প্রতিবাদ হিসেবে অন্যের কুশপুত্তলিকা দাহের চিত্র আমরা সচরাচর দেখে থাকি। কারও ওপর ক্ষোভ ঝাড়ার জন্য, কারও ওপর নিন্দা প্রকাশের জন্য প্রতিবাদ হিসেবে তার আকৃতি তৈরি করে সেটা পোড়ানো হয়। কিন্তু কেউ কি নিজের কুশপুত্তলিকা নিজে তৈরি করে? তা আবার নিজেই দাহ করে? হ্যাঁ। প্রতিবাদ হিসেবে সেটিই করেছেন একজন লেখক। সে খবর প্রকাশ হয়েছে সোমবারের সমকালে। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোররা অনলাইন গেমস ও ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত থাকে বলে তারা বই পড়ে না। তাই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বই বিক্রি করতে পারছে না, তেমনি লেখকদের সম্মানীও দিতে পারছে না। প্রকাশনা থেকে সম্মানী না পাওয়ার কারণে প্রতিবাদকারী লেখক সাইফুল্লাহ নবীন অর্থকষ্টে আছেন। তিনি একই সঙ্গে অঙ্কনশিল্পীও। বরিশালের অশ্বিনী কুমার হলের সামনে নিজের কুশপুত্তলিকা দাহ করে তিনি মনের কষ্ট প্রকাশ করেছেন।
প্রশ্ন হলো, তাঁর এ প্রতিবাদ কার বিরুদ্ধে? পড়ার প্রবণতা কমে যাওয়ার কারণে যদি জাতির বিরুদ্ধে তাঁর এ প্রতিবাদ হয়; তাঁর যৌক্তিকতা অবশ্যই আছে। প্রকাশকদের কাছ থেকে সম্মানী যথাযথ না পেলে লেখক হিসেবে তিনি প্রতিবাদ জানাতেই পারেন। কিন্তু নির্দিষ্ট করে তাঁর বই কেউ না পড়লে সেখানে ব্যক্তির ভূমিকা কিংবা তাঁর লেখার মানের বিষয়টিও অস্বীকার করা যাবে না। সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে তাঁর ৫২টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি লেখক সম্মানী পেতেন। তাহলে কি হঠাৎ তাঁর পাঠক কমে গেছে? অনলাইন আসক্তির কারণে একটা অংশের বই পড়ার প্রবণতা কমেছে, এটা সত্য। কিন্তু এখনও যে অনেক বই বিক্রি হয় এবং যথেষ্ট সংখ্যক পাঠক রয়েছে, তা এক মাসের একুশের বইমেলার রেকর্ড থেকে স্পষ্ট। অনলাইন বুক শপগুলোর পরিসংখ্যানও তার প্রমাণ দিচ্ছে। এবারের বইমেলায় ৫২ কোটি টাকার বই বিক্রি হওয়ার তথ্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এটা সত্য, বই বিক্রির ক্ষেত্রে 'জনপ্রিয়' কিছু লেখকের বই বেশি চলে। কিন্তু অন্যদের যে একেবারে চলছে না, তা বলা যায় না। বিশেষ করে, ৫২টি বই ইতোমধ্যে যে লেখকের প্রকাশ হয়েছে, তার কোনো না কোনো বই চলার কথা, যদি সেটা মানসম্পন্ন হয়।
অবশ্য প্রকাশকদের বিরুদ্ধেও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তাঁরা ঠিকমতো লেখকের 'রয়্যালিটি' দেন না। আবার এটাও বাস্তবতা, অনেক লেখক প্রকাশককে টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করেন। এ দুই সমস্যার মধ্যেও অনেক লেখক নিয়মিত লেখক সম্মানী পান। কারণ তাঁদের বই পাঠক এখন কেনে। তাঁরা লেখার মাধ্যমে পাঠক ধরে রাখতে পেরেছেন। তাঁদের নতুন বই প্রকাশের জন্য পাঠক মুখিয়ে থাকেন। সুতরাং দৃষ্টি দিতে হবে লেখার মান বাড়ানোর প্রতি।
নিজের কুশপুত্তলিকা দাহ করা লেখকের এ প্রতিবাদ কি তাহলে মূল্যহীন? মোটেই না। তাঁর এ প্রতিবাদের প্রভাব যদি কারও পঠন অভ্যাসে কিছুটা হলেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, সেটা নিশ্চয় ভালো দিক। তা ছাড়া বই প্রকাশ করলেই হয় না; তার সঙ্গে আরও বহুমাত্রিক বিষয় জড়িত। বইয়ের প্রচার এবং বাজারজাতকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন প্রকাশককে সেদিকেও নজর রাখা দরকার। মানসম্পন্ন বই প্রকাশের ক্ষেত্রে সম্পাদনার বড় অবদান। আমাদের কতটি প্রকাশনার সে ধরনের সম্পাদনা পরিষদ রয়েছে; জানি না। এসব ঘাটতি পূরণ করলে হয়তো লেখক-প্রকাশক-পাঠক সবাই উপকৃত হতে পারেন।
বাঙালির বই কেনার অভ্যাস নিয়ে অভিযোগ অনেক পুরোনো। সৈয়দ মুজতবা আলী বলে গিয়েছেন- 'বই সস্তা নয় বলে লোকে বই কেনে না, আর লোকে বই কেনে না বলে বই সস্তা করা যায় না।' এর সঙ্গে অনলাইন আসক্তি যোগ করলে শঙ্কা আছে বৈকি। এ সময়ে অনলাইনের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করা যাবে না। তবে পরিমিত ব্যবহারের দিকে অবশ্যই অভিভাবক-শিক্ষকগণ দৃষ্টি রাখবেন। তাহলে ওই লেখকের প্রতিবাদ কিছুটা হলেও সার্থক হবে।
মাহফুজুর রহমান মানিক: সাংবাদিক ও গবেষক
mahfuz.manik@gmail.com