ধামরাই ঢাকার অদূরে অবস্থিত একটি সমৃদ্ধ প্রাচীন জনপদ। জানা যায়, খ্রিষ্টীয় একাদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে ধামরাই পাল বংশীয় বৌদ্ধ রাজাদের শাসনাধীন ছিল। পালদের পতনের পর এ এলাকা গাজী বংশীয় নৃপতিরা শাসন করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে এটি পাঠান বংশের শাসনে চলে যায়। ধামরাইয়ে অনেক প্রাচীন নিদর্শনের চিহ্ন পাওয়া যায়। এখানকার মাটি খনন করলে প্রাচীন ইটের টুকরা, পোড়ামাটি ও ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল বের হয়ে আসে। এ ছাড়া এই এলাকায় রয়েছে অনেক প্রাচীন দিঘি। যেমন- কাজীর দিঘি, থানার দিঘি, কুঞ্জনগর ও আনন্দনগর দিঘি। এখানে লক্ষ্য করা গেছে নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা, বিভিন্ন পেশার মানুষের বসতি ও আনাগোনা। ধামরাইয়ে রয়েছে পুরোনো বাড়িঘর, বসতি ও জীবন-জীবিকা। এখানকার তামা, কাঁসা ও মৃৎশিল্পের খ্যাতি রয়েছে উপমহাদেশজুড়ে। এক সময় এখানে মসলিন কাপড়ের সুতা তৈরি হতো। লোকশিল্পের নানা উপাদান ও উপকরণ এখনও ধামরাইয়ে পাওয়া যায়। পুরোনো হাটবাজার, নদী, রথযাত্রা, মিষ্টান্ন ও নানা শিল্পসামগ্রীর কারণে ধামরাইয়ের রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। সময়ের প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজনের তাগিদে এ জনপদে স্থাপিত হয়েছে বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র, শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাজধানীর সন্নিকটে হওয়ায় দিন দিন জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ক্রমান্বয়েই বেড়ে চলেছে এলাকার গুরুত্ব।
ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রার কারণে ধামরাইয়ের পরিচিতি বিস্তৃত দেশ-বিদেশে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে ধামরাইয়ের রথ স্থান করে নিয়েছে বিশ্বের বুকে। পৃথিবীর বুকে এই রথের পরিচিতি কম নয়। বাংলাদেশে এত বড় রথযাত্রা, রথ উৎসব ও রথমেলা অন্য কোথাও হয় না। প্রাচীন এ জনপদের রথ উৎসব মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে মিশে আছে। শ্রী শ্রী যশোমাধবের এই রথযাত্রা হিন্দু ধর্মীয় চেতনার সঙ্গে জড়িয়ে সৃষ্টি হলেও এখন আর নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষ উপভোগ করে থাকে এখানকার রথ উৎসব। দেশ-বিদেশের নানা ধর্ম-বর্ণের হাজার হাজার মানুষ প্রতি বছর এই রথযাত্রা ও উৎসবে মিলিত হয়ে থাকেন। ধামরাই বাজারের উত্তর পাশে সারাবছর রোদ-বৃষ্টিতে কাঠের তৈরি রথের এই শিল্পকর্মটি শোভিত থাকে। বর্তমানে কাঠের প্রতিকৃতি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকলেও এর ইতিহাস অনেক প্রাচীন। জানা যায়, বাংলা ১০৭৯ সনে ধামরাইয়ের এই রথযাত্রা ও মেলার সূচনা ঘটে। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়ায় এ রথযাত্রা উৎসব শুরু হয়। এদিন মাধবদেব বিগ্রহকে রথের শীর্ষ প্রকোষ্ঠে উঠিয়ে রথ টানা হয়। ১০ দিন পর সেটাকে টেনে পূর্বের স্থানে আনা হয়, যা উল্টোরথ নামে পরিচিত।
ধামরাইয়ের প্রবীণ মানুষ ও ইতিহাসবিদদের কাছ থেকে জানা যায়, পাল বংশের শেষ রাজা যশোপাল ছিলেন পূজাবৎসল ও ধার্মিক। তিনি ধামরাইয়ের শিমুলিয়া গ্রামের এক মাটির ঢিবির নিচ থেকে একটি মন্দির ও মাধব মূর্তি আবিস্কার করেন। সেই সময় থেকে মাধবের নামের সঙ্গে যশোপালের নাম যুক্ত হয়ে বিগ্রহের নতুন নাম হয় শ্রী শ্রী যশোমাধব। সে সময় থেকে ধামরাইয়ে যশোমাধবের মূর্তিতে পূজার বন্দোবস্ত হয়। আজও সেই মাধব অঙ্গনে পূজার অর্চনা চলে। পরবর্তী সময়ে সাটুরিয়ার বালিয়াটি গ্রামের জমিদাররা বংশানুক্রমে কাঠের রথ তৈরি করে রথযাত্রাকে অমর করে রাখেন। তাঁরা বাংলা ১২০৪ থেকে ১৩৪৪ সনের মধ্যে কাঠের চারটি রথ তৈরি করেন। ১৩৪৪ সনের রথটি নারায়ণগঞ্জের সূর্যনারায়ণ সাহার ঠিকাদারিতে এক বছর সময় নিয়ে তৈরি হয়। অত্র অঞ্চলের দক্ষ কাঠশিল্পীদের দ্বারা ১৬ মিটার উচ্চতার ত্রিতল রথ তৈরি হয়। এই রথ টানার জন্য ২৫ মণ পাটের কাছি দরকার হতো। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বৃহৎ রথটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মির্জাপুরের রণদাপ্রসাদ সাহার সহযোগিতায় ৮ মিটার উচ্চতার ছোট রথ তৈরি হয়। প্রতিবছর এখানে রথযাত্রার সঙ্গে মাসব্যাপী আয়োজনে চলে মেলা, সার্কাস, পুতুলনাচ, কারুপণ্য ও নানা শিল্পসামগ্রীর কেনাবেচা। এভাবে নানা বৈচিত্র্যে টিকে আছে ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী জনপদ ও রথযাত্রা।
ড. মেজবাহ উদ্দিন তুহিন: গবেষক, কলামিস্ট, পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), তথ্য ও গণসংযোগ বিভাগ, বাউবি