মানুষের খাদ্য সংস্কৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। মানব সভ্যতার গোড়া থেকে খাদ্যের উৎস, প্রাপ্তি, উৎপাদন, সরবরাহই মূলত খাদ্য সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের নিয়ামকগুলোর অন্যতম। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, খাদ্যপ্রাপ্তি, খাদ্যের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ধর্ম, বর্ণ, ভৌগোলিক অবস্থান, খাদ্য উপকরণগুলোর সংরক্ষণ ব্যবস্থা এই খাদ্য বৈচিত্র্যকে অনেক প্রভাবিত করেছে। সাধারণভাবে আমরা যা কিছু খাই; সেগুলোকে খাদ্য বিবেচনা করলেও বৈজ্ঞানিকভাবে সেসব উপকরণ খেলে দেহের ক্ষয় পূরণ, বৃদ্ধি সাধন ও রোগব্যাধি থেকে প্রতিরক্ষা দেয় সেগুলোকেই খাদ্য বলে। সেই হিসেবে আমরা অনেক কিছুই খাই, যেগুলো আদৌ খাদ্য নয়।

সভ্যতার সূচনাতে প্রাকৃতিক উৎস থেকে খাদ্যের উপকরণগুলো সহজলভ্য এবং সরাসরি ব্যবহূত হলেও কালের পরিক্রমায় প্রয়োজনের তাগিদে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ যোগে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু হয়। জনসংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রাকৃতিক উৎস আস্তে আস্তে সংকুচিত হতে থাকে। সেই থেকে বৈরী আবহাওয়া (ঝড়, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, তুষারপাত) এবং বিভিন্ন জীবের আক্রমণ, মাটিতে পুষ্টির ঘাটতি যখন খাদ্য উৎপাদনকে ব্যাহত করতে থাকে, তখন অবশ্যম্ভাবীভাবেই মানুষ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে মনোযোগী হয়। সভ্যতার শুরুতে বিজ্ঞানের ধারণা মানুষের না থাকলেও মানুষ তার স্রষ্টা প্রদত্ত মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শুরু করে।

জীবের খাদ্য গ্রহণ থেকে পুষ্টি শোষণ একটি জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। খাদ্য গ্রহণের পর থেকে পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে বিপাক ক্রিয়া সম্পন্ন হয়; সহজে যাকে খাদ্যদ্রব্য ভেঙে তার মধ্য থেকে সার নির্যাস বের করা বলা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দেহের অভ্যন্তরের বিভিন্ন দেহযন্ত্র যেমন ব্যবহার করতে হয়, তেমন দেহ-অভ্যন্তরে উৎপন্ন বিভিন্ন জটিল জৈব রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আন্তঃক্রিয়া করে। তবে এই অতি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি সহজ হিসাব আছে। সেটি হলো, খাদ্য হিসেবে যে বস্তুটি প্রবেশ করানো হয়, সেটির গুণগত মান। ক্রমান্বয়ে মানহীন নিঃসার খাদ্য উপাদান গ্রহণ করলে সেখান থেকে দেহ পরিচালনায় পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়া যায় না। সেই সঙ্গে দেহ যন্ত্রগুলো আস্তে আস্তে বিকল হতে থাকে।

মধ্যবিত্ত, উন্নত, অনুন্নত, উচ্চ আয়, মধ্য আয়, স্বল্প আয়ের অর্থনৈতিক দেশভিত্তিক বিভাজন পৃথিবীতে এক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। খাদ্যের সঙ্গে স্বাস্থ্য তথা পুষ্টি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা মানুষ ভালোভাবে বুঝতে পারে বলেই এখন পৃথিবীর সর্বত্র খাদ্য নিরাপত্তা এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় মনোযোগী হয়।

বাংলাদেশ একটি ক্রমবর্ধমান মধ্যম আয়ের হিমালয় বিধৌত গাঙ্গেয় অববাহিকার দেশ হওয়ায় এ অঞ্চল বরাবরই কৃষিনির্ভর। জনসংখ্যার বৃদ্ধি, চাষযোগ্য জমির সংকোচন এবং দেশের উত্তরোত্তর প্রবৃদ্ধি চলমান থাকায় কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণায় বিনিয়োগ, জীব প্রযুক্তির ব্যবহার করার ফলে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কৃষিক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে আমরা স্বাবলম্বী। ধান, মাছ, মুরগি, গরু, ছাগল, সবজি, ফলমূল উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। যেখানে পুষ্টির চেয়ে সার্বিক উৎপাদনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চাহিদার অনুপাতে সরবরাহ এবং সহজলভ্যতা বাড়লেও সরাসরি খাদ্য থেকে পুষ্টি পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এ লক্ষ্যেই খাদ্যের মাধ্যমে পুষ্টি যোগের উদ্যোগ অনেক আগে থেকেই চালু আছে।

খাদ্য সংস্কৃতির বৈচিত্র্য বাস্তবতায় এ দেশের মানুষের কাছে নতুন কোনো পুষ্টিসমৃদ্ধ ফল, সবজি বা যে কোনো ধরনের খাদ্য উপকরণ জনপ্রিয় করা অনেক বেশি জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। ভাতনির্ভর খাদ্য সংস্কৃতি এ দেশে ধানের উৎপাদন বহুগুণে বাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় আমিষ, ভিটামিন, খনিজ এবং অন্যান্য উপাদানসমৃদ্ধ খাদ্য উপকরণের সহজলভ্যতা এবং উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি। আয় বৈষম্যের ফলে বাজারে বৈচিত্র্যপূর্ণ উপকরণগুলো সব সময় সবার জন্য সহজলভ্য নয়। ফলে দেশের মানুষের সার্বিক পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

অতিরিক্ত উৎপাদন বা উৎপাদন বৃদ্ধির বাস্তব এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপের জন্য কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগ, ফসল রক্ষায় বালাইনাশকের ব্যবহার একদিকে যেমন উৎপাদনের নাটকীয় বৃদ্ধি এনেছে, সেই সঙ্গে নানাবিধ পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানে জীব প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষি উৎপাদন, পুষ্টিমান উন্নয়ন, রোগবালাই প্রতিরোধে অসাধারণ সাফল্য এনে দিয়েছে। জীব প্রযুক্তি হলো, কোনো জীবের জিনগত পরিবর্তন ঘটানো। জীব প্রযুক্তি নতুন কোনো সংযোজন বা বিয়োজন নয়। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই তা প্রকৃতিতে ঘটে চলেছে। মানুষ প্রকৃতিতে ঘটতে থাকা ঘটনাবলির রহস্য উদ্ঘাটন করে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তায় সেই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনগুলো প্রয়োজনে ব্যবহার করছে মাত্র। জীব প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবিত নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীবগুলো এখন খাদ্য ঘাটতি পূরণ, পুষ্টিকর নিরাপদ খাদ্য তৈরি, রোগের প্রতিষেধক তৈরিসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সমাধানে আশার আলো দেখাচ্ছে।

আব্দুল্লাহ মোহাম্মাদ সোহায়েল: অধ্যাপক, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরিচালক, সায়েন্স পোর্টার বাংলাদেশ