প্রশাসনের তরফ থেকে আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত থাকার কথা বললেও পশুর হাট নিয়ে দুশ্চিন্তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বুধবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোরবানির পশুর দাম অস্বাভাবিকভাবে যেমন বাড়তে পারে, তেমনি সরবরাহেও সংকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমরা মনে করি, পশুর দাম বাড়ার অন্যতম কারণ চাঁদাবাজি। কোরবানির পশু পরিবহনে ঘাটে-হাটে চাঁদাবাজি যেন সাধারণ বিষয়। কোরবানির হাটে পশু প্রবেশের আগেই নানা জায়গায় ব্যবসায়ীদের চাঁদা দিতে হয়। এমনকি গত বছর আমরা দেখেছি, হাটে ঢুকে ভালো জায়গা পেতেও বাড়তি অর্থ গুনতে হয়েছে। চাঁদাবাজির সঙ্গে এবার বাড়তি আশঙ্কা যোগ হয়েছে পশুখাদ্যের দাম। আমরা দেখছি, গত পাঁচ মাসে বাজারে সব ধরনের পশু ও পোলট্রি খাদ্যের দাম ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে পশু পালনে খামারিদের ব্যয় অনেক বেড়েছে। এর মধ্যে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পশুর দাম বেড়ে অনেকেরই নাগালের বাইরে চলে যাবে। তাতে কেবল খামারিরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না; একই সঙ্গে তার প্রভাব ক্রেতা, এমনকি গরিব মানুষের ওপরেও পড়বে।
কয়েক বছর ধরে যেভাবে দেশীয় পশু দিয়ে কোরবানির চাহিদা পূরণ হচ্ছে, তার ইতিবাচক প্রভাব আমরা দেখছি। চার বছর আগেও কোরবানির হাটে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি পশু দেখা যেত। এখন খামারিদের আগ্রহে পশুর উৎপাদন বাড়ছে। এটা স্বস্তির বিষয়- কোরবানিতে পশুর চাহিদার সবটুকু পূরণ হচ্ছে দেশের গবাদি পশু দিয়েই। কোরবানি লক্ষ্য রেখে খামারিরা সারাবছর প্রস্তুতি নেন। পশুর খাদ্যসহ লালনপালনে তাঁরা বড় বিনিয়োগ করেন। কোরবানির সময় পশু বিক্রি করতে না পারলে তাঁরা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং পরে পশু পালনে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। গত সপ্তাহে ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর চাহিদা নিরূপণ, সরবরাহ ও অবাধ পরিবহন নিশ্চিতকরণ-সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন, কোরবানির জন্য প্রায় সোয়া কোটি পশু প্রস্তুত। আমরা দেখেছি, চাহিদার চেয়ে বেশি পশু থাকায় উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশের খামার বিকশিত করার লক্ষ্যে দেশের বাইরে থেকে পশু আনা বন্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। আমরা মনে করি, একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায়ও নজর দেওয়া জরুরি। স্থায়ী ও অস্থায়ী হাটের মালিকরা অযৌক্তিক হাসিল আদায় করেন বলে যে অভিযোগ রয়েছে, সেদিকেও দৃষ্টি দেওয়া চাই। কোনো খামারি তাঁর পশু দূরবর্তী হাটে নিতে চাইলে রাস্তাঘাটে জোর করে নামাতে বাধ্য করা যাবে না এবং ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ হয়রানির শিকার হবেন না বলে মন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা বাস্তবে নিশ্চিত করতেই হবে।
এবার এমন সময়ে ঈদুল আজহা এসেছে, যখন দেশের উল্লেখযোগ্য জেলার মানুষ বন্যায় আক্রান্ত। স্বাভাবিকভাবেই বন্যায় আক্রান্ত জেলাগুলোতে গবাদি পশু নিয়ে বিপদে পড়েছেন খামারি, গৃহস্থ ও চাষিরা। বন্যায় যেমন ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে, তেমনি চারণভূমিও রক্ষা পায়নি। ওইসব অঞ্চলে অনেকের চাষ করা ঘাস বন্যায় নষ্ট হওয়ায় পশুখাদ্যের সংকট দেখা দেওয়ায় দামও বেড়ে গেছে। ফলে বন্যা তাঁদের জন্য 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' হয়ে এসেছে। বন্যার কারণে সেখানকার মানুষও অভাবে পড়েছে। এ অবস্থায় ওইসব জেলায় কোরবানি দেওয়ার হার কমে যেতে পারে। আমরা মনে করি, ওইসব অঞ্চলের পশু যাতে অন্য অঞ্চলে সহজে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করা চাই। একই সঙ্গে সচ্ছল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোরবানি করা পশুর গোশত বন্যাকবলিত মানুষের মধ্যে বিতরণেরও ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
এ সময়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণও বাড়ছে। তাই পশুর হাটে মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে উদাসীনতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কয়েক দিন পরই সারাদেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার গবাদি পশুর হাটে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার বিকল্প নেই। এ সময়ে পশুর হাটের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করে কোরবানির পশু কেনাবেচায় শৃঙ্খলা ফেরাতে পারলে সংকট অনেকাংশেই কাটানো সম্ভব হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

বিষয় : হাটবাজার সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন