করোনা মহামারির অল্প আগে কলকাতা গিয়ে ভ্রমণসঙ্গীদের চাপে কফি হাউসে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো, সেটা এক কথায় ভয়াবহ। বদলে গেছে কফি হাউস ১৮০ ডিগ্রিতে। কফি হাউসের কাঠামো নয়; বদলে গেছে এর পরিবেশ।
দোতলায় উঠে দেখি, কফি হাউস অবাধ ধূমপানের স্থানে পরিণত। অথচ কলকাতাসহ সারা ভারতে পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ। কাউন্টারের দেয়ালে 'ধূমপান নিষিদ্ধ' কাগজ সাঁটানো দেখেছি, কিন্তু সেটার কেউই তোয়াক্কা করছে না। তিনতলার ব্যালকনিতে তরুণ-তরুণীদের প্রকাশ্য উচ্ছৃঙ্খলতা বলিউডের স্থূল-কদর্য দৃশ্যকেও হার মানায়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, সংস্কৃৃত কলেজ, প্রেসিডেন্সি কলেজ, মেডিকেল কলেজ প্রভৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যবর্তী কফি হাউস। পশ্চিমবাংলার সব প্রকাশনা সংস্থা এবং বই বিপণিগুলোর অবস্থান কলেজ স্ট্রিটজুড়ে। কলকাতার মুক্তবুদ্ধি চর্চা, জ্ঞানের চর্চা, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা, প্রগতিশীল এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের স্বাক্ষর পাওয়া যেত কফি হাউসে গেলে। সেই কফি হাউসে তারুণ্যের অবক্ষয় ও অপচয়ের যে ছবি দেখা গেল, তা সম্ভবত কলকাতার বর্তমান সমাজ, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের ছবি। বহু বছর আগে কবি বলেছিলেন- কলকাতা আছে কলকাতাতেই। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, কলকাতা আর কলকাতাতে নেই।
পশ্চিমবাংলার সংস্কৃতি, মতাদর্শিক রাজনীতি, গণমুক্তির লড়াই পুঁজিবাদী তৎপরতায় পথ হারিয়েছে। কলকাতার অতীত বাংলা গান, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, নাটক, মতাদর্শিক রাজনীতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির তরুণ-তরুণীদের আর আকর্ষণ করে না। বিপরীতে বোম্বেটে জীবনাচারকে তারা সানন্দে গ্রহণ করে বাঙালিয়ানাকে বিসর্জন দিয়েছে। পশ্চিমবাংলার মধ্যবিত্তরা নিজেদের জাতিসত্তা পর্যন্ত ত্যাগ করতে সামান্য দ্বিধা করেনি, ওই শ্রেণি-উত্তরণ বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার মোহে। সর্বভারতীয় জাতি রূপে নিজেদের জাতিসত্তাকে বিলুপ্ত করে হিন্দি-ইংরেজির মিশেলে বলিউড চলচ্চিত্রের উপাদানে বোম্বেটে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। সব ক্ষতির মধ্যে মারাত্মক ক্ষতিটি হচ্ছে তারুণ্যের; সে ক্ষতি তো কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। সে ক্ষতির দায় তো পশ্চিমবাংলার সমষ্টিগত মানুষদেরই বহন করতে হচ্ছে এবং হবে।
পশ্চিমবাংলার মধ্যবিত্তদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাটি হচ্ছে সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠা। সেই প্রতিষ্ঠালাভ বাঙালি জাতীয়তার সনাতনি বলয়ে আটকে থাকলে সম্ভব হবে না। তাই জাতিগত ভাষা-সংস্কৃৃতি ত্যাগ করে সর্বভারতীয় হিন্দি-ইংরেজি রপ্ত করা চাই। ভারতীয় শাসক শ্রেণির নির্দেশিত-নির্ধারিত পথেই বাঙালি মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীরা নিজেদের গড়ে তুলছে ওই পথ অবলম্বনে। জাতীয়তা ত্যাগে সর্বভারতীয় হিন্দি ভাষা-সংস্কৃৃতি গ্রহণের হিড়িক পড়েছে। আর পড়বে নাই বা কেন! রাজ্য সরকারের চাকরির তুলনায় কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে দ্বিগুণ বেতন-ভাতা, বোনাস। এমনকি সপ্তাহে এক দিনের স্থলে দু'দিন ছুটি। সে তো আকৃষ্ট করবেই। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি পাওয়ার সব যোগ্যতার প্রধান যোগ্যতাটি হচ্ছে হিন্দি ও ইংরেজিতে পারদর্শী হওয়া। সেটা ছাড়া কোনো যোগ্যতাই বিবেচ্য বলে গণ্য হয় না।
ভারতীয় শাসকগোষ্ঠী পুঁজিবাদী মতাদর্শী এবং সব দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। শাসকগোষ্ঠীর অনুসৃত পথে অগ্রসর না হলে প্রচার-প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। পুঁজিপতিদের বাণিজ্যিক প্রসার ও সুবিধার জন্যই হিন্দিকে তারা আশ্রয় করে নিয়েছে। এই শাসকশ্রেণির করতলগত ভারতীয় জনগণ। তাদের না আছে প্রকৃত স্বাধীনতা; না আছে ক্ষমতা। শাসকগোষ্ঠীর দাসানুদাস ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। ভারতীয় সমাজে যেন অসন্তোষের বিদ্রোহ-বিপ্লব সংঘটিত না হতে পারে, এ জন্য তারা সদা-তৎপর। এই পুঁজিপতিদের মালিকানাধীন টিভি মিডিয়া, চলচ্চিত্র, গণমাধ্যমে অবিরাম স্থূলতা-ধর্মান্ধতার মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে। ধর্মান্ধতা ও অশ্নীলতার আফিম-মাদক গুলিয়ে দিচ্ছে জনগণের চেতনা ও জেদ।
ভারতীয় পুঁজিপতিরা ঔপনিবেশিক আমলে এক রাষ্ট্রাধীনের সুবিধা পেয়েছিল। কিন্তু বহু ভাষাভাষী ভারতে বাণিজ্যের অবাধ সুবিধায় এক ভাষা অর্থাৎ হিন্দি ভাষা প্রসারে যারপরনাই চেষ্টা চালিয়েছিল। ১৯৮৭-এর পর স্বাধীন ভারতের শাসকরা পুঁজিপতিদের সেই বাসনা পুরোপুরি পূরণ করেছিল হিন্দি ভাষাকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দিয়ে এবং বহু ভাষাভাষী ভারতীয় জনগণের ওপর চাপিয়ে। এতে যে বহু ভাষাভাষীর ভারতে অসন্তোষের ঘটনা ঘটেনি বা ঘটছে না, তা নয়। তবে ও-ই করা হচ্ছে। প্রতিটি জাতির জাতিসত্তার ভিত্তিমূলেই আছে ভাষা-সংস্কৃৃতি। সেই ভাষা ও সংস্কৃতি পরিত্যাগে নানা কৌশল, শঠতা, বল প্রয়োগ, প্রচার-প্রচারণা, সুযোগ-সুবিধা প্রদানে যে শাসকগোষ্ঠী সফল হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। পার্থিব লোভ-লালসায় মধ্যবিত্তরা প্রতিষ্ঠার ইঁদুর দৌড়ে এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পরিত্যাগ করেছে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে; পুঁজিবাদী লিপ্সার মোহে।
পুঁজিবাদ ব্যক্তিগত মালিকানা ও উন্নতিতে সমর্থন জোগায়। সমষ্টিগত উন্নতি-সামাজিক মালিকানা পুঁজিবাদের প্রধান শত্রু এবং প্রতিপক্ষ। পুঁজিবাদী তৎপরতা ভারতে যেমন, আমাদের দেশেও তেমনি ক্রমাগত বিস্তৃতি লাভ করেছে। ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসিতাও দুই দেশেই প্রবলভাবে ব্যাপৃত।
বহু জাতির ভারতকে এক জাতিতে পরিণত করার যে স্বপ্ন ভারতের পুঁজিপতিরা দেখে আসছে; শাসকগোষ্ঠী তার অনেকাংশই ইতোমধ্যে পূরণ করেছে বললে ভুল হবে না। যেখানেই জনগণ জাতি ও শ্রেণিগত আন্দোলনে নেমেছে, সেখানেই তারা কঠোর দমন-পীড়ন, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ঘটাতে কসুর করেনি; করছেও না। তবে জাতিগত চেতনা-শ্রেণি সংগ্রাম সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা সম্ভব হয়নি বলেই বিচ্ছিন্নভাবে তার প্রকাশ ঘটছে অহিংস ও সহিংস দুই পথেই। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানোর মানুষ নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তাই আশা-জাগানিয়া ভাষিক জাতীয়তাবাদ এবং শ্রেণি সংগ্রাম স্বল্প পরিসরে হলেও চলছে। এ সংগ্রামের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে ভারতবর্ষ তো বটেই; পশ্চিমবঙ্গের জনগণেরও নিজেকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা।
মযহারুল ইসলাম বাবলা: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত