রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে বৈধ আবাসিক ছাত্রদের সিটে ওঠা নিয়ে হল প্রশাসন ও সরকারি দল সমর্থিত ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে শনিবার রাতে যা ঘটে গেল তা শুধু লজ্জাকর নয়, উদ্বেগজনকও বটে। রোববার সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, হলটির প্রশাসন ঘোষণা দিয়ে অভিযান শুরু করেও সব বৈধ ছাত্রকে ছাত্রলীগ কর্তৃক দখল হওয়া তাঁদের সিটগুলো ফিরিয়ে দিতে পারেনি। বরং ছাত্রলীগ নেতাদের অন্যায় দাবি মেনে পাঁচজন বৈধ ছাত্রকে তাঁদের নিজ সিটের পরিবর্তে এক সময় হল পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশের ছেড়ে দেওয়া কক্ষে তুলে দিয়ে তারা হল ছেড়েছে। বিষয়টি লজ্জাজনক এ কারণে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে কে থাকবে কে থাকবে না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র সংশ্নিষ্ট হল প্রশাসনের। সেখানে কোনো শিক্ষার্থী বা কোনো ছাত্র সংগঠনের নাক গলানোর সুযোগ নেই। কিন্তু ওই হল প্রশাসন, যার দায়িত্বে আছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষকরা, তাঁদের সেই এখতিয়ার কার্যকর করতে ব্যর্থই শুধু নন; ছাত্রলীগ নেতাদের অন্যায় দাবির মুখে এক রকম পিছু হটেছেন। আর এ ঘটনাকে উদ্বেগজনক বলার কারণ হলো, এর মাধ্যমে হলের বৈধ ছাত্রদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে যেভাবে ছাত্রলীগের দখলদারিত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হলো, তার জের ভবিষ্যতেও টানতে হতে পারে।

উল্লেখ্য, বহুদিন ধরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে বৈধ ছাত্রদের বের করে দিয়ে তাঁদের সিট দখল করে আসছেন সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। কেবল গত জুন মাসেই তিনজন শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের এমন অপকর্মের শিকার হন। গত আট মাসে এমন আরও আটজনকে একই পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। এর মধ্যে শুধু লতিফ হলের ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ছাত্রলীগের দুই নেতাকে হল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে, মজার ব্যাপার হলো, দু'জনের একজনের শিক্ষাজীবন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে; অন্যজন অন্য একটি হলের ছাত্র। অর্থাৎ, এত অপকর্ম করেও কার্যত দায়মুক্তি ভোগ করে চলেছেন রাবি ছাত্রলীগের উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীরা। শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন; ঢাকা বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও ছাত্রলীগের এহেন অপকর্ম থেকে মুক্ত নয়। তা ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা শুধু যে হল দখল করেন, তা নয়; একদিক থেকে গোটা ক্যাম্পাসই তাঁদের দখলে। সেখানে ভিন্নমতের কোনো ছাত্র সংগঠন, বিশেষ করে তাঁদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল নেতাকর্মীদের তৎপরতা চালাতে গিয়ে বহুবার ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে মারধরের শিকার হতে হয়েছে। শুধু তাই নয়; সচেতন নাগরিকবৃন্দসহ বিভিন্ন মহলের প্রতিবাদের মুখে সংশ্নিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ পর্যন্ত বহুবার ক্যাম্পাস ও হলে সব মতের বৈধ ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করলেও তা এখনও ফাঁপা বুলিই রয়ে গেছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীসহ শাসক দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের তরফ থেকে একাধিকবার তাঁদের অনুসারী ছাত্র সংগঠনটির অবাধ্য সদস্যদের বিরুদ্ধে কড়া সতর্কবাণী দেওয়ার পরও অবস্থার ইতরবিশেষ ঘটেনি। কারণ অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগ সদস্যদের বিরুদ্ধে তাঁদের ওই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘোষণা রহস্যজনক কারণে মাঠ পর্যায়ে এসে থমকে গেছে। এর ফলে ছাত্রলীগের দুষ্ট নেতাকর্মীরা এতটাই বেপরোয়া যে, ক্যাম্পাসের ভেতরে তো বটেই; এর বাইরে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অপহরণ এমনকি ধর্ষণের মতো অনেক ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।

এ বিষয়গুলো নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অনেক ঐতিহ্যের ধারক এ ছাত্র সংগঠনটির জন্য সুখকর কিছু নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগ এবং তার নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য যে এ পরিস্থিতি লজ্জাজনক, তা বলা অপেক্ষা রাখে না। তাই অবিলম্বে ছাত্রলীগের উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীদের লাগাম টেনে ধরা দরকার বলে আমরা মনে করি। একইভাবে রাজশাহীসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে অবস্থানকারী যেসব শিক্ষক তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি ছাত্রলীগের অপকর্মকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছেন; তাঁদেরও শাস্তির মুখোমুখি করা জরুরি।

বিষয় : লাগামহীনতা সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন