সাধারণ নাগরিক কিংবা বিভিন্ন পেশাজীবী সম্প্রদায়ের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বরাদ্দ সুযোগ-সুবিধা, সেবা ও অধিকার পেতে গিয়েও কীভাবে দুর্ভোগ, হয়রানি, অনিয়ম এবং ক্ষেত্রবিশেষে দুর্নীতির শিকার হতে হয়- এই অভিজ্ঞতা কমবেশি সবারই রয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলের প্রাপ্য অংশ এমপিও তথা 'মান্থলি পে-অর্ডার' পেতেও যে তার ব্যতিক্রম ঘটে না, এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু রবি ও সোমবার সমকালে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুচ্ছে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আমাদের নিদারুণ আশঙ্কাকেও হার মানিয়েছে। এমপিও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর তথা মাউশি এবং দেশজুড়ে বিস্তৃত এর ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয়ে যেভাবে পদে পদে ঘুষের ফাঁদ পাতা রয়েছে, তাতে বেসরকারি বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের পরিস্থিতি জালে ফেঁসে গিয়ে হাঁসফাঁস করতে থাকা মাছের মতোই। রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ এই অর্থ পেতে অনিয়মের যে চিত্র সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা দেখে থাকি, তা যে নিমজ্জিত হিমশৈলীর দৃশ্যমান চূড়া মাত্র- সমকালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুচ্ছে তা প্রমাণ হয়েছে।
আমরা জানি, দেশে এমপিওভুক্ত প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমবেশি পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে যাঁরা অবসরে যান, তাঁদের শূন্য পদে নতুন নিয়োগ হয়ে থাকে। চাহিদা বিবেচনায় প্রতি বিজোড় মাসে গড়ে আড়াই হাজার নতুন শিক্ষক-কর্মচারীকে এমপিওভুক্ত করা হয়। এই প্রক্রিয়া সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে এবং ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ২০১৫ সালে এমপিওভুক্তি আবেদন নিষ্পত্তির কাজ মাউশির ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয়ে বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছিল। কিন্তু সমকালের অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে; আগে যেখানে শুধু কেন্দ্রীয় অধিদপ্তর তথা শিক্ষা ভবনে ঘুষ দিতে হতো, এখন তা দিতে হচ্ছে অন্তত তিনটি দপ্তরে- উপজেলা শিক্ষা দপ্তর, জেলা শিক্ষা দপ্তর ও আঞ্চলিক উপপরিচালকের কার্যালয়ে। এমপিও পেতে যে ২৭ থেকে ৩৭ ধরনের নথি জমা দিতে হয়, সেগুলো জমা গ্রহণ থেকে আবেদন নিষ্পত্তি পর্যন্ত প্রতিটি দপ্তরেই গড়ে উঠেছে শক্তিশালী চক্র। ঘুষ ও দুর্নীতির এতটাই প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ গড়ে উঠেছে, দপ্তরের মধ্যেই কোনো কর্মচারীকে 'ক্যাশিয়ার' নামে অলিখিত পদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর 'সহকারী' হিসেবে থাকে দালালচক্র।
দেখা যাচ্ছে- উপযুক্ত যোগ্যতা ও বৈধ নথিপত্র থাকার পরও নির্ধারিত হারে ঘুষ না দিলে দিনের পর দিন ঘুরতে ও নাজেহাল হতে হয় শিক্ষক ও কর্মচারীদের। এক পর্যায়ে এমপিওপ্রার্থী প্রায় প্রত্যেকেই ঘুষ দিতে বাধ্য হন। ঘুষ না দিতে চেয়ে নৈতিকতা শক্তিসম্পন্ন একাধিক এমপিওপ্রার্থী শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন- এমন নজিরও রয়েছে। ওদিকে সংশ্নিষ্ট দপ্তরের নিম্নপদস্থ কর্মকর্তারাও কীভাবে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে ওঠেন, সেই চিত্রও উঠে এসেছে সমকালের প্রতিবেদনগুচ্ছে। বলা বাহুল্য, শিক্ষক-কর্মচারীদের জিম্মি করে উত্তোলিত এই অর্থ যে আরও বহু ঘাটে যায়, তা সহজেই অনুমেয়। তা না হলে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বপদে বহাল থাকেন কীভাবে? সমকালের একটি প্রতিবেদনে রয়েছে, এমপিওভুক্তির অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে প্রায় আড়াইশ অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ১৮৪টি অভিযোগ তদন্তে দুদকের পক্ষে মাউশিকে দায়িত্ব দিলেও,  তদন্তের অগ্রগতি ও প্রতিবেদন একটি নয়, দুটি নয়, ৪০টি চিঠি পাঠালেও টনক নড়েনি সংশ্নিষ্টদের।
আরও উদ্বেগের বিষয়, এমপিওভুক্তি নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে সব জেনেও মাউশির মহাপরিচালক ও খোদ শিক্ষামন্ত্রী সমকালের কাছে কার্যত অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। আমরা মনে করি, মাউশি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই দুর্নীতির দায় এড়াতে পারে না। এ ক্ষেত্রে দুদকও কেন কেবল চিঠি পাঠিয়ে দায় সারছে, তাও খতিয়ে দেখা জরুরি। এই প্রশ্নের জবাবও পেতে হবে যে, দুর্নীতির এই 'ওপেন সিক্রেট' বন্ধ করবে কে? গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর সঙ্গে আমরা একমত যে, এমপিও খাতে ঘুষ বন্ধ করতে গেলে শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার। আমরা প্রত্যাশা করি, সমকালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুচ্ছ সরকারের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে। এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়ার গভীরে গ্রোথিত দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা হবে। যে এমপিওভুক্তির জন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অনশন পর্যন্ত চালান; যে এমপিওভুক্তির জন্য প্রতিবছর রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ বরাদ্দও হয়; সেই অর্থ যদি ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিশেষের পকেট ভারী করতে থাকে, তাহলে তো সেই বাংলা প্রবাদেরই সার্থক রূপায়ণ ঘটে- ডিম পাড়ে হাঁসে,খায় বাগডাশে!

বিষয় : হাঁস হাঁসে ডিম পাড়ে সম্পাদকীয়

মন্তব্য করুন