জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ এবং ক্রীড়াঙ্গনের কথা প্রথম থেকেই বলেছেন। চেয়েছেন বৈষম্যহীন ক্রীড়াঙ্গন। ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণ হলেন সংগঠকরা। যোগ্য, নিবেদিত সংগঠকদের নেতৃত্বে বিভিন্ন খেলা পরিচালিত হলেই ক্রীড়াঙ্গন ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে; পরিবর্তন আসবে। ফেডারেশনের কর্মকাণ্ডেও সম্মিলিতভাবে অংশ নিতে হবে। সংগঠকদের মধ্যে অন্তর্কলহ এবং তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিবাদ ক্রীড়াঙ্গনের মৌলিক কার্যক্রম ব্যাহত করে। আবার ক্রীড়া সংগঠকরাও জবাবদিহি, দায়বদ্ধতা ও শৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে নন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম থেকেই বলেছেন, ক্রীড়াঙ্গন পরিচালিত হবে নিবেদিত ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ক্রীড়া সংগঠকদের মাধ্যমে।
সত্তর দশকের গোড়ায় বঙ্গবন্ধু নতুন দেশের ক্রীড়াঙ্গন ঘিরে যে প্রত্যাশার কথা বলেছেন; তাঁর সুযোগ্য কন্যা ক্রীড়ানুরাগী প্রধানমন্ত্রী প্রথম থেকেই যে চিন্তার কথা বলেছেন- সেখান থেকে ক্রীড়াঙ্গনের বর্তমান অবস্থান কোথায়, ভেবে দেখা দরকার। বিশেষত নারী ও পুরুষ সমতায় বর্তমান ক্রীড়াঙ্গন কত দূরে। সরকার নারী-পুরুষে বৈষম্যহীন ক্রীড়াঙ্গন বিষয়ে সক্রিয় ও আন্তরিক থাকা সত্ত্বেও এটি কার্যক্ষেত্রে পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো ক্রীড়া সংগঠকদের প্রাচীন মানসিকতা। প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে যাওয়ার মনমানসিকতা এবং ক্রীড়াঙ্গনে সংস্কার সাধনকে এক ধরনের হুমকি হিসেবে মনে করেন অনেক সংগঠক।
আমরা দেখছি, স্বাধীনতার ৫০ বছর পর বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে প্রথম নারী ক্রীড়া সংগঠক কামরুন নাহার হীরু একটি জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনে (বাংলাদেশ জুডো ফেডারেশন) সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। প্রাক্তন জুডোকা, ষষ্ঠ ড্যানের অধিকারী হীরুর খেলোয়াড়ি জীবন অত্যন্ত উজ্জ্বল। দেশে ছাড়াও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি একজন দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে পরিচিত। অনেক বছর ধরে 'জুডো ইউনিয়ন অব এশিয়া'য় স্পোর্টস কমিশন মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়াও তিনি জুডো ইউনিয়ন অব এশিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলের স্পোর্টস ডিরেক্টর, ন্যাশনাল স্পোর্টস কাউন্সিলের সাংগঠনিক কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য, ঢাকা বিভাগ মহিলা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক, মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসহ কয়েকটি ক্রীড়া ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত এই নারী সংগঠক নতুন দায়িত্বকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। সাংগঠনিক দুর্বলতার জন্য গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে জুডো চর্চায় প্রকৃত অবস্থা ছিল বড্ড ম্রিয়মাণ। সংগঠকদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই ও বিশৃঙ্খলা সম্ভাবনাময় খেলাটিকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বহীন করে ফেলেছিল।
কামরুন নাহার হীরুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জুডো ফেডারেশন তার প্রমাণ হিসেবে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার সাত মাসের মধ্যে বিগত চার বছর ধরে যে জাতীয় জুডোর আয়োজন করা হয়নি সেটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। অংশ নিয়েছেন রেকর্ড সংখ্যক পুরুষ ও নারী জুডোকা। আয়োজন করা হয়েছে দিনব্যাপী 'জুডো ফেস্টিভ্যাল'। সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা জুডো সংগঠকদের। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয়েছে আন্তঃবাহিনী জুডো প্রতিযোগিতা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য নিয়ে। 'গ্রাউন্ড ওয়ার্ক' শুরু হয়েছে সার্ভিসেস দলগুলো নিয়ে জুডো প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত করার জন্য। এক সময় জাপান জুডো কাপের টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হতো। কয়েক বছর ধরে সেই প্রতিযোগিতা আর অনুষ্ঠিত হয় না। ফেডারেশন চেষ্টা করছে আবার সেই প্রতিযোগিতা জাপান দূতাবাসের সহায়তায় শুরু করার জন্য। সমস্যা হলো পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। সরকারের অনুদানে তো অনেক টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন করা সম্ভব নয়।
যেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী; দেশের সরকার নারী-পুরুষ বৈষম্যের বিপক্ষে; সেখানে ক্রীড়াঙ্গনে সাংগঠনিক গুরুদায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যোগ্য নারী সংগঠককে অন্য চোখে দেখার মানসিকতা সত্যি দুঃখজনক। কিছুদিন আগে কলকাতায় 'সমতার ক্রীড়াঙ্গন' শীর্ষক সেমিনারে আমার একটি 'কেস স্টাডি' পেপার পড়া হয়েছে। আমার অনুপস্থিতিতে পেপারটি পড়েছেন নারী অধিকার কর্মী কৃষ্ণা রায়। আলোচনায় কামরুন নাহার হীরুর চ্যালেঞ্জ গ্রহণকে সময়োচিত সিদ্ধান্ত হিসেবে বক্তারা উল্লেখ করেছেন।
সত্যি কথা বলতে কি সবখানেই বিভিন্ন ধরনের সমস্যা আছে। সমস্যার সম্মুখীন হয়ে ভেঙে পড়লে চলবে না। ঝড়ের বিপরীতে হাল ছাড়া যাবে না। অন্ধকার রাতের পর ভোরের আলোর সন্ধান মিলবেই। আর তাই মনোবল হারালে চলবে না। ক্রীড়াঙ্গনের জন্য প্রয়োজন নতুন চিন্তা ও কর্মধারা। গোটা ক্রীড়াঙ্গনের লক্ষ্য এবং চিন্তার উদ্দেশ্য তো এক নয়। গতানুগতিক নয়, চাই প্রগতি। পুরোনো চিন্তা-ভাবনা পরিহার করে ক্রীড়াঙ্গনকে সামনে থাকতে হবে। যোগ্য, মেধাসম্পন্ন, সাহসী এবং সৎ সংগঠকদের পক্ষেই সম্ভব ক্রীড়াঙ্গনে অল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বাস্তবধর্মী উদ্যোগের মাধ্যমে যে কোনো ম্রিয়মাণ স্পোর্টসকে নতুন করে প্রাণচঞ্চল করে তোলা।
দেশ ইতোমধ্যে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছে। যে অবস্থা থেকে স্বাধীন দেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর এখন যে অবস্থানে এসে আমরা পৌঁছেছি, এটি অবশ্যই আশার সঞ্চারী। বিভিন্ন সামাজিক এবং অর্থনৈতিক খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখ করার মতো। এগুলো সম্ভব হয়েছে পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যয় নিয়ে লেগে থেকে কাজ করার জন্য। ক্রীড়াঙ্গনে অগ্রগতি এবং উন্নতি আছে, তবে তা আরও বেশি হতো যদি যোগ্যতা ও দক্ষতাসম্পন্ন, সুপরিকল্পিত, বাস্তবধর্মী উদ্যোগ গ্রহণ এবং সুশাসন ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ঘাটতি না থাকত।
সরকার, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সব সময় ক্রীড়াঙ্গনের পাশে ছিল। ক্রীড়াঙ্গন পরিচালনার সব দায়-দায়িত্ব তো সংগঠকদের। সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কখনও ক্রীড়া কর্মকাণ্ডে মাথা ঘামায় না যতক্ষণ কোনো বিষয়ে জনস্বার্থ পরিপন্থি না হয়ে ওঠে। ক্রীড়া সংগঠকরা সবাই মিলেমিশে যদি প্রতিটি খেলার সাংগঠনিক ক্ষেত্রে লক্ষ্য স্থির করে কাজ করতেন, তাহলে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আরও অনেক পরিবর্তন লক্ষণীয় হতো। কিন্তু সাংগঠনিক ক্ষেত্রে প্রতিটি জাতীয় ফেডারেশনে কাজের মানুষের বড় অভাব। অথচ নির্বাচনের আগে সে কী দৌড়ঝাঁপ আর উৎসাহ! পদবি নিশ্চিত হওয়ার পর আর খোঁজ-খবর নেই। এ সমস্যার সমাধান করতে পারেন একমাত্র ক্রীড়া সংগঠকরা।
ইকরামউজ্জমান: ক্রীড়া লেখক ও বিশ্নেষক