আজকের শিশু আগামী দিনের কর্ণধার। শিশুরা যাতে সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে পারে, এ জন্য আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ (ইউএনসিআরসি) শিশুদের একটি নির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ করেছে। যেখানে বলা হয়েছে, শূন্য থেকে ১৮ বছরের কম বয়সী সব মানব সন্তানই শিশু। বাংলাদেশসহ ১৯১টি রাষ্ট্র এই সনদে উল্লিখিত নীতিগুলোর প্রতি ঐকমত্য পোষণ করে স্বাক্ষর করে। ৩০ বছর ধরে এই সনদকে স্বাক্ষরকারী সব রাষ্ট্র সমানভাবে মেনে চলছে। অর্থাৎ, শিশুর কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই এটিকে সর্বজনীন করা হয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই জানি ও মানি, শিশুরা তুলনামূলক অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবারই উচিত তাদের বাড়তি যত্ন নেওয়া। জনস্বাস্থ্যের তথ্য অনুযায়ী আমরা প্রত্যেকে বিশ্বাস করি, যে জাতি শিশুদের নিয়ে যত বেশি মনোযোগী, সে জাতির তত বেশি সার্বিক উন্নয়নে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। ১৮ বছর বয়সের আগে কোনো মানব সন্তান পূর্ণভাবে বিকশিত হতে পারে না অথবা কল্পনার রঙিন জগতে ভেসে বেড়ায়। তাই তাদেরকে লালনপালন করার জন্য বড়দের পূর্ণ সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। চিকিৎসাবিদ ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুরা অনেক বেশি অনুকরণপ্রিয়। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র থেকে তারা প্রতিনিয়ত শেখে; সেটি ভালো কিংবা মন্দ যা-ই হোক। এক পর্যায়ে এই শেখা তার অভ্যাসে পরিণত হয়।
সম্প্রতি বলা হচ্ছে, দেশে কিশোর অপরাধ বেড়েছে। তাই শিশুদের বয়স ১৮ বছরের কম করার চিন্তাভাবনা চলছে। আসলেই কি শিশু অপরাধ বেড়ে গেছে, নাকি শিশুদের দ্বারা বড়রা অপরাধকর্ম ঘটাচ্ছে? তা ছাড়া শিশু অপরাধের মূল কারণ কি আসলে শিশুরা, নাকি শিশুর পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও অবস্থান? যদি সত্যিই শিশু অপরাধের সংখ্যা বেড়ে যায়, তবে এর নেপথ্যের কারণ বিবেচনা করার সঠিক সময় এখনই। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় ১৯৭৪ সালে শিশু আইন প্রণীত হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশের সংবিধান, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধিতেও শিশুদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন আইন রয়েছে।
সরকারের একজন মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, কিশোর গ্যাংসহ বর্তমানে যেসব সমস্যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে মনে হয়েছে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইনের সংশোধন হওয়া উচিত। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হলো, আইনের সংশোধন হলেই কি রাতারাতি অপরাধপ্রবণতা কমে যাবে? সম্প্রতি শিশু-কিশোর কর্তৃক যে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে, এ জন্য ওই শিশু-কিশোরই নয়, বরং পুরো পদ্ধতি দায়ী। শিশুবয়সে শিশুদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়া এর অন্যতম কারণ। যদি পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কোনো ঘাটতি থাকে অথবা অপ্রত্যাশিত অপশিক্ষা দেওয়া হয়, তবে সেসব শিশু-কিশোর কালক্রমে নষ্ট হয়ে যায়!
শিশুর বয়স কমানো নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী শিশুর সর্বোচ্চ বয়স ১৪ বছর করা যেতে পারে বলে মত প্রকাশ করেন। অপরাধীরা যাতে বয়স কম বলে ছাড় পেয়ে না যায়, তাই এমন ভাবনা ভাবছেন বৈকি! পক্ষান্তরে, শিশুর বয়স কমানো হলে অকালপকস্ফতার আশঙ্কা কি বেড়ে যায় না? বয়সের দিক থেকে সাধারণত ৭ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী দ্বারা সংঘটিত অপরাধই কিশোর অপরাধ। তবে বিভিন্ন দেশে বয়সের তারতম্য রয়েছে। কোনো কোনো দেশে ১৩ থেকে ২২ বছর আবার কোনো দেশে ১৬ থেকে ২১ বছর বয়সী কেউ অপরাধ করলে কিশোর অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হয়। সত্যিকার অর্থে অপরাধপ্রবণতার নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। তবে অপরিণত বয়সে প্ররোচিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই আমাদের কোমলমতি শিশু তথা আগামীর ভবিষ্যৎকে সব ধরনের অপকর্ম থেকে রক্ষা করার যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠিত না করে, বয়স কমিয়ে শিশুদের আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা কোনো সঠিক সমাধান হতে পারে না।
মো. তানজিমুল ইসলাম: অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর, ওয়ার্ল্ড ভিশন