পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা কোনো অর্থনৈতিক কিংবা আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা একটি রাজনৈতিক ও জাতীয় সমস্যা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে তাঁর বক্তৃতায় বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। আর রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের উদ্দেশ্যে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি (জুম্ম) অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের লক্ষ্যেই ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

পার্বত্য চুক্তির 'খ' ও 'গ' খণ্ডে আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ-সংবলিত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন এবং এসব পরিষদে সাধারণ প্রশাসন, পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন (রিজার্ভ বন ব্যতীত) ও পরিবেশ, সব উন্নয়ন কার্যক্রমসহ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কার্যাবলি হস্তান্তরেরও বিধান করা হয়েছে।

চুক্তির সেসব বিধান অনুসারে আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছে সত্য; কিন্তু গত আড়াই দশকেও এসব পরিষদের কাছে চুক্তিতে উল্লিখিত প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক এখতিয়ার এবং কার্যাবলি ন্যস্ত করা হয়নি। এমনকি তিন পার্বত্য জেলার স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়নপূর্বক এসব পরিষদের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়নি। চুক্তির এসব মৌলিক বিষয় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় একদিকে যেমন পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান অর্জন হয়নি, অন্যদিকে তেমনি আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ-সংবলিত পার্বত্যবাসীর স্বায়ত্তশাসনও গড়ে ওঠেনি।

এদিকে গত ১৬ জুন জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে গিয়ে পার্বত্য রাঙামাটি আসনের সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার বলেছেন- 'শান্তিচুক্তিতে কোথাও লেখা নাই- পরিত্যক্ত সেনা ক্যাম্পগুলোতে পুলিশ বসানো যাবে না।' অবশ্য পার্বত্য চুক্তিতে যা লেখা নেই তা তুলে ধরতে সোচ্চার হলেও চুক্তিতে যা লেখা আছে, তা নিয়ে তাঁকে অতীতে সক্রিয় দেখা যায়নি।

সংসদ সদস্য আরও বলেছেন- 'শান্তিচুক্তিতে আছে অপ্রয়োজনীয় সেনাক্যাম্প গুটিয়ে আনা হবে।' তাঁর এই বক্তব্যও ছিল মনগড়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কেননা, চুক্তিতে 'অপ্রয়োজনীয় ক্যাম্পগুলো' নয়, 'সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সব অস্থায়ী ক্যাম্প স্থায়ী নিবাসে ফিরিয়ে' নেওয়ার কথা রয়েছে। যেমন পার্বত্য চুক্তির 'ঘ' খণ্ডের ১৭(খ) ধারায় 'সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প ও সেনানিবাস কর্তৃক পরিত্যক্ত জায়গাজমি প্রকৃত মালিকের নিকট অথবা পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর' করার বিধান রয়েছে। চুক্তির সেই বিধান সম্পর্কে সংসদে আলোচনা করতে এই সংসদ সদস্যকে দেখা যায়নি।

উল্লেখ্য, পার্বত্য চুক্তির 'খ' খণ্ডের ৩৪(খ) ধারায় 'পুলিশ (স্থানীয়)' বিষয়টি এবং ৩৩(ক) ধারায় 'জেলার আইনশৃঙ্খলা সংরক্ষণ ও উন্নয়ন' সংক্রান্ত বিষয়টি তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরের বিধান করা হয়েছে এবং ২৪(ক) ধারায় 'পার্বত্য জেলা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও তদনিম্নস্তরের সকল সদস্য প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন' মর্মে উল্লেখ রয়েছে।

সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন বর্তমান পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির এ-যাবৎ অনুষ্ঠিত পাঁচটি সভার মধ্যে প্রথম চারটি সভায় পার্বত্য চুক্তির ওইসব বিধান অনুসারে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে 'পুলিশ (স্থানীয়)', 'আইনশৃঙ্খলা সংরক্ষণ ও উন্নয়ন' বিষয় হস্তান্তর ও অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন মোতাবেক পার্বত্য জেলা পুলিশ বাহিনী গঠন করা ইত্যাদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির পঞ্চম সভায় প্রত্যাহারকৃত অস্থায়ী ক্যাম্পের স্থলে পুলিশ ক্যাম্প বসানোর প্রস্তাব করা হলেও সভায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। অথচ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির প্রথম চারটি সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করে কমিটির পঞ্চম সভার প্রস্তাবিত বিষয়টি বাস্তবায়নের যুক্তি দেখিয়ে ১৩ এপ্রিল, ২০২২ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার্স থেকে প্রত্যাহূত সেনাক্যাম্পের জায়গায় এবিপিএন ক্যাম্প স্থাপনের নির্দেশনা জারি করা হয়।

এছাড়া প্রত্যাহূত সেনাক্যাম্পের জায়গাগুলো প্রকৃত মালিকের কাছে কিংবা সংশ্নিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তর না করে রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক সেসব জায়গায় 'নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য নির্ধারিত স্থান', 'উক্ত স্থানে কোনো প্রকার স্থাপনা নির্মাণ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ' ইত্যাদি উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু, প্রত্যাহারকৃত ক্যাম্পের যেসব জায়গায় জুম্ম পরিবার বসবাস করছে সেসব পরিবারকে ওই জায়গা ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে যেতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি স্থায়ী অধিবাসীদের প্রাণের দাবি- পার্বত্য চুক্তির যথাযথ, দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। অথচ পার্বত্য রাঙামাটির জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার তাঁর বক্তৃতায় পার্বত্যবাসীর এই প্রাণের দাবি সম্পর্কে কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। বরং চুক্তির বিধানাবলিকে ভিন্নতর ব্যাখ্যা দিয়ে কিংবা চুক্তি পরিপন্থি অবান্তর ইস্যু তুলে ধরে পার্বত্যবাসীর দাবিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালাতে দেখা যায় তাঁকে।

আমরা দেখছি, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের ওপর প্রাধান্য না দিয়ে সভা-সমাবেশ, আইনশৃঙ্খলা মিটিং কিংবা জাতীয় সংসদে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি-হানাহানির ইস্যুকে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। এপিবিএন কিংবা অন্যান্য বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।

এখন, ম্যালেরিয়া রোগীকে যদি যক্ষ্ণা রোগের ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়, তাহলে রোগ কখনও ভালো হবে না। বরং সেই রোগের প্রাদুর্ভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। পার্বত্যাঞ্চলের রাজনৈতিক সমস্যাকেও এপিবিএন কিংবা অন্য কোনো বাহিনী মোতায়েন করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া মানেই হচ্ছে ম্যালেরিয়াকে যক্ষ্ণার ওষুধ দিয়ে ভুল চিকিৎসা করার শামিল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। তার বদলে চুক্তি নিয়ে রাজনীতি করে কোনো পক্ষেরই লাভ হবে না। পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের মধ্য দিয়েই কেবল পার্বত্যাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফিরে আসবে এবং বিদ্যমান সংঘাত-হানাহানি বন্ধ হবে।

মঙ্গল কুমার চাকমা: পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক