত মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক ইসিআরএল চালু করেছিলেন। মূলত চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে পেনিনসুলার মালয়েশিয়ার কম উন্নত পূর্ব উপকূলের উন্নয়নের জন্য এটি এমন সব বিকল্পকে প্রত্যাখ্যান করে, যা কম ব্যয়বহুল কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। সম্ভবত অসৎ উদ্দেশ্যেই প্রয়োজনের তুলনায় ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। নাজিবের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের লক্ষ্যে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করার জন্যই ঋণের শর্তাবলি গঠন করা হয়েছিল, যাতে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই ঋণের বোঝা বর্তায়। অর্থাৎ যদি কোনো চীনা কর্মকর্তার যোগসাজশ না থাকে, তবে এ ধরনের অপব্যবহারের দায় ঋণগ্রহীতার; ঋণদাতার নয়।
সময়ানুগ জোটনিরপেক্ষতা
অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে পশ্চিমা দাতারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পর চীনের উন্নয়ন খাতে অর্থায়ন 'দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা' জোরদার করেছে। এরই মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা, বৈশ্বিক মহামারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে টেকসই উন্নয়ন অর্জনে অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে।
নব্য স্নায়ুযুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার নতুন পথ তৈরি হওয়ার ফলে যে অনভিপ্রেত ক্ষতিসাধন হয়েছে, তা উন্নয়নশীল দেশ ও উন্নয়ন খাতে অর্থায়নকে ব্যাহত করেছে। এই নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার লক্ষ্যে আমাদের এমন প্রতিকূল সময়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নতুন জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বিবেচনা করতে হবে।
ড. আনিস চৌধুরী :অধ্যাপক, ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটি ও জোমো কোয়ামে সুন্দরম :ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো, খাজানাহ রিসার্চ ইনস্টিটিউট